মাথা নাড়ল ব্রিগ। নিজের পেন্সিল দিয়ে নার্ভের ফিউজ দেখাল ডাক্তার। ব্রিগের ক্লান্ত চেহারায় ফুটে উঠল হতাশা।
‘অন্ধত্ব?’ বিগ্রের প্রশ্নের উত্তরে মাথা নাড়ল ইদেলমান।
দুই চোখ?
‘আমার তাই মনে হচ্ছে।’
মাথা নামিয়ে নিজের চোখে হাত বুলাতে লাগল ব্রিগ। এরপর কথা বলল ইদেলমানের দিকে না তাকিয়ে।
‘চিরতরে? জানতে চাইল ব্রিগ।
‘ও আর কখনো রং, আকৃতি, আলো, অন্ধকার বুঝতে পারবে না? ছোট্ট ইস্পাতের টুকরা অপটিক চিয়াশমা ভেদ করে গেছে। সব দেখে মনে হচ্ছে নার্ভের বারোটা বেজে গেছে। মেডিকেল সায়েন্সে এমন কোন কৌশল এখনো নেই যা এটি ফিরিয়ে আনতে পারে। এক মুহূর্ত থেমে শ্বাস ফেলল ইদেলমান। সোজা কথায় বলতে গেলে আপনার মেয়ে আর কখনোই দুই চোখে দেখতে পাবে না।’
কাঁধ ঝাঁকিয়ে আস্তে করে মাথা তুলল ব্রিগ। তাকে জানিয়েছেন এ কথা? তাকাতে পারল না ইদেলমান।
‘আমি আশা করছিলাম যে আপনি বলবেন।
হ্যাঁ। মাথা নাড়ল ব্রিগ। এই-ই ভালো হবে। এখন দেখা করতে পারব ওর সাথে? জেগে আছে?’
‘হালকা সিডেটিভ দেয়া হয়েছে। কোন ব্যথা নেই শুধু একটু অস্বস্তি। বাইরে দিয়ে কিছুই বোঝা যাবে না। আর ইস্পাতের টুকরোটা বের করার কোন চেষ্টাও করা যাবে না। এর জন্যে বড় আকারের নিউরো সার্জারি লাগবে।’ উঠে দাঁড়িয়ে দরজা দেখিয়ে দিল ডাক্তার।
‘আপনি এখন দেখা করতে পারবেন। চলুন আমিই নিয়ে যাচ্ছি।’
ইমারজেন্সি থিয়েটারের বাইরের করিডোরের উভয় পাশের দেয়ালে স্ট্রেচারের সারি। নিজের অনেক অতিথিকে স্ট্রেচারে শুয়ে থাকতে দেখতে পেল ব্রিগ! মাঝে মাঝে থেমে এক-দু’জনের সাথে কথা বলল সে। এরপর ইদেলমানের সাথে এগিয়ে গেল করিডোরের শেষ মাথায় রুমের দিকে।
জানালার নিচে লম্বা একটি বিছানায় শুয়ে আছে ডেবরা। চুলে লেগে আছে শুকনো রক্ত, বিবর্ণ দেখাচ্ছে ডেবরাকে। দুই চোখের উপরে মোটা তুলার ব্যান্ডেজ।
‘তোমার বাবা এসেছেন, মিস মোরদেসাই।’
ইদেলমানের কণ্ঠ শুনে আস্তে করে মাথা ঘুরালে ডেবরা।
‘ড্যাডি?
‘এই তো আমি, বাবা।
ডেবরার বাড়িয়ে দেয়া হাত ধরল ব্রিগ। নিচু হয়ে কি করল হাতে। কড় জীবাণুরোধক ওষুধের গন্ধ আসছে।
“মাম্মা?’ উদ্বিগ্ন স্বরে জানতে চাইল ডেবরা।
‘বিপদমুক্ত। ব্রিগ আশ্বস্ত করল ডেবরাকে। কিন্তু হান্নাহ’ হ্যাঁ। ওরা জানিয়েছে আমাকে।’ বাবাকে থামিয়ে দিল ডেবরা। কণ্ঠ রুদ্ধ হয়ে আসছে।
‘জো ভালো আছে?
‘ও অনেক শক্ত। ঠিক হয়ে যাবে।
‘ডেভিড? জানতে চাইল ডেবরা।
‘এই তো এখানে।
আগ্রহে এক কনুইয়ের উপর ভর দিয়ে উঠে বসতে চাইল ডেবরা। চেহারায় ফুটে উঠেছে আশার আলো। চোখ বাঁধা অবস্থাতেও চারপাশে খুঁজছে। ডেভিড।’ ডেকে উঠল ডেবরা। কোথায় তুমি? ধুত্তোরি। এই ব্যান্ডেজ … কিছু ভেবো না ডেভিড। এগুলো শুধু চোখকে আরাম দেয়ার জন্য দেয়া হয়েছে।’
না। ডেবরার কাঁধে হাত রেখে শান্ত করতে চাইল ব্রিগ। ও বাইরে অপেক্ষা করছে। সাথে সাথে অসন্তুষ্ট হয়ে উঠল ডেবরা।
‘ওকে আমার কাছে আসতে বলো প্লিজ।’ ফিসফিস করে উঠল ডেবরা।
‘হ্যাঁ। কিন্তু একটু পরে। প্রথমে কিছু কথা বলা প্রয়োজন-আমি কিছু বলতে চাই তোমাকে। গুরুত্বপূর্ণ কয়েকটা কথা।
মনে হলো বুঝতে পেরেছে ডেবরা। বাবার গলার আওয়াজে এমন কিছু টের পেয়েছে সে যে একেবারে চুপ করে গেল। সেই চিরাচরিত নৈঃশব্দ।
ব্রিগ একজন সৈন্য। যদিও চেষ্টা করল যতটা সম্ভব মোলায়েম স্বরে জানাতে; কিন্তু নিজের কষ্টের ভারে সেটুকুও পারল না ব্রিগ। বাবার হাতের মাঝে থাকা ডেবরার হাত কাঁপতে লাগল। তারপর হয়ে গেল নিস্পন্দ।
কোন প্রশ্ন করল না ডেবরা। পিতা-কন্যা বসে রইল চুপচাপ। প্রথমে কথা বলল ব্রিগ।
‘আমি ডেভিডকে পাঠিয়ে দিচ্ছি। জানাল ব্রিগ। দ্রুত কথা বলে উঠল ডেবরা।
না। শক্ত করে বাবার হাত ধরল সে। না। আমি এখন ওর সাথে দেখা করব না। প্রথমে আমাকে সবকিছু নিয়ে ভাবতে হবে।’
ওয়েটিংরুমে ফিরে গেল ব্রিগ। আগ্রহ নিয়ে উঠে দাঁড়াল ডেভিড। নিখাদ মুখশ্রীতে বিবর্ণ ছাপ।
ওকে থামিয়ে দিল ব্রিগ। নো ভিজিটরস। ডেভিডের হাত ধরল ব্রিগ। কাল পর্যন্ত ওর সাথে দেখা করতে পারবে না তুমি।
‘খারাপ কিছু হয়েছে? কী হয়েছে? ডেভিড চাইল ছাড়া পেতে। কিন্তু ব্রিগ তাকে ছাড়ল না।
‘খারাপ কিছু নয়। ও ভালো হয়ে যাবে কিন্তু কোন ধরনের উত্তেজনা সহ্য করতে পারবে না এখন। আগামীকাল ওর সাথে দেখা করতে পারবে তুমি।
.
অলিভস্ মাউন্টেনের উপর পারিবারিক ভূমিতে সমাহিত করা হলো হান্নাহকে। ছোট অন্তেষ্টিক্রিয়ায় অংশ নিল তিনজন পুরুষ আর কয়েকজন আত্মীয়, যাদের অনেককেই যেতে হলো আরো শোকসভায়।
হাই-কমান্ডের সাথে মিটিং আছে ব্রিগের। অফিসের গাড়ি তাই অপেক্ষা করছে বাইরে। পরবর্তী কার্যক্রম নিয়ে আলোচনা হবে। কোন না কোন পদক্ষেপ নেয়া হবে নির্ঘাৎ। সমস্যায় জর্জরিত ভূ-খণ্ডে আবারো শুরু হবে। হাঙ্গামা।
মার্সিডিজে উঠে নিঃশব্দে বসে রইল জো আর ডেভিড। ইঞ্জিন চালু করার কোন চেষ্টাই করল না ডেভিড। জো সিগারেট ধরালো দুজনের জন্য। দু’জনেরই মনে হলো কোন উদ্দেশ্য নেই জীবনের, কোথায় যাবার তাড়া নেই।
কী করবে এখন তুমি? জোর কাছে জানতে চাইল ডেভিড।
‘আমাদের হাতে দুই সপ্তাহ সময় ছিল। নিচে অ্যাশকেলনে যাবার কথা রুদ্ধ হয়ে গেল জোর গলা। আমি জানি না। কিছু করারও নেই, তাই না।’
