হাতে খালি অস্ত্র নিয়ে নিথর হয়ে দাঁড়িয়ে রইল ডেভিড। পিস্তলের শূন্য চোখ খুঁজে নিল তাকে। ডেভিড দেখল আরবীয়ের চোখ সরু হয়ে গেল আর হঠাৎ করেই খুনীর মতো হয়ে উঠল লোকটা। বুঝতে পারল হাতের মুঠোয় পেয়েছে ডেভিডকে। ট্রিগারে চেপে বসল আঙুল।
ঠিক এই রেঞ্জে হোস পাইপের মতো আঘাত করবে বুলেট। নড়ে উঠল ডেভিড, লাফ দিল সিঁড়ির নিচে; কিন্তু জানে যে দেরি হয়ে গেছে। আরবীয় লোকটা যেই মুহূর্তে গুলি করল ঠিক সেই মুহূর্তে ডেভিডের পাশ থেকে গর্জে উঠল একটা রিভলবার।
অর্ধেক মাথা কেটে গেল লোকটার। পিছনের সাদা দেয়ালে ছড়িয়ে পড়ল খুলির মাঝে থাকা হলুদ পদার্থ। ট্রিগারে চেপে বসা আঙুল ঝাঁঝড়া করে দিল মাথার উপরে থাকা আঙুল লতা।
পাশে তাকিয়ে ব্রিগকে দেখতে পেল ডেভিড। মৃত সিকিউরিটি গার্ডের পিস্তল হাতে। এক মুহূর্ত পরস্পরের দিকে তাকিয়ে রইল দু’জনে। এরপরই নেমে গিয়ে অন্য দুই মৃত আরবের কাছে গেল ব্রিগ। প্রতিবারে একজনের খুলিতে ঢুকিয়ে দিল একটা করে বুলেট।
ঘুরে দাঁড়িয়ে হাত থেকে উজি ফেলে বাগানের দিকে দৌড় দিল ডেভিড।
মৃত আর আহতরা পড়ে আছে পাশাপাশি। মানবতার খণ্ডিত অংশ। আহতদের মৃদু গোঙানি, একটা শিশুর তারস্বরে কান্না, মায়ের কণ্ঠস্বর শোনা গেল সব চিৎকার ছাপিয়ে।
সারা বাগানময় ছড়িয়ে আছে রক্ত। সাদা দেয়ালের উপরেও ছোপ ছোপ রক্ত। ব্যান্ডস্ট্যান্ডে একজন বাদকের গায়ের উপর দিয়ে ধুলামাখা রক্ত বেরিয়ে আসছে। মসলাদার খাবার আর ছড়িয়ে পড়া ওয়াইনের গন্ধের সাথে রক্তের গন্ধও মিশে গেল। আরো পাওয়া গেল প্লাস্টার, ধুলা আর পোড়া বিস্ফোরকের গন্ধ।
ধোয়া আর ধুলার পর্দায় ঢাকা পড়লেও বাগানের ভগ্নদশা চোখ এড়ালো না। উড়ন্ত লোহার কল্যাণে গোড়া থেকে উঠে এসেছে জলপাই গাছ, ভিতরের সাদা কাঠ দেখা যাচ্ছে। আহতরা হামাগুড়ি দিচ্ছে ভাঙা গ্লাস আর প্লেটের টুকরার উপর। কাঁদছে লোকগুলো, চিৎকার করছে, ফিসফিস করে প্রার্থনা করছে পরিত্রাণের জন্যে।
সিঁড়ি বেয়ে নেমে এলো ডেভিড। পা দুটো মনে হলো আপনাতেই চলছে। পেশী সব বোবা হয়ে গেছে। বোধশক্তি লোপ পেয়েছে যেন তার।
ভেঙেপড়া অলিভ গাছগুলোর একটার নিচে দাঁড়িয়ে আছে জো। তাকে পূর্বের চেয়েও প্রকাণ্ড দেখাচ্ছে। শক্তিশালী পাদুটো দুপাশে ছড়িয়ে আছে, মাথা পিছন দিকে হেলে আছে আর মুখ আকাশপানে। কিন্তু চোখ দুটো বন্ধ আর চেহারায় ফুটে আছে নিঃশব্দ কান্না হাতের মাঝে হান্নাহর মৃতদেহ।
হান্নাহর মাথা থেকে খসে পড়েছে বিয়ের ওড়না, উজ্জ্বল তামাটে রঙের চুলের গোছা ঝুলে আছে পেছনে মাটিতেই পড়ে গেছে প্রায়। পাদুটো আর একটা হাত প্রাণহীনভাবে ঝুলে আছে পাশে। দুধ-সাদা মুখমণ্ডলে পরিষ্কারভাবে ফুটে আছে সোনালি তিলগুলো। ওয়েডিং গাউনের মাঝে ফুলের পাপড়ির মতো ফুটে আছে রক্তাক্ত ক্ষত।
চোখ সরিয়ে নিল ডেভিড। জোকে এ অবস্থায় দেখতে পারছে না ও। তার চেয়ে বরঞ্চ আস্তে আস্তে বাগানের এপাশে এসে আতঙ্ক নিয়ে খুঁজতে লাগল ডেবরাকে। ডেবরা! চাইল গলা উঁচিয়ে ডাকতে। কিন্তু খসখস শব্দ ছাড়া আর কিছুই বের হলো না। ঘন কালো রক্তে হড়কে গেল পা। ডেভিড হোঁচট খেয়ে পড়ে গেল অজ্ঞান নারীদেহের উপর। ফুলের নকশা করা পোশাকে নারীদেহটি উপুড় হয়ে শুয়ে আছে। হাত দুটো দুপাশে ছড়ানো। ডেবরার মাকে চিনতে পারল না ডেভিড।
ডেবরা।’ তাড়াতাড়ি করতে চাইল সে। কিন্তু পা দুটো কথা শুনল না। এরপরই ডেবরাকে দেখতে পেল সে। ঠিক দেয়ালের কোণে যেখানে রেখে গিয়েছিল তাকে, সেখানেই আছে ডেবরা।
‘ডেবরা! ডেভিড নিজের হৃৎপিণ্ডের স্পন্দন শুনতে পেল যেন। দেখে মনে হচ্ছে অক্ষত আছে ডেবরা। মার্বেল গ্রেসিয়ান মূর্তির নিচে হাঁটু গেড়ে বসে আছে। চুলে তখনো ফুল, পোশাক উজ্জ্বল, পরিপাটি।
দেয়ালের দিকে মুখ করে বসে আছে ডেবরা। চট করে দেখে মনে হলো যেন প্রার্থনা করছে। কালো চুলের ঢল মুখের সামনের অংশ ঢেকে রেখেছে। মুখের উপর দু’হাত দিয়ে রেখেছে ডেবরা।
‘ডেবরা। ডেবরার পাশে গিয়ে ধপ করে বসে পড়ল ডেভিড। আস্তে করে হাত রাখল কাঁধে।
‘তুমি ভালো আছো তো? আস্তে করে হাত নামালো ডেবরা মুখের উপর থেকে। সাথে সাথে যেন বরফের মতো জমে গেল ডেভিড। ডেবরার হাত ভর্তি রক্ত। উজ্জ্বল লাল রক্ত। ঠিক ক্রিস্টালের গ্লাসে ওয়াইনের মতোই উজ্জ্বল।
‘ডেভিড’, ফিসফিস করে উঠল ডেবরা। আস্তে করে ঘুরলো ডেভিডের দিকে। তুমি এসেছো?”
শব্দ করে হতাশার শ্বাস বের হয়ে এলো ডেভিডের বুক চিরে। দেখতে পেল ডেবরার চোখ বেয়ে গড়িয়ে পড়ছে রক্ত। ঘন চোখের পাপড়িতে জড়িয়ে আছে জেলির মতো পদার্থ। অনিন্দ্যসুন্দর মুখশ্রী হয়ে উঠেছে রক্তাক্ত মুখোশ।
‘তুমি এসেছো ডেভিড?’ আবারো জানতে চাইল ডেবরা। অন্ধের মতো কিছু শোনার আশায় কান পেতে রইল ডেরা।
‘ওহ, ঈশ্বর ডেবরা।’ ডেবরার মুখের দিকে তাকিয়ে রইল ডেভিড।
‘আমি দেখতে পাচ্ছি না ডেভিড!’ হাত বাড়ালো ডেবরা। ওহ ডেভিড আমি দেখতে পাচ্ছি না।’
নিজের হাতে ডেবরার ভেজা হাত তুলে নিল ডেভিড। মনে হলো বুক ভেঙ্গে গেল তার।
.
ইন কারেম গ্রামের উপর আকাশ জুড়ে দাঁড়িয়ে আছে হাদাস্সাহ হাসপাতালের আধুনিক ভবন। দ্রুতগতিতে এসে পৌঁছালো অ্যামবুলেন্সের দল। ফলে বেঁচে গেল অনেক সংকটাপন্ন রোগী। হাসপাতাল ভরে গেল হঠাৎ যুদ্ধে আক্রান্ত আহতে-নিহতে।
