লাল-কলির গাছের নিচের লনে সবাইকে শুইয়ে দেয়া হলো। তাড়াতাড়ি কাছের হোস্টেলের চাদর এনে ঢেকে দেয়া হলো সবাইকে। সবুজ ঘাসের উপর সাদা কাপড়ের লম্বা সারি এমন এক স্মৃতি হয়ে রইল ডেভিডের মাঝে যা মনে হয় না কখনো ভুলবে।
সাইরেন বাজিয়ে ছাদের ফ্ল্যাশ লাইট জ্বালিয়ে এসে গেল অ্যাম্বুলেন্স। বিস্ফোরণস্থল কর্ডন করে দিল পুলিশ। ডেভিড আর ডেবরা আস্তে আস্তে হেঁটে এগিয়ে গেল পার্কিং লটে থাকা মার্সিডিজের দিকে। দু’জনেরই গায়ে মাখামাখি হয়ে আছে রক্ত আর ধুলা; বাকরুদ্ধ হয়ে গেছে যন্ত্রণাকাতর শব্দ শুনে আর মৃত্যুদৃশ্য দেখে। চুপচাপ গাড়ি চালিয়ে পৌঁছে গেল মালিক স্ট্রিটে। গোসল করে ধুয়ে ফেলল ময়লা আর মৃত্যুর গন্ধ। রক্ত ধোয়ার জন্য ঠাণ্ডা পানিতে ডেভিডের ইউনিফর্ম ভিজিয়ে দিল ডেবরা। এরপর কফি বানিয়ে আনল। বিশাল বিছানায় পাশপাশি বসে কফি পান করল দুজনে।
‘ভালো আর শক্তিশালী ছিল এমন অনেক কিছু মারা গেছে এখানে, আজ রাতে।’ বলে উঠল ডেবরা।
‘মৃত্যু ততটা খারাপ নয়। এটি একটি প্রাকৃতিক ব্যাপার আর সবকিছুর যৌক্তিক উপসংহার। কিন্তু আমাকে ভাবাচ্ছে ভাঙাচোরা দেহ নিয়ে যারা বেঁচে গেল তারা। মৃত্যুর প্রতি তা ও শ্রদ্ধা হয় কিন্তু পঙ্গুত বড় কষ্ট।
চোখে ভয় নিয়ে তাকাল ডেবরা, ‘এটা বেশ নিষ্ঠুর ডেভিড।
‘আফ্রিকাতে একই সাথে সুন্দর আর ভয়ঙ্কর একটা প্রাণী আছে নাম কৃষ্ণবর্ণ অ্যান্টিলোপ। দলবদ্ধ হয়ে প্রায় একশ একসাথে ঘুরে বেড়ায়, কিন্তু তাদের কেউ যদি আক্রান্ত হয় কোন শিকারির হাতে বা সিংহের হাতে, দলপ্রধান সে সদ্যসকে দল থেকে বের করে দেয়। আমার মনে আছে আমার বাবা আমাকে বলেছিল যে, যদি তুমি বিজয়ী হতে চাও তাহলে তোমার পরাজিত সঙ্গীদের এড়িয়ে যেতে হবে। কেননা হতাশা সংক্রামক।
‘ঈশ্বর, ডেভিড, এটা তো জীবনকে দেখার বেশ শক্ত একটা পথ।’
সম্ভবত’, একমত হলো ডেভিড। কিন্তু দেখো জীবন সত্যিই কষ্টের।’
প্রথমবারের মতো তাদের ভালোবাসায় যোগ হলো নিরাশা। কেননা বিচ্ছেদের ঘণ্টা বাজছে। সারা জীবন এটি তাড়িয়ে বেড়াবে তাদের।
সকালবেলা নিজের স্কোয়াড্রনে যোগ দিতে গেল ডেভিড। মালিক স্ট্রিটের ঘরে তালা লাগাল ডেবরা।
.
সতেরোদিন ধরে প্রতিদিন দু’বার ওড়াউড়ি করল ডেভিড। আবার কখনো তিনবার। সন্ধ্যাবেলা যদি রাতের জন্য কোন ফ্লাইং না থাকতো, তাহলে লেকচার শোনা আর ট্রেনিং ফিলস দেখতে হতো। আর এরপর তাড়াতাড়ি খেয়ে ঘুম।
কর্নেল লে, ডফিন, একদিন একসাথে প্লেন চালালো ডেভিডের সঙ্গে। দ্রুত তীক্ষ্ণ দৃষ্টি আর শান্ত স্বভাবের মানুষটা ছোটখাটো। দ্রুত নিজের সিন্ধান্ত নিয়ে নিল কর্নেল।
প্রথম দিনের পরে জো আর ডেভিড একসাথে প্লেন চালালো। ডেভিড জোর লকার থেকে নিজের জিনিস আন্ডারগ্রাউন্ড কোয়ার্টারের স্ট্যান্ডবাই ক্রুদের লকারে নিয়ে গেল।
এই সতেরো দিনের শেষদিনগুলোতে লৌহকঠিন বন্ধুত্ব নতুন এক উচ্চতায় পৌঁছে গেল। ডেভিডের উজ্জ্বলতা আর আঘাতের প্রচণ্ডতা দক্ষভাবে ভারসাম্য তৈরি করলো জো’র পাথরের মতো কঠিন নির্ভরতার সাথে।
ডেভিড সবসময় একটা স্টার হিসেবেই থাকে; অন্যদিকে জোর জন্মই হয়েছে সংগত প্রদানের জন্য। সোজা সাপ্টা মানুষ, যার উপর চোখ বন্ধ করে নির্ভর করা যায়। এমন একজন উইংম্যান যার নিজের কোন উচ্চাকাংখা নেই। যার প্রতিভা হলো আঘাত করার জন্য নাম্বার ওয়ানকে লক্ষ্যে পৌঁছে দেয়া।
দ্রুত অলঙ্ঘনীয় একটা দল গড়ে তুলল দুজনে মিলে। এতটাই সুদক্ষ হলো যে বাতাসের মাঝে যোগাযোগের ক্ষেত্র প্রায় একস্ট্রা সেনসরী। যেন পাখির দুটি পালক বা মাছের আঁশ।
পেছনে জো বসে থাকা ডেভিডের জন্য মিলিয়ন ডলারস ইনস্যুরেন্সের মতো। ডেভিড জানে যতক্ষণ জো আছে ওর পেছনে কোন ভয় নেই। তাই সে মনোযোগ দেয় তার বিশেষ ক্ষমতাধর দৃষ্টিশক্তি আর তড়িৎ সিদ্ধান্ত গ্রহণ ক্ষমতার উপর। ডেভিড একজন গান ফাইটার। আর এই সার্ভিসে গান ফাইটারদেরই জয় জয়কার।
আই.এ.এফ. সর্বপ্রথম এয়ার-টু এয়ার মিসাইলের খামতি নিয়ে আলোচনা। শুরু করে। আর তাই ফিরে যায় ক্লাসিক টাইপের আকাশযুদ্ধে। কখনো কখনো মিসাইল নির্বোধের মতো আচরণ করতে পারে। এমনও হতে পারে কম্পিউটার এক ধরনের প্যাটার্ন সেট করল আর বাস্তবে ঘটল উল্টো। এয়ার টু- এয়ার কমব্যাটে তিনশ মিসাইল নিক্ষেপ করা হলে মাত্র একটা হয়তো টার্গেটে লাগবে।
যাই হোক, যদি এমন হয় যে ঘড়ির ষষ্ঠ কাঁটার মতো অবস্থানে গান ফাইটার এগিয়ে আসছে তোমার দিকে, যার আঙুল জোড়া ৩৩-এমএম কামানের ট্রিগারের উপর, মাত্র এক মিনিটে যে কিনা বারো হাজার শেল ঢেলে দিতে পারবে তোমার উপর, তাহলে তোমার সুযোগ আরো হালকা হয়ে যাবে তিনশ থেকে একের তুলনায়।
এছাড়াও জোর আরো একটা বিশেষ গুণ আছে। মিরেজের সামনের দিকের স্ক্যানিং রাডার বেশ জটিল আর নাজুক ধাচের ইলেকট্রনিক্স ডিভাইস দিয়ে তৈরি। পুরো মেকানিজম চালাতে হয় বাম হাত দিয়ে। আর বাম হাতের আঙুলগুলো এত দ্রুত জায়গা বদল করে যেন পিয়ানো বাজাচ্ছে কোন পিয়ানিস্ট। কিন্তু এর চেয়েও জরুরি হচ্ছে এ যন্ত্রকে ‘অনুভব করা। এর কাছ থেকে সর্বোচ্চ কাজ আদায়ের জন্য ভালোবাসার স্পর্শ। এই অনুভব আছে। জোর কাছে। ডেভিডের নেই।
