বাধা দিল ডেভিড। উঠে দাঁড়াল। কোথায় ও? ধুত্তোরি বলছেন না কেন? গলা কাঁপছে তার। আমি এখনি ওর সাথে দেখা করতে চাই।’ দ্রুত দরজার দিকে এগিয়ে গেল ডেভিড। ঝটকা মেরে খুলে ফেলল দরজা। কিন্তু ধরে ফেলল ব্রিগ।
‘ও এখানে নেই।
তাহলে কোথায়? ফিরে তাকাল ডেভিড।
‘আমি তোমাকে বলতে পারব না। আমি প্রতিজ্ঞা করেছি ওর কাছে।
‘আমি ওকে খুঁজে বের করব
হয়তো যদি সাবধানে খোঁজো–কিন্তু এতে করে নিজের সম্মান আর ভালোবাসা হারাবে।’ বলে চলল ব্রিগ। আবারো ওর কথা পুনরাবৃত্তি করছি আমি ওকে বলল যে আমাদের মাঝে ভালোবাসা বা একে অপরের কাছে আমরা যা ছিলাম তার দাবি দিয়ে বলছি, ও যেন আমাকে আমার মতো থাকতে দেয়, কখনো আমার খোঁজ না করে।”
‘কেন? কিন্তু কেন?’ নাছোড়বান্দার মতো চিৎকার করতে লাগল ডেভিড। ‘ও কেন আমাকে ছেড়ে চলে গেছে? ও জানে যে ও সব ধরনের আশার ঊর্ধ্বে উঠে গেছে। ও জানে যা ছিল অতীত আর কখনোই ফিরে আসবে না তা। ও জানে যেমনটা আশা করার অধিকার আছে তোমার তেমনটা আর হতে পারবে না সে। রেগে উঠে হাত ঝাড়া দিল ব্রিগ। শোন আমার কথা, ও জানে এটা স্থায়ী হবে না। ও আর কখনো তোমার স্ত্রী হতে পারবে না। তুমি এখনো অনেক তরুণ, প্রাণশক্তিতে ভরপুর’ তাকিয়ে রইল ডেভিড ও জানে ধীরে ধীরে এ ভালোবাসা নষ্ট হয়ে যাবে। এক সপ্তাহ, এক মাস অথবা এক বছর; তারপর এটা ধ্বংস হয়ে যাবে। একজন অন্ধ নারীর কাছে বাঁধা পড়বে তুমি। ও এটা চায় না। ও চায় এটা এখনই শেষ হোক, তাড়াতাড়ি টানাহেঁচড়া না করে এভাবেই ভালো’
‘থামুন। চিৎকার করে উঠল ডেভিড। দয়া করে চুপ করুন। অনেক হয়েছে।
চেয়ারে লাথি মারতেই গড়িয়ে পড়ে গেল ডেভিড। কিছুক্ষণ চুপ করে রইল দু’জনেই। দু’হাতে মুখ ঢেকে উঠে বসল ডেভিড। ছোট্ট জানালার নিচে দাঁড়িয়ে রইল ব্রিগ। বৃদ্ধ সৈন্যের মুখে এসে পড়ল সকালের আলো।
ও আমাকে বলেছে তোমাকে প্রতিজ্ঞা করাতে দ্বিধা করল ব্রিগ, মুখ তুলে তাকাল ডেভিড, প্রতিজ্ঞা করো তুমি কখনো ওকে খোঁজার চেষ্টা করবে না।’
না। গোয়াড়ের মতো মাথা নাড়ল ডেভিড।
কাধ ঝাঁকালো ব্রিগ। যদি তুমি না মানো, আমি তোমাকে বলব_ও আমাকে বলেছে তুমি বুঝবে, যদিও আমার মনে হয় বুঝবে না–ও বলেছে যে আফ্রিকাতে অ্যান্টিলোপ নামে সুন্দর একটা প্রাণী আছে। কখনো কখনো তাদের একজনকে শিকারি ধরে নিয়ে যায়–যা সিংহ খেয়ে ফেলে।
মনে হলো চাবুকের বাড়ি খেল ডেভিড। মনে পড়ল কোন এক সময় সে নিজেই কথাগুলো বলেছিল ডেবরাকে। তারা দুজনেই তখন ছিল তরুণ আর নির্ভার।
‘ঠিক আছে। অবশেষে বিড়বিড় করল ডেভিড। যদি এটাই চায় সে তাহলে আমি প্রতিজ্ঞা করছি ওকে খোঁজার চেষ্টা করব না। যদিও এটা প্রতিজ্ঞা করছি না যে ওকে বোঝাতে চেষ্টা করব যে ও ভুল সিদ্ধান্ত নিয়েছে।
সম্ভবত আরো ভালো হয় যদি তুমি ইস্রায়েল ছেড়ে চলে যাও। পরামর্শ দিল ব্রিগ। সম্ভবত তোমার উচিৎ তোমার আগের জায়গায় ফিরে যাওয়া; যেখান থেকে তুমি এসেছে। আর যা হয়েছে সব ভুলে যেও।
একমুহূর্ত থেমে কী যেন ভাবল ডেভিড। এরপর উত্তর দিল, না, আমার যা সবকিছুই এখানে। আমি এখানেই থাকবো।
‘ভালো। সিদ্ধান্তটা মেনে নিল ব্রিগ। এই ঘর তোমার জন্যে সব সময়েই খোলা।
‘ধন্যবাদ, স্যার।’ মার্সিডিজ যেখানে পার্ক করে এসেছে সেখানে চলে গেল ডেভিড। মালিক স্ট্রিটের বাসায় গেল। পা দিয়েই বুঝতে পারল কেউ এসেছিল।
আস্তে আস্তে হেঁটে বেড়ালো লিভিং রুমে, অলিভ-কাঠের তৈরি টেবিল থেকে উধাও হয়ে গেছে বইগুলো। চামড়ার কাউচের উপরে ঝোলানো নেই কাঁদেশ পেইন্টিং। বাথরুমে গিয়ে দেয়াল কেবিনেট খুলতেই দেখা গেল ডেবরার সব টয়লেট্রিজ সরিয়ে নেয়া হয়েছে। সমস্ত এক্সোটিক বোতল, টিউব, পট এমনকি ডেভিডের টুথব্রাশের পাশে থাকা ডেবরার টুথব্রাশও আর নেই।
ডেবরার ড্রয়ার শূন্য, ড্রেসগুলো নেই, তাগুলো খালি, ওর সমস্ত উপস্থিতির চিহ্নই মুছে ফেলা হয়েছে। শুধুমাত্র বাতাসে ভেসে বেড়াচ্ছে ওর পারফিউমের ঘ্রাণ আর রয়ে গেছে বিছানার উপরে আইভরি লেস কাভার।
বিছানার উপর গিয়ে বসল ডেভিড। লেসের উপর হাত বুলাতেই মনে পড়ে গেল অতীতের দিনগুলো।
বালিশের উপর পাতলা, চৌকোণা কিছু একটা পড়ে আছে। লেস্ কাভারের নিচে। কাভার তুলে সবুজ রঙের বইখানা হাতে তুলে নিল ডেভিড।
দিজ ইয়ার, ইন জেরুজালেম, বিচ্ছেদ হবার উপহারস্বরূপ পড়ে আছে বইটি। ঝাপসা হয়ে এলো ডেভিডের চোখ। নিজের এইটুকুই ফেলে গেছে ডেবরা।
.
অবস্থাদৃষ্টে মনে হলো ইন কারেমে ঘটে যাওয়া হত্যাকাণ্ড মধ্যপ্রাচ্য জুড়ে সূচনা করল নতুন যুদ্ধ আর ভয়াবহতার। আন্তর্জাতিকভাবে বেড়ে গেল উদ্বেগ-উত্তেজনা। আরবীয় জাতিসমূহ বের করে আনল তেল বিক্রির অর্থে কেনা চমৎকার সব অস্ত্রের ভাণ্ডার। আরো একবার শপথ নিল যে তাদের কাছে প্যালেস্টাইন নামে পরিচিত ভূ-খণ্ডে আর একজনও ইহুদির ঠাই হবে না।
বিভিন্ন নাজুক টার্গেটের উপর শুরু হলো নির্দয় আক্রমণ, অরক্ষিত দূতাবাস আর দুনিয়া জোড়া কনস্যুলেটগুলোও এর হাত থেকে রেহাই পেল না। বিচ্ছিন্ন জনপদে পত্ৰবোমা আর স্কুলবাসে নাইট অ্যামবুশের সংখ্যাও বেড়ে গেল।
এরপর অবস্থা দাঁড়াল আরো গুরুতর। একেবারে সরাসরি ইস্রায়েলের হৃৎপিণ্ডে আঘাত নেমে এলো। সীমান্ত লঙ্ন, কমান্ডো ধাঁচের লুটপাট, আকাশ সীমা লঙ্ঘন, শেল নিক্ষেপ, হুমকিস্বরূপ জনসভা আর অস্ত্রের ঝনঝনানি সবকিছু মিলিয়ে ছোট ভূ-খণ্ডের ভূমিটুকু হয়ে উঠল অশান্ত।
