প্রথম বারের মতো ডেভিড আনন্দিত হয়ে উঠল যে তার কাছে এসেছে ডেবরা। ডেবরার তুলনায় সে নিজে ব্যাপারটাকে বেশ হালকা ভাবে নিয়েছিল।
আমি তোমাকে মিস করব।’ জানিয়ে দিল ডেভিড।
আর আমি তোমাকে’, উত্তর দিল ডেবরা।
‘চলো বাসায় যাই।
‘হ্যাঁ, একমত হলো ডেবরা। ছুরি কাঁটাচামচ রেখে দিল একপাশে। আমি যেকোন সময় খেতে পারব।’
যাইহোক বেলজিয়াম হাউজ থেকে বের হবার সাথে সাথে চিৎকার করে উঠল ডেবরা- ‘ধুত্তোরি, আমাকে এই বইগুলো আজকেই ফেরৎ দিতে হবে। আমরা লাইব্রেরি হয়ে যাই? আমি দুঃখিত ডেভি। এক মিনিটের বেশি লাগবে না।’
তো, তারা আবারো উঠে এলো প্রধান ছাদে। পার হয়ে গেল স্টুডেন্টস ইউনিয়ন রেস্টুরেন্টের আলো। দু’জন একসাথে এগিয়ে চলল চৌকোনা লাইব্রেরি টাওয়ারের দিকে। দ্রুত নেমে আসা অন্ধকারের জন্য ইতিমধ্যে আলো জ্বলে উঠতে শুরু করেছে লাইব্রেরির জানালাগুলোতে। লাইব্রেরির সিঁড়ি দিয়ে উঠে কাঁচের দরজার কাছে থেমে যেতে হলো তাদেরকে। একদল ছেলেমেয়ে বের হয়ে আসল ভেতর থেকে। একপাশে সরে তাদেরকে জায়গা দিল। ডেভিড ও ডেবরা।
যে পথ দিয়ে তারা এসেছে সেদিকে তাকিয়েছিল দু’জনে। প্লাজা, ছাদ, লাল-কলির গাছগুলো দেখা যাচ্ছে রেস্টুরেন্টের দিকে।
হঠাৎ করে সন্ধ্যার অন্ধকার চিরে দিল প্রচণ্ড এক বিস্ফোরণের সাদা আলো রেস্টুরেন্টের কাঁচের জানালা ভেঙ্গে কাঁচ উড়তে লাগল বৃষ্টির মতো। মনে হলো যেন পাথর চূড়ায় ঝড় শুরু হয়েছে। ফোয়ারার মতো চারপাশে ছুটছে ভয়ঙ্কর কাঁচের কণা। সেই মুহূর্তে জানালার নিচে দিয়ে চলা দুটা মেয়েকে ভয়ঙ্কর ভাবে আঘাত করল এই ফোয়ারা।
বিস্ফোরণের আলোর সাথে সাথে সারা ছাদ লণ্ডভন্ড হয়ে গেল। বিস্ফোরণের ধাক্কা লাল-কলির গাছে হয়ে ডেভিড আর ডেবরার দিকেও ধেয়ে এলো। লাইব্রেরি বারান্দার পিলারের সাথে ধাক্কা খেলো দু’জনে। বাতাসের ধাক্কায় মনে হলো কানের পর্দা ফেটে যাবে ফুসফুস থেকে সব বাতাস গেল বের হয়ে।
নিজের কাছে ডেবরাকে টেনে নিল ডেভিড। বিস্ফোরণের পরেও ধরে রাখল। চারপাশ হঠাৎ করে মনে হলো ঢেকে গেল নৈশব্দের অন্ধকারে। খানিকটা ধাতস্থ হয়েই তাকিয়ে দেখল যে রেস্টুরেন্টের ভাঙা জানালা দিয়ে বের হচ্ছে ফসফরাসের সাদা ধোয়ার মেঘ; গড়িয়ে গড়িয়ে এগিয়ে চললো ছাদের দিকে।
এরপরই বিভিন্ন শব্দ শুনতে পেল দু’জনে। কাঁচ ভাঙার মচমচ শব্দ, প্লাস্টার আর ফার্নিচার ভাঙার শব্দ। চিৎকার ভেসে এলো নারীকণ্ঠ থেকে আর এতেই ভঙ্গ হলো আতঙ্কের নীরবতা।
চারপাশ জুড়ে শোনা গেল চিৎকার আর দৌড়াদৌড়ির শব্দ। ডেভিড আর ডেবরার পাশ দিয়ে দৌড়ে যাবার সময় একটা ছাত্র হিস্টিরিয়ার মতো চেঁচাতে লাগল, ‘বোমা! ক্যাফেতে বোমা মেরেছে ওরা।
ভাঙা কাঁচের টুকরার বৃষ্টির কবলে পড়া একটা মেয়ে উঠে দাঁড়িয়ে উদ্দেশ্যহীন ভাবে ছোটাছুটি শুরু করে দিল আর নাকি সুরে কান্নাও করছে। মনে হলো বোধবুদ্ধি সব হারিয়ে গেছে মেয়েটার। প্লাস্টারের ধুলাতে পুরো সাদা হয়ে যাওয়া মেয়েটার স্কার্ট বেয়ে গড়িয়ে পড়ছে গাঢ় রঙের রক্ত।
ডেভিডের হাতের মাঝে কাঁপতে শুরু করল ডেবরা। শুয়োরের দল ফিসফিস করে উঠল সে। ওহ শুয়োরের দল খুনের নেশায় মেতেছে।’
ধোয়ার ভেতর থেকে ধীরে ধীরে বেরিয়ে এলো আরো মানব শরীর। বিস্ফোরণের জন্য শরীরের কাপড় ছিঁড়ে গেছে। ছেঁড়া কাপড় এমনভাবে ঝুলে আছে যে দেখতে হাস্যকর কাকতাড়ুয়ার মতো মনে হচ্ছে। ছাদে উঠে আস্তে করে বসে পড়ল। চোখের উপর থেকে সরিয়ে নিল চশমা। কাকতালীয়ভাবে চশমা ঠিকঠাক জায়গা মতো রয়ে গেছে এখনো। চেষ্টা করল শার্টের টুকরা দিয়ে কাঁচ দুটো পরিষ্কার করে নিতে। চিবুক থেকে গড়িয়ে পড়ছে রক্ত।
‘চলো।’ তাড়া দিল ডেভিড।
‘আমাদের সাহায্য করা দরকার। দুজনে মিলে একসাথে নামতে লাগল সিঁড়ি দিয়ে।
ছাদের একটা অংশ প্রায় ধসে পড়েছে বিস্ফোরণে আটকে ফেলে ছারখার করে দিয়েছে তেইশ জন ছাত্র-ছাত্রীকে, যারা সান্ধ্য খাবার আর আড্ডার আশায় এসেছিল এখানে।
সবাই ছুটে গেল বড় নিচু হলটাতে। রক্তে মাখামাখি হয়ে গেল মেঝে। তাদের কেউ হামাগুড়ি দিচ্ছে, কেউ কাঁদছে। ভাঙা প্লেট-বাটি, ছড়িয়ে থাকা খাবার, এলোমেলো ফার্নিচারের মাঝে উদ্দেশ্যহীন ভাবে ঘুরছে কেউ কেউ। কেউ কেউ এমন বিকৃত হয়ে পড়ে আছে যেন মৃত্যুর নিষ্ঠুর কৌতুকে নিঃশব্দে হাসছে।
পরবর্তীতে সবাই জানতে পারে যে আল ফাতাহ’র দু’জন তরুণী নারী সদস্য ভুয়া কাগজপত্র নিয়ে ভর্তি হয়েছে বিশ্ববিদ্যালয়ে। আর প্রতিদিন একটু একটু করে বিস্ফোরক এনে জড়ো করেছে ক্যাম্পাসে। অবশেষে এই বিস্ফোরণ ঘটিয়েছে সবটুকু বিস্ফোরক জড়ো করে। একটা টেবিলের নিচে পড়ে আছে। টাইমিং ডিভাইস বাধা স্যুটকেস আর সন্ত্রাসী দু’জন হেঁটে হাওয়া হয়ে গেছে। এক সপ্তাহ পরে দামাস্কাস টেলিভিশনে নিজেদের সফলতায় গর্ব করতেও দেখা গেল তাদেরকে।
কিন্তু এখন, এই মুহূর্তে এই বিস্ফোরণের কারণ বা কোন ব্যাখা জানা নেই কারোরই। এতটাই অপ্রত্যাশিত আর এতটাই করুণ যে অবাক হয়ে গেল সকলে। দিশেহারা হয়েও যারা সুস্থ আছে স্থবিরতা কাটিয়ে উঠে চেষ্টা করল আহতদের সেবা করতে, মৃতদেহ সরিয়ে নিতে।
