‘চলো কোথাও বসে একটু ড্রিংক করি? মাথা নাড়ল জো। আমার ইচ্ছে করছে না। আমার মনে হয় বেসে ফিরে যাওয়াটাই ভালো হবে। আজ রাতে নাইট ইন্টারসেপশন হবার কথা।’
‘হ্যাঁ। ডেভিডও রাজি হয়ে গেল দ্রুত, ‘আমিও যাবো তোমার সাথে। আগামীকাল পর্যন্ত ডেবরার সাথে দেখা করতে পারবে না। মালিক স্ট্রিটের বাসাও শীতল আর শূন্য মনে হবে। হঠাৎ করে তাই তারও মনে হলো বেসে যাবার কথা।
মোলায়েম অন্ধকারে আকাশে চাঁদকে মনে হচ্ছে বাঁকানো সারাসিন ব্লেডের ফলা। আর উজ্জ্বল তারাগুলোকে দেখাচ্ছে মোটামোটা রূপালি পাথরের ন্যায়।
পৃথিবীর অনেক উপরে উড়ে বেড়ালো তারা। উঠে গেল দুঃখ-কষ্টের ঊর্ধ্বে। হারিয়ে গেল নাইট ইন্টারসেপশনের প্রাত্যহিক দায়িত্বে।
টার্গেট হিসেবে ঠিক করা হলো নিজেদের স্কোয়াড্রনের মিরেজ। নেগেত এর অনেক উপরে স্ক্যানারে ধরাও পড়ল এটি। লক্ করল জো, জানিয়ে দিল ট্যাক আর রেঞ্জ। খুঁজে পেয়ে অবশেষে টার্গেট জেটের বিস্ফোরণ ঘটালো ডেভিড। মখমলের মতো কালো রাতের বুকে লাল হয়ে জ্বলতে লাগল এটি।
নিঃশব্দে টার্গেটের পেটের নিচে চলে গেল ডেভিড নিজের প্লেন নিয়ে। এরপরই খাড়া ভাবে উঠতে লাগল উপরে। ঠিক যেমন ভাবে একটা বারাকুজা নিচ থেকে উঠে সমূদ্রের উপরে হুটোপুটি করে। এতটাই কাছ দিয়ে গেল ডেভিড যে টার্গেট মিরেজ হন্যে হয়ে ঘরে ফিরতে চাইল। এক মুহূর্ত আগপর্যন্ত ও টের পায়নি ডেভিডের অস্তিত্ব।
দুঃখ ভারাক্রান্ত হৃদয়ে নিঃশেষিত হয়ে অসাড়ে ঘুমোলো জো। কিন্তু তার নিচের বাঙ্কেই জেগে রইল ডেভিড। খুব ভোরবেলা উঠে শাওয়ার সেরে জোকে ঘুমন্ত অবস্থায় রেখে বের হয়ে আসল সে। গাড়ি চালিয়ে যখন জেরুজালেমের হাসপাতালে পৌঁছালো, ঠিক তখন উদয় হলো সূর্য। পাহাড়ের উপর ছড়িয়ে পড়ল নরম সোনালি আর গোলাপি মুক্তার মতো আলো।
ডেস্কে নাইট সিস্টার জানাল, দুপুরবেলা ভিজিটিং আওয়ার্সের আগে ভেতরে যেতে পারবেন না আপনি। কিন্তু নিজের সবটুকু সৌন্দর্য ঢেলে দিয়ে হাসার চেষ্টা করল ডেভিড।
‘আমি শুধু জানতে চাই ও ভালো আছে তো? আমাকে সকালবেলা স্কোয়াড্রনে ফিরতে হবে।
কিন্তু মনে হলো ডেভিডের হাসি আর এয়ারফোর্সের ইউনিফর্ম কিছুই কাবু করতে পারেনি সিস্টারকে। নিজের লিস্ট চেক করে জানাল, আপনার ভুল হচ্ছে। আমাদের এখানে একজনেই মোরদেসাই আছেন। মিসেস রুথ মোরদেসাই।
‘ওর মা। জানিয়ে দিল ডেভিড। নিজের শীটে আবারও চোখ বুলাতে লাগল সিস্টার।
এই কারণেই আমি খুঁজে পাইনি।’ বিরক্তির স্বরে বিড়বিড় করে উঠল সিস্টার। গত রাতেই ডিসচার্জ হয়ে গেছে সে।’
‘ডিসচার্জড? হা করে তাকিয়ে রইল ডেভিড।
হ্যাঁ। গত রাতেই বাসায় ফিরে গেছে সে। এখন মনে পড়ল। তার বাবা এসে নিয়ে গেছে। আমি তখন মাত্র ডিউটিতে এসেছি। সুন্দর মতন মেয়েটার চোখে ব্যান্ডেজ।
‘হ্যাঁ। তাড়াতাড়ি মাথা নাড়ল ডেভিড। ধন্যবাদ। অনেক ধন্যবাদ আপনাকে।
দৌড়ে সিঁড়ি টপকে মার্সিডিজের কাছে ছুটলো সে। পা দুটো মনে হচ্ছে বেশ হালকা। দুঃচিন্তার বোঝা নেমে গেছে অবশেষে মাথা থেকে।
ডেবরা বাসায় গেছে। ডেবরা ভালো আছে। নিরাপদ আছে।
দরজা খুলে দিল ব্রিগ। ডেভিড ঢুকলো প্রাণহীন বাড়িটাতে। এখনো ইউনিফর্ম পরে আছে। কিন্তু পোশাকের ভাঁজ নষ্ট হয়ে কুঁচকে আছে। ব্রিগের মুখের চারপাশে বলিরেখা; চিন্তা, কষ্ট আর ঘুমের অভাবে রক্তাক্ত চোখ।
‘ডেবরা কোথায়? আগ্রহ নিয়ে জানতে চাইল ডেভিড। কাঁধ নেড়ে একপাশে সরে ডেভিডকে ভেতরে ঢোকার জায়গা দিল ব্রিগ।
‘কোথায় ও? আবারো জানতে চাইল ডেভিড। নিজের স্টাডিতে নিয়ে ডেভিডকে একটা চেয়ার এগিয়ে দিল ব্রিগ।
‘কেন আমাকে কিছু বলছেন না? রেগে উঠতে লাগল ডেভিড। বড়সড় রুমটা ভর্তি বই আর পুরাতাত্ত্বিক সংগ্রহে। একটা চেয়ারে বসল ব্রিগ নিজে।
‘গতকাল তোমাকে বলতে পারিনি ডেভিড। ও আমাকে বলতে মানা করেছিল। আমি দুঃখিত।
কী কথা?’ সতর্ক হয়ে উঠল ডেভিড।
‘ও চিন্তা করার সময় নিয়েছিল–নিজের মন ঠিক করার। আবারো উঠে দাঁড়াল ব্রিগ। পায়চারি শুরু করল। শূন্য কাঠের মেঝেতে প্রতিধ্বনি তুলতে লাগল পদশব্দ। মাঝে মাঝেই থেমে হাত দিয়ে ছুঁয়ে দেখল কোন সংগ্রহ। মনে হলো সান্ত্বনা পেতে চাইছে তার মন।
চুপচাপ শুনে গেল ডেভিড। মাঝে মাঝে মাথা নাড়ল। এমন ভাবে মাথা নাড়ল মনে হলো যা শুনছে সেটা সত্যি বলে মানতে নারাজ সে।
‘সুতরাং বুঝতেই পারছো, এটাই সত্যি। আর কোন আশা নেই। ও অন্ধ। হয়ে গেছে ডেভিড, পুরোপুরি অন্ধ। ও এমন একটা জগতে চলে গেছে যেখানে কেউ ওর সঙ্গী হতে পারবে না।
‘কোথায় ও? আমি ওর কাছে যেতে চাই।’ ফিসফিস করে উঠল ডেভিড। কিন্তু ব্রিগ মনে হলো শুনতেই পেল না। বলে চলল, ‘ও সিদ্ধান্ত নিতে সময় চেয়েছিল–আমি সে সময় দিয়েছি তাকে। গতরাতে, অন্তেষ্টিক্রিয়ার পরে আমি ওর কাছে ফিরে গিয়েছি, দেখেছি ও তৈরি হয়ে গেছে। সে এটা মেনে নিয়েছে, ভেবে দেখেছে কী করা দরকার।
‘আমি ওর সাথে দেখা করতে চাই।’ আবারো বলে উঠল ডেভিড। আমি ওর সাথে কথা বলতে চাই।’
এবার ব্রিগ তাকাল ডেভিডের দিকে। গলা ধরে এলো সহানুভূতিতে। না, ডেভিড। এই তার সিদ্ধান্ত। তুমি আর কখনো ওর সাথে দেখা করবে না। তোমার কাছে ও মৃত। এগুলো তারই কথা। ওকে বলো আমি মারা গেছি। শুধু মনে রাখবে আমার জীবন্ত স্মৃতি।
