শরীর আড়ষ্ট হয়ে গেল ডেভিডের। মিরেজের নাক তুলতেই মুখ খুলে চিৎকার করে উঠল যুদ্ধ উত্তেজনায়। কিন্তু প্রেশার স্যুট সত্ত্বেও হঠাৎ করে দিক পরিবর্তনের ফলে সিট থেকে প্রায় পড়ে যাবার উপক্রম হলো। মাথার মাঝে ছলকে উঠল রক্ত। দৃষ্টি হয়ে গেল ধূসর থেকে কালো।
তারপর ও ঠিক-ঠাকভাবে উড়ে যেতে লাগল মিরেজ। ঝাপসা ভাব কেটে গিয়ে স্বচ্ছ হয়ে এলো দৃষ্টি। জি-মিটারের দিকে তাকাল ডেভিড। বুঝতে পারল গতি না হারিয়েও এতটা উচ্চতায় পৌঁছাতে গিয়ে নয়বার ধাক্কা খেয়েছে ওর শরীর।
এবার শান্ত হয়ে বসে সামনে তাকাল খোলা আকাশের দিকে। অলমিটারের কাঁটা ছুটছে ঊর্ধ্বমুখী।
নিচে পাথরের মতো অনড় জো’র মিরেজ। ঠাণ্ডা আর নিশ্চিত সুরে জানাল জো, ‘লিডার টু জানাচ্ছি, আমি টার্গেট দেখতে পেয়েছি।
এমনকি স্টর্ম ক্লাইম্বের মাঝে নিজের রাডার কাজে লাগিয়ে অনেক উপরে স্পাই প্লেনকে খুঁজে পেয়েছে সে।
তারা দু’জনে মিলে তীরের মতো ছুটে চলল সামনের দিকে। ধনুক তাদেরকে ছুঁড়ে দিয়েছে বহুদূরে। আকাশে কিছু সময়ের জন্য ঝুলে রইল দু’জনে। যতক্ষণ পর্যন্ত না আবারো নেমে আসে মাটিতে। এই কয়েক মুহূর্তের মাঝেই শত্রুকে খুঁজে খুন করতে হবে তাদের।
নিজের সিটে হেলান দিল ডেভিড। অবাক বিস্ময়ে দেখতে পেল আকাশ হয়ে গেল গাঢ় নীল। এরপরই আস্তে করে দেখা গেল মধ্যরাতের মতো কালো আবছায়া। মাঝে মাঝে তারার ঝিকিমিকি।
স্টাটোস্ফিয়ারের একেবারে উঁচু ধাপে উঠে গেছে তারা। পথিবীতে পরিচিত সবচেয়ে উঁচু মেঘেরও উপরে। ককপিটের বাইরে বাতাস হয়ে উঠল হালকা আর দুর্বল। জীবন ধারণের জন্য অপর্যাপ্ত। শুধুমাত্র কোনরকমে জ্বলতে লাগল মিরেজের ইঞ্জিন। ঠাণ্ডা বেড়ে দাঁড়াল ষাট ডিগ্রির মতো ভয়ঙ্কর বরফ অবস্থা।
ধীরে ধীরে দু’টো এয়ারক্রাফটের জীবনীশক্তি ফুরিয়ে এলো। উড়ে বেড়াবার সমস্ত সৌন্দর্য যেন হারিয়ে গেল। মহাকাশের অনন্ত নক্ষত্ৰ বীথির কোলে ঘুরে বেড়াতে লাগল তারা। বহুদূরে নিচে অদ্ভুত আলো ছড়িয়ে উজ্জ্বল হয়ে রইল পৃথিবী।
কিন্তু চারপাশের দৃশ্য উপভোগ করার এতটুকুও সময় নেই। হালকা বাতাসে হাচোড়-পাচোড় শুরু করল মিরেজ। নষ্ট হয়ে যেতে লাগল কন্ট্রোল সিস্টেম।
টার্গেটের পিছনে লেগে রইল জো। সাবধানে, দৃঢ় পদক্ষেপে অনুসরণ করে চলল নিঃশব্দে। কিন্তু হঠাৎ করেই এত উচ্চতায় খেই হারিয়ে ফেলল দুজনে।
সামনের দিকে তাকিয়ে রইল ডেভিড। স্থির করার জন্য মিরেজের নাক সোজা করতে চাইল। কিন্তু সতর্ক সংকেত বেজে উঠল লাল আলো জ্বেলে। সময় আর উচ্চতা দুটোই বের হয়ে যাচ্ছে হাত গলে।
এরপরই হঠাৎ করে টার্গেটকে দেখতে পেল সে। মনে হলো একেবারে কাছে। বিশাল পাখা মেলে ভূতের মতো সামনে পড়ল, সামনে তাদের থেকে খানিকটা নিচে।
মরুর ফুল, ব্রাইট ল্যান্স বলছি। টার্গেট দেখতে পেয়েছি। আক্রমণের অনুমতি চাইছি।’ ডেভিডের ঠাণ্ডা গলার স্বর লুকিয়ে ফেলল হঠাৎ করে আসা রাগ আর ঘৃণা। টার্গেট প্লেনটাকে দেখার সাথে সাথে খেপে উঠল সে।
টার্গেট সম্পর্কে রিপোর্ট করো।’ ইতস্তত করতে লাগল ব্রিগ। একটা অচেনা টার্গেটের উপর আক্রমণের সিদ্ধান্ত হয়ে উঠতে পারে ভয়াবহ। মরুর ফুল, এটি একটি ইলুশিন মার্ক ১৭-১১। সেরকম দৃশ্যত কোন চিহ্ন নেই।’
আসলে কোন স্পষ্ট চিহ্নের দরকার নেই। একটা মাত্র জাতিরই হতে পারে এটা। খুব দ্রুত কাছে চলে যেতে লাগল ডেভিড। এর চেয়ে কম গতিতে যাওয়া সম্ভব নয়। অন্য মেশিনের প্রায় ঘাড়ের উপর পৌঁছে গেল সে। প্রকাণ্ড পাখাগুলো এমন ভাবে নকশা করা হয়েছে যেন স্টাটোস্ফিয়া দুর্বল বাতাসেরও সমস্যা না হয়।
দ্রুত কাছে চলে যাচ্ছি। মরুর ফুলকে সাবধান বাণী জানিয়ে দিল ডেভিড। প্রায় দশ সেকেন্ডের মাঝে শেষ হয়ে যাবে আক্রমণের সুযোগ।
হেডফোনের নীরবতা ভঙ্গ হলো। নিজের কামান প্রস্তুত করে নিল ডেভিড। চোখের সামনে বড় হয়ে উঠতে লাগল স্পাই প্লেনটা।
তৎক্ষণাৎ হঠাৎ করে সিদ্ধান্ত নিয়ে বসল ব্রিগ। হতে পারে দেশের হয়ে বড় একটা সিদ্ধান্ত নিয়েছে সে। কিন্তু জানে যে এরই মাঝে স্পাই প্লেনের ক্যামেরা সমস্ত গুরুত্বপূর্ণ তথ্য রেকর্ড করে নিয়েছে; যা শত্রু দেশের হাতে পড়লে সমস্যা বাড়বে বৈ কমবে না।
‘ডেভিড। কাটা কাটা স্বরে চিৎকার করে উঠল ব্রিগ। ‘ব্রিগ বলছি, আঘাত করো!
‘ঠিক আছে। নিজের মিরেজের নাক খানিকটা নিচু করল ডেভিড। বাধ্য মেয়ের মতো দায়িত্ব পালন করল মিরেজ।
টু, লিডার বলছি, আক্রমণ করছি।
“ঠিক আছে, লিডার।
খুব দ্রুত ইলুশিনের দিকে তেড়ে গেল মিরেজ। জানে যে হাতে মাত্র ‘ কয়েক সেকেন্ড আছে ফায়ার করার জন্য।
স্পাই প্লেনের পাখার উপর তাক করে ট্রিগারে চাপ দিল ডেভিড। সামনে তাকিয়ে যা দেখল মনে হলো বড়সড় একটা মাছের গায়ে আঘাত করেছে হারপুন।
তিন সেকেন্ড ধরে কামানের গোলা উগরে দিল ডেভিড স্পাই প্লেনের। কালো আকাশের পটভূমিতে উজ্জ্বল গোলা কাটতে লাগল পরপর। এরপর সামনে এগিয়ে বিশাল স্পাই দানবের পেটের নিচে চলে এলো ডেভিড। নিজের শক্তিও ফুরিয়ে এসেছে। মনে হলো কোন রকেট।
পাশে চলে এলো জোর মিরেজ। কাভার করতে লাগল ডেভিডকে। অসহায়ের মতো ঝুলতে লাগল স্পাই প্লেন। লম্বা গোলাকৃতি নাক নিয়ে কালো আকাশের বুকে শীতল তারার পানে ছুটতে লাগল।
