তিনজন পুরুষ ব্রিগ, জো আর ডেভিড–সারারাত কাটিয়ে দিল হাসপাতালের ওয়েটিং রুমের কাঠের শক্ত বেঞ্চিতে বসে। আক্রমণের পেছনের কাহিনী জানতে পারার সাথে সাথে ব্রিগের কানে এসে তা ফিস ফিস করে জানিয়ে দিয়ে গেল সিকিউরিটি এজেন্ট।
গুপ্তঘাতকদের একজন ক্যাটারিং ফার্মের দীর্ঘদিনের বিশ্বস্ত কর্মচারী। আর অন্য দুজন তার চাচাতো ভাই, অস্থায়ী কর্মচারী হিসেবে যোগ দিয়েছিল তারই সুপারিশে। এ ব্যাপারে কোন সন্দেহ নেই যে তাদের কাগজপত্র জালিয়াতি হয়েছে।
হঠাৎ করে আসা কাজের কারণে প্রধানমন্ত্রী আর তার কেবিনেট বিয়ের আসরে আসতে দেরি করেছেন। কিন্তু আক্রমণের সময় রাস্তায় ছিলেন তারা। ভাগ্যক্রমে বেঁচে গেছেন তারা। ব্যক্তিগতভাবে আহত-নিহতের পরিবারের কাছে শোকবার্তা পাঠিয়েছেন প্রধানমন্ত্রী।
দশটার সংবাদে দামাস্কাস রেডিও একটি রিপোর্ট প্রচার করল। সাথে আল-ফাতাহ এ আক্রমণের দায়িত্ব স্বীকার করেছে। সুইসাইড স্কোয়াডের সদস্যরা করেছে কাজটি।
মধ্যরাতের খানিক আগে প্রধান অপারেশন থিয়েটার থেকে বের হয়ে এলো প্রধান সার্জন। তখনো থিয়েটারের সবুজ পোশাক আর জুতা পায়ে, মুখোশ ঝুলছে গলার কাছে। ব্রিগকে জানাল রুথ মোরদেসাইয়ের বিপদ কেটে গেছে। লাঞ্চ ফুটো করে কাঁধের নিচ দিয়ে বের হওয়া বুলেট ফেলে দিয়ে ফুসফুসকে সারিয়ে তুলেছে চিকিৎসকরা।
ঈশ্বরকে ধন্যবাদ। বিড়বিড় করে এক মুহূর্তের জন্য চোখ বন্ধ করল ব্রিগ। পঁচিশ বছর ধরে একসাথে থাকা নারী ছাড়া কেমন অদ্ভুত মনে হলো জীবন। এরপরই তাকাল চোখ তুলে। “আমার মেয়ে?
মাথা নাড়ল সার্জন। চিকিৎসকরা এখনো ব্যস্ত তাকে নিয়ে। দোনোমনো করে উঠল সার্জন। কর্নেল হালমান কয়েক মিনিট আগে মারা গেছে।
এ পর্যন্ত মৃতের সংখ্যা দাঁড়াল এগারোতে। আর চারজনের অবস্থা বেশ গুরুতর।
ভোরবেলা সৎকার বাহকেরা এসে পৌঁছালো কালো লিমুজিনে করে বাক্স নিয়ে। মৃতদেহ নিয়ে যাবে। ডেভিড মার্সিডিজের চাবি দিল জোর হাতে। যেন হান্নাহর মৃতদেহ নেয়া থেকে শুরু করে অন্ত্যেষ্টিক্রিয়ার যোগাড় করতে পারে সে।
পাশাপাশি বসে আছে ডেভিড আর ব্রিগ। চিন্তামগ্ন, নিঘুম চোখ। কাগজের কাপে করে কফি পান করছে।
সকাল পার হবার পরে চক্ষু বিশেষজ্ঞ এলো তাদের দিকে। চল্লিশ বছর বয়সী হলেও মসৃণ চেহারার তরুণ ভদ্রলোক। বলিরেখাহীন চেহারা আর পরিক্ষার নীল চোখের সাথে খাপছাড়া লাগল চুলের সাদাটে ভাব।
‘জেনারেল মোরদেসাই?”
শক্তভাবে উঠে দাঁড়াল ব্রিগ। মনে হলো এক রাতেই বয়স বেড়ে গেছে দশ বছর।
‘আমি ডাক্তার ইদেলমান। আমার সাথে আসুন দয়া করে।
ডেভিডও উঠে দাঁড়াল। কিন্তু ডাক্তার থেমে তাকিয়ে রইল ব্রিগের দিকে।
‘আমি ওর বাগদত্তা। ব্যাখ্যা করল ডেভিড।
‘প্রথমে আমরা একা কথা বললেই ভালো হবে জেনারেল। ইদেলমান চোখ দিয়ে পরিষ্কার সতর্কবাণী উচ্চারণ করল। মাথা নাড়ল ব্রিগ।
“প্লিজ, ডেভিড।
“কিন্তু’ আবারো কিছু বলতে চাইল ডেভিড। আস্তে করে তার কাঁধে হাত রাখল ব্রিগ। এই প্রথমবারের মতো কোন স্নেহবাৎসল্য প্রকাশ পেল দু’জনের মাঝে।
প্লিজ মাই বয়। ঘুরে দাঁড়িয়ে শক্ত বেঞ্চের দিকে তাকিয়ে রইল ডেভিড। নিজের ছোট্ট অফিসে গিয়ে কোণের ডেস্কের ওপাশে বসে সিগারেট জ্বাললো ইদেলমান। ভদ্রলোকের হাত দুটো মেয়েদের মতো চিকন আর লম্বা। একজন পেশাদার সার্জনের মতোই দ্রুত লাইটার জ্বেলে নিল।
‘আমার মনে হচ্ছে আপনি কোন ভণিতা পছন্দ করবেন না। সাবধানে প্রশংসা করল ব্রিগের। উত্তরের জন্য অপেক্ষা না করেই বলে চলল ভদ্রলোক,
‘আপনার মেয়ের কোন চোখই ক্ষতিগ্রস্ত হয়নি। কিন্তু হাত তুলে ব্রিগের ঠোঁটের কাছে স্বস্তির শব্দকেও থামিয়ে দিল ডাক্তার। ঘুরে তাকাল স্ক্যানারে ঝোলানো এক্স-রে প্লেটের দিকে। পিছনের লাইট জ্বালিয়ে দিতেই স্পষ্ট হয়ে উঠল ছবি।
‘চোখ দুটো পুরোপুরি অক্ষত, বাইরের দিকে প্রায় কোন ক্ষতিই হয়নি– কিন্তু, ক্ষতিটা হয়েছে এখানে, এক্স-রে প্লেটের এক জায়গায় ধোঁয়াটে অংশে শক্ত একটা কিছু দেখাল ডাক্তার। এটি একটি ইস্পাতের টুকরো, খুবই ছোট্ট, নির্ঘাৎ গ্রেনেড় থেকে এসেছে। একটা পেন্সিলের মাথার চেয়ে বড় নয়। ডান দিক দিকে খুলির ভেতরে ঢুকে পড়েছে। বড় একটা শিরা কেটে ফেলায় রক্তপাত হয়েছে। আই-বলের পাশ দিয়ে চলে যাওয়ায় বিশেষ কোন টিস্যুর। গায়ে আঁচড়ও পড়েনি। কিন্তু অপটিক চিয়াশমা’র হাঁড়ের অংশে ঢুকে গেছে।
এক্স-রের উপর ছোট্ট ইস্পাতের টুকরো কোন পথে ডেবরার মাথায় ঢুকে গেছে দেখিয়ে দিল ডাক্তার। চিয়াশমা ফুড়ে বের হয়ে গেছে এটি। সিগারেটে লম্বা একটি টান দিয়ে ব্রিগের দিকে তাকাল ডাক্তার। কোন অনুভূতি বুঝতে পারল না।
এর মানে আপনি বুঝতে পারছেন জেনারেল?’ ডাক্তারের প্রশ্নে অদ্ভুতভাবে মাথা নাড়ল বিগ। এক্স-রে স্ক্যানারের লাইট বন্ধ করে দিল ডাক্তার। ফিরে এলো ডেস্কে। ব্রিগের সামনে একটি স্ক্র্যাপ খাতা টেনে নিয়ে নিজের পকেট থেকে পেন্সিল বের করল। একের পর এক টান দিয়ে এঁকে ফেলল অপটিক্যাল চার্ট, আই বস, ব্রেইন, অপটিক্যাল নার্ভ।
‘অপটিক্যাল নার্ভ প্রতিটি চোখ থেকে বের হয়ে এই সরু পথে গিয়ে ফিউজে পৌঁছায়। এরপর শাখা-প্রশাখায় ছড়িয়ে যায়।
