প্রধান ফটকের কাছে সার্চ করে দেখা হলো তাদের। এরপর ধর্মপ্রাণ পূজারীদের সাথে মিশে এগিয়ে চলল দেয়ালের দিকে। বাধার কাছে এসে চুপচাপ দাঁড়িয়ে রইল অনেকক্ষণ। ডেভিডের মনের মাঝে জেগে উঠল গহীনে থাকা গোত্রীয় স্মৃতি। কেমন শূন্য একটা অনুভূতি যা পূর্ণ হবার অপেক্ষায় আছে।
দেয়ালের মুখ দিয়ে প্রার্থনা করছে সকলে। এদের অনেকেই ইহুদিদের লম্বা কালো কোট পরে এসেছে। অন্যদিকে এ পুরুষদের তুলনায় ডান দিকে মোটামুটি চুপচাপ নিজেদের প্রার্থনা উৎসর্গ করছে নারীরা।
অবশেষে কথা বলে উঠল জো। গলার স্বরে খানিকটা অস্বস্তি। আমার মনে হয় আমারও গিয়ে শ’মা বলা উচিৎ।
হ্যাঁ। একমত হলো হান্নাহ। আমার সাথে আসবে ডেবরা?
একটু দাঁড়াও।’ ডেভিডের দিকে তাকাল ডেবরা। হ্যান্ডব্যাগ থেকে কিছু একটা বের করে এগিয়ে দিল ডেভিডের দিকে। আমি বিয়ের জন্য তৈরি করেছিলাম এটা। কিন্তু এখনই পরে নাও।
একটা ইয়ামুলকা এগিয়ে দিল ডেবরা। কালো সাটিনের উপর অ্যামব্রয়ডারি করা প্রার্থনা টুপি।
‘জোর সাথে যাও। ও তোমাকে দেখিয়ে দেবে কী করতে হবে। ডেভিডকে জানাল ডেবরা।
নারীদের ভিড়ের কাছে চলে গেল মেয়েরা। মাথায় টুপি পরে নিল ডেভিড আর জোকে অনুসরণ করে নিচে দেয়ালের দিকে এগিয়ে গেল। একজন শামাস এগিয়ে এলে তাদের দিকে। লম্বা, রূপালি দাড়িওয়ালা এক বৃদ্ধ। ডেভিডকে সাহায্য করল তার ডান বাহুতে ছোট্ট একটা চামড়ার থলে বেঁধে নিতে। এতে আছে টোরাহর একটা অংশ।
‘তো এখন তুমি এই শব্দগুলোকে তোমার হৃদয় আর আত্মায় ধারণ করে নাও আর তোমার ডান বাহুতেই তাদেরকে রাখবে।’
এরপর একটা টালিট ছড়িয়ে দিল ডেভিডের কাঁধে, উল দিয়ে বোনা একটা শাল। এরপর পথ দেখিয়ে দেয়ালের কাছে নিয়ে গেল আর শামাসদের সাথে সাথে বলতে লাগল ডেভিড :
‘শোন, ও ইস্রায়েল, প্রভু, আমাদের ঈশ্বর, প্রভু মাত্র একজন
বহুদিন আগে শেখা শব্দ মনে পড়ে গেল ডেভিডের। চোখ তুলে তাকাল বিশাল পাথরের ব্লক দিয়ে বানানো দেয়ালের দিকে। টাওয়ারের মতো উঁচু দেয়াল উঠে গেছে উপরের দিকে। ওর পূর্বে আসা হাজারো ধর্মপ্রাণ কাগজে নিজেদের প্রার্থনা লিখে গুঁজে রেখে গেছে পাথরের জয়েন্টের মাঝে। চার পাশে গুনগুন করে প্রার্থনা করছে সবাই। ডেভিডের মনে হলো যেন সে কল্পনা করতে পারছে যে প্রার্থনার সোনালি স্তম্ভ উঠে গেছে এই পবিত্র ভূমি থেকে স্বর্গপানে।
এরপর ইহুদি কোয়ার্টারে যাবার সিঁড়িতে উঠল তারা। পেটের মাঝে কেমন যে ভালো লাগার একটা অনুভূতি শিরশির করে উঠল।
সেই সন্ধ্যায় ছাদে বসে গোল্ডস্টার বিয়ার পান করার সময় অবচেতনেই কথা বলার বিষয় হয়ে উঠল ঈশ্বর আর ধর্ম।
জো বলে উঠল, আমি একজন ইস্রায়েলি, তারপর একজন ইহুদি। প্রথমে আমার দেশ; তারও অনেক পরে আসবে ধর্ম।
কিন্তু দেয়ালের কাছে দাঁড়িয়ে প্রার্থনা করার সময় তার মুখের অভিব্যক্তি মনে পড়ে গেল ডেভিডের।
বহু রাত পর্যন্ত চলল গল্প। নিজের ধর্মীয় ঐতিহ্যের বিশালত্ব উপলব্ধি করল ডেভিড।
‘আমি এ সম্পর্কে আরো বেশি কিছু জানতে চাই।’ স্বীকার করল সে। ডেবরা কিছুই বলল না। কিন্তু ডেভিডের লাগেজ গুছিয়ে দেয়ার সময় পরিষ্কার ইউনিফর্মের উপর রাখল হারমান ওকের এক কপি “দিজ ইজ মাই গড।”
এটা পড়ে ফেলল ডেভিড। এরপর যখন মালিক স্ট্রিটে এলো জানতে চাইল আরো কিছু। প্রতিবারই বই নির্বাচন করে দিল ডেবরা। প্রথমটাতে ইংরেজি, এরপর হিব্রুতে। ধীরে ধীরে এ ভাষার উপর দখল বেড়ে যেতে লাগল ডেভিডের। এ সমস্ত বই সবই যে ধর্মের উপর লেখা তা নয়। এদের মাঝে ইতিহাস আর ঐতিহাসিক উপন্যাসও থাকায় আস্তে আস্তে সভ্যতার এই প্রাচীন কেন্দ্রভূমি নিয়ে ডেভিডের আগ্রহ বৃদ্ধি পেল। তিন হাজার বছর ধরে যুদ্ধভূমি আর নানান দোলাচলে দুলছে এই ভূমি।
ব্যাগের মাঝে ডেবরা যাই ভরে দিত, তাই পড়ে ফেলা অভ্যাস হয়ে গেল ডেভিডের। যোসেফাস ফ্লেভিয়াস থেকে লিওন ইউরিস পর্যন্ত।
এর মাধ্যমে ঘুরে বেড়ানোর আগ্রহও বেড়ে গেল। অবস্থা এমন দাঁড়াল যে সময় পেলেই দু’জন একসাথে ঘুরে বেড়াতে লাগল ঐতিহ্যবাহী জায়গাগুলোতে। এর শুরু হলো মাসাডার পাহাড়ের মাথায় থাকা দুর্গ থেকে। যেখানে রোমের কাছে আত্মসমর্পণ না করে একে অন্যকে খুন করেছিল গোড়ারা। এরপর তেমন একটা পরিচিতি নেই–এমন ঐতিহাসিক জায়গাগুলোতেও ঘুরে বেড়াতে লাগল তারা।
বহুক্ষণ পর্যন্ত সূর্যের আলো থাকা লম্বা দিনগুলোতে দু’জনে লাঞ্চ করতে কোন রোমান ধ্বংসাবশেষের উপরে বসে, তাকিয়ে দেখতে মরুভূমির উদরে জন্ম নেয়া ছোট্ট কাঁটা গাছের উপর বসে আছে শকুন। এরপর হয়তো দু’জনে মিলে খুঁজে দেখতো শেষবারের বৃষ্টিতে কোন প্রাচীন কয়েন বা পুরাতত্ত্ব উঠে এসেছে কিনা।
তাদের চারপাশে ছড়িয়ে আছে কমলা আর সোনালি পাথরের লম্বা চূড়া। এত পরিষ্কার ঝকঝকে আলোয় মনে হচ্ছে বহুদিন ধরেই এসব দেখছে তারা। চারপাশ এতটাই নীরব যেন পৃথিবীর শেষ আর একমাত্র মানব-মানবী তারা দু’জনে।
এই দিনগুলোর মতো এত সুন্দর দিন আর আসেনি ডেভিডের জীবনে। স্কোয়াড্রনের স্টান্ডবাই থাকাকালীন কষ্টকর ঘণ্টাগুলোতে এর অর্থ আর উদ্দেশ্য খুঁজে পেয়েছে ডেভিড। আর দিন শেষে সব সময়েই আনন্দ, উঞ্চতা আর ভালোবাসা নিয়ে অপেক্ষা করতে মালিক স্ট্রিটে তার ঘর।
