ওয়াইনের পাত্র আশির্বাদ করে দিল রাব্বি। এখান থেকেই একত্রে পান করল বর-কনে। এরপর জো তাকাল হান্নাহর দিকে। ওর মুখের উপরের অংশ এখনো ওড়না দিয়ে ঢাকা। হান্নাহর ডান হাতের বুড়ো আঙুলে সোনার আংটি পরিয়ে দিল জো।
‘মোশি এবং ইস্রায়েলের নিয়মানুসারে এই আংটির মাধ্যমে আমার অংশ হলে তুমি।
এরপর নিজের গোড়ালির নিচে গ্লাস ভেঙ্গে দিল জো। আর এই তীক্ষ্ণ শব্দের সাথে সাথে শুরু হলো গান-সুর আর আনন্দ-উল্লাস। জোর পাশ থেকে সরে ভিড়ের মাঝে পথ করে ডেবরার দিকে এগিয়ে গেল ডেভিড।
হলুদ রঙের গাউন পরে এসেছে ডেবরা। কালো চুলের মাঝে গুঁজে দিয়েছে তাজা ফুল। কোমর ধরতেই সুঘ্রাণ পেল ডেভিড। বিড়বিড় করে ডেবরার কানে কানে বলল, এরপর তুমি, আমার সুন্দরী! একইভাবে উত্তর দিল ডেবরাও ‘হ্যাঁ, প্লিজ!
হান্নাহর হাত ধরে সাজিয়ে রাখা নাচের মঞ্চে উঠে গেল জো। হালকা। সুরের সাথে বাদক দল বাজানো শুরু করল আর উপস্থিত সব তরুণ-তরুণীর দলও উঠে গেল নাচতে। বয়ষ্করা তালপাতার নিচে সাজানো লম্বা টেবিলের চারপাশে গিয়ে বসে পড়ল।
সমস্ত হাসি-আনন্দের মাঝেও খানিকটা নিরানন্দ যোগ করল ইউনিফর্মের দল। প্রতি দুই জনের একজন এসেছে যুদ্ধ সাজে। বাগানের প্রধান ফটক আর রান্নাঘরের প্রবেশদ্বারে কাঁধে উজি মেশিনগান নিয়ে দাঁড়িয়ে আছে প্যারাট্রুপার প্রহরী। সিক্রেট সার্ভিসের লোকদেরকে খুঁজে পাওয়াটাও সহজ। সিভিলিয়ান পোশাকে হাসি-বিহীন, সতর্ক চোখ-মুখ নিয়ে ঘুরে বেড়াচ্ছে অতিথিদের মাঝে।
একসাথে নাচলো ডেভিড আর ডেবরা। ডেভিডের হাতের মাঝে বেশ হালকা আর উষ্ণ মনে হলো ডেবরাকে। বাজানো থেমে গেলে পর অপেক্ষাকৃত চুপচাপ একটা কোণায় গেল দুজনে। একসাথে দাঁড়িয়ে অন্য অতিথিদের নিয়ে কথা বলতে লাগল।
‘তুমি একটা যাচ্ছেতাই। ডেভিডের কাঁধে ভর দিল ডেবরা। আমি তৃষ্ণায় মরে যাচ্ছি। কিছু এনে দেবে না?
‘এক গ্লাস ঠাণ্ডা সাদা ওয়াইন?’ পরামর্শ দিল ডেভিড।
হুম, তাই ভালো।’ হাসল ডেবরা। এক মুহূর্ত দাঁড়িয়ে একে অন্যকে দেখল দু’জনে। হঠাৎ করেই কেমন একটা দুঃখবোধ জেগে উঠল ডেভিডের মাঝে। কেমন একটা হতাশা। মনে হলো কিছু একটা হারাতে বসেছে সে। এটি এমন একটি অনুভূতি যে মনে হলো বুকের মাঝে ব্যথা শুরু হয়ে গেল। মুছে যেতে লাগল সব হাসি-আনন্দ।
‘কি হয়েছে, ডেভিড?’ ডেবরার নিজের অভিব্যক্তিও বদলে গেল। শক্ত করে ধরল ডেভিডের হাত। কিছু না। তাড়াতাড়ি ডেবরার কাছ থেকে সরে এলো। চেষ্টা করছে নিজেকে সামলাতে। কিছু না। আবারো বলে উঠল ডেভিড। কিন্তু শক্ত কিছু একটা মনে হলো আটকে গেছে পেটের মাঝে। ‘আমি তোমাকে ওয়াইন এনে দিচ্ছি। ডেবরার কাছ থেকে সরে এলো ডেভিড।
বারের দিকে এগিয়ে গেল ডেভিড। চোখে চোখ পড়তেই হাসল ব্রিগ। আড়চোখে তাকাল বাগানের দিকে। বাবার সাথে দাঁড়িয়ে আছে জো। এক হাতে পত্নীকে ধরে রেখে হাসছে। মুখের কাপড় সরিয়েছে হান্নাহ। মেক আপের নিচ থেকে উঁকি দিতে শুরু করেছে তিল। তুষার-শুভ্র লেসের ফাঁক গলেও পরিষ্কার বোঝা যাচ্ছে। ওদের দিকে তাকিয়ে হাত নাড়ল ডেভিড। কিন্তু থামলো না। এগিয়ে গেল খোলা বারের দিকে। বাগানের শেষমাথায় অবস্থিত বারে যেতে যেতেও টের পেল যে দুঃখের অনুভূতিটা এখনো তার ভেতরে দুমড়ে কাঁদছে। এই মুহূর্তে জোর সাথে কথা বলতে চায় না সে।
যেই মুহূর্তে ডেবরার কাছ থেকে সরে এলো ডেভিড, ঠিক সেই মুহূর্তেই বাগানের লোহার গেইট দিয়ে ভেতরে ঢুকলো সাদা জ্যাকেট পরা ওয়েটারের দল। সবার হাতেই সুস্বাদু খাবারের থালা। সূর্যের আলোতেও দেখা গেল গরম ধোঁয়া উড়ছে। মাছ-মাংস আর মসলার গন্ধে ম ম করে উঠল বাতাস। হর্ষধ্বনি ভেসে হলো অতিথিদের কাছ থেকে।
টেবিল, রান্নাঘরের দরজা আর ঘর পর্যন্ত রাস্তা পাতা হয়েছে ওয়েটারদের জন্য।
ডেভিডের খুব কাছ দিয়ে হেঁটে গেল ওয়েটারের দল। হঠাৎ করেই খাবারের উপর থেকে লাইনের দ্বিতীয় ওয়েটারের দিকে মনোযোগ দিল ডেভিড। মাঝারি উচ্চতা আর গাঢ় গাত্রবর্ণ লোকটার মেহগনির মতো চেহারায় ঘন মোচ।
ঘামছে লোকটা। এ কারণেই ভালো করে তাকিয়ে রইল ডেভিড। ঘামে চকচক করছে লোকটার মুখ। মোচের উপর দিয়ে চিবুকে গড়িয়ে পড়ল ঘামের ফোঁটা। বিশাল উঁচু করে ধরতেই দেখা গেল সাদা জ্যাকেটের বাহুমূলে ঘামের দাগ।
ডেভিড তাকাতেই মুহূর্তের জন্য চোখাচোখি হলো দু’জনের। ডেভিড বুঝতে পারল লোকটার মনের মাঝে কিছু একটা চলছে–ভয়, সম্ভবত অথবা প্রফুল্লতা। ওয়েটার বুঝতে পারল ডেভিড তাকিয়ে আছে। তাই চট করে চোখ সরিয়ে নিল।
ডেভিড বুঝতে পারল কিছু একটা ঘটতে যাচ্ছে। কেন যেন সন্দেহ এলো মনে। পাথরের সিঁড়ি দিয়ে ত্রি-মূর্তি এগিয়ে টেবিলের দিকে।
ওয়েটার আবারো ফিরে তাকাল ডেভিডের দিকে। দেখল এখনো তাকিয়ে আছে ডেভিড। আস্তে করে লোকটা নিজের সঙ্গীদেরকে কিছু একটা বলে উঠল, দেখতে পেল ডেভিড। সে লোকটাও ফিরে তাকাল, ডেভিডের দিকে। আর এই দৃষ্টি দেখে ডেভিডের মাথা আর বুকের মাঝে বাজতে লাগল সতর্ক ঘণ্টা। বুঝতে পারল কিছু একটা ঘটতে যাচ্ছে। বিপজ্জনক আর দুর্বিসহ। এ ব্যাপারে আর কোন সন্দেহ রইল না তার।
হন্যে হয়ে প্রহরীদের খোঁজে চারপাশে তাকাল ডেভিড। ওয়েটারদের লাইনের শেষে দেখা যাচ্ছে দু’জনকে। একজন ডেভিডের পাশে গেইটের কাছে।
