শেষ কবিতায় এসে দেখল এটা বাকিগুলোর মাঝে সবচেয়ে সংক্ষিপ্ত আর ভালোবাসা নিয়ে লেখা–অথবা এমন কাউকে নিয়ে লেখা যাকে অনেক ভালোবাসা দিয়ে ঘিরে রাখা হলেও চলে গেছে সে। আর হঠাৎ করেই ডেভিড বুঝলে পারল যে ভালো আর জাদুকরী বলতে কী বোঝায়, এদুটোর পার্থক্য কী।
ডেবরার লেখার শব্দমালা পড়ে কেঁপে উঠল ডেভিড। খেয়াল করে দেখল যে এমন অদ্ভুত একটা সৌন্দর্য যে গায়ের লোম খাড়া হয়ে গেল আর অবশেষে এই বিষাদে ভেসে গেল সেও। মনে হলো দম বন্ধ হয়ে যাবে। সবকিছু হারিয়ে ফেলেছে যেন ডেভিড। এমন দুঃখের মাঝে পড়ে চোখ বেয়ে নামতে লাগল অশ্রুকণা। আর দ্রুত চোখ মুছতে হলো বারবার, কেননা কবিতার শেষটুকু একেবারে হৃদয় বিদীর্ণ করে দিল তার।
বুকের উপর নামিয়ে রাখল বই, মনে পড়ে গেল জো’র কাছে শোনা সৈন্যের কথা, যে মারা গেছে মরু। হঠাৎ করে একটা আওয়াজ পেয়ে উঠে বসে তাড়াতাড়ি চাইল বইটাকে লুকিয়ে ফেলতে। এমন একটা ব্যক্তিগত জিনিস এটা, এই কবিতা, নিজেকে চোর বলে মনে হলো তার।
বেডরুমের দরজায় দাঁড়িয়ে ডেভিডের দিকে তাকিয়ে মনোযোগ দিয়ে দেখতে লাগল ডেভিডকে।
বিছানায় উঠে বসে হাতে বই তুলে নিল ডেভিড। এটা বেশ সুন্দর। অবশেষে কোনক্রমে বলে উঠল ডেভিড। কণ্ঠস্বরে কান্নার রেশ।
তুমি পছন্দ করেছে শুনে আমার ভালো লাগছে।’ বলল বটে ডেবরা কিন্তু ডেভিড বুঝলে পারল যে সে লজ্জিত হয়েছে।
‘আমাকে আগে দেখাওনি কেন?
‘ভয় পেয়েছি যে হয়তো তুমি পছন্দ করবে না।’
‘ওকে অনেক ভালোবাসতে, তাই না? নরম স্বরে জানতে চাইল ডেভিড।
হ্যাঁ। তাই করতাম। বলে উঠল ডেবরা। কিন্তু এখন আমি তোমাকে ভালোবাসি।
***
অবশেষে নির্ধারিত হলো ডেভিডের পোস্ট। পরিষ্কার বোঝা গেল যে এর সব ক্ষেত্রেই ব্রিগের হাত রয়েছে। যদি জো স্বীকার করল যে সে তার সব পারিবারিক ক্ষমতা ব্যবহার করে এই আদেশকে প্রভাবিক করেছে।
ডেভিডকে আদেশ দেয়া হলো যেন মিরেজ স্কোয়াড্রন ‘ল্যান্স’তে রিপোর্ট করে। এটি একটি ইন্টারসেক্টর আউটফিট বেস আর অবস্থান একই গোপন এয়াফিল্ডে যেখান থেকে সে প্রথমবার উড়ে গিয়েছিল। একই স্কোয়াড্রনে আছে জো মোরদেসাই। মালিক স্ট্রিটে ডেভিডকে সংবাদটা দিতে এসে নিজের মনোভাব না লুকালেও জো আশা করল যে শীঘ্রই তারা একসঙ্গে উড়তে পারবে রেগুলার দল হিসেবে। সন্ধ্যায় বসে পুরো স্কোয়াড্রনের সবার সম্পর্কে ডেভিডকে জানিয়ে দিল জো। ‘লে ডফিন’ কমান্ডিং অফিসার থেকে শুরু করে সবচেয়ে নিচু পদমর্যাদার মেকানিক পর্যন্ত। সামনের সপ্তাহগুলোতে ডেভিড টের পাবে যে জোর পরামর্শ আর সাহায্য কতটা অমূল্য ওর জন্য।
পরের দিন টেইলর নিয়ে এলো ডেভিডের ইউনিফর্ম। ডেবরাকে সারপ্রাইজ দিতে ইউনিফর্ম পরে নিল ডেভিড। রান্নাঘরের দরজা দিয়ে ঘুরে ঢুকলো ডেবরা। হাত ভর্তি বই আর বাজার সদাই। শরীরের নিচের অংশ দিয়ে ধাক্কা দিয়ে দরজা খুলে ঘরে ঢুকলো। পেছনে খোলা চুল, মোটা চশমা মাথার উপরে তুলে রাখা।
সিঙ্কের উপর ঢেলে দিল হাতের বোঝা। এরপর কোমরে হাত রেখে ধুরে ঘুরে চারপাশ থেকে দেখল ডেভিডকে।
‘আমি চাই তুমি এই পোশাক পরে কাল বিকালে আমাকে বিশ্ববিদ্যালয়ে নিতে আসবে। প্লিজ। অবশেষে বলে উঠল ডেবরা।
‘কেন?’
‘কেননা কয়েকটা ডাইনী ঘুরে বেড়ায় লটারম্যান বিল্ডিংয়ে। তাদের কেউ কেউ আমার ছাত্রী, কেউ কেউ সহকর্মী। আমি চাই ওরা তোমাকে ভালোভাবে দেখুক আর তাদের ছোট্ট হৃদয়টা খেয়ে ফেলুক।
হেসে ফেলল ডেভিড। তো আমাকে নিয়ে কোন লজ্জা নেই তোমার?
মরগ্যান, একজনের পক্ষে তুমি একটু বেশিই সুন্দর। তোমার উচিৎ ছিল যমজ নিয়ে জন্ম নেয়া।
একসাথে আজই তাদের শেষ দিন। তাই ডেবরার কথামতো ইউনিফর্ম পরে ইংলিশ ডিপার্টমেন্টে তাকে নিতে এলো ডেভিড। আর অবাক হয়ে দেখল যে কেমন করে এই পোশাক রাস্তা দিয়ে চলাচলকারী সকলের মনোযোগ কেড়ে নিলমেয়েরা তার দিকে তাকিয়ে হাসল, বৃদ্ধরা বলে উঠল শালোম, এমনকি বিশ্ববিদ্যালয়ের গেটে থাকা প্রহরীও হাসি মুখে হাত নেড়ে কৌতুক বলল ডেভিডকে।
তাদের সবার কাছে ডেভিড হলো রক্ষাকারী দেবদূত।
তাড়াতাড়ি এগিয়ে এসে তাকে কিস করল ডেবরা। এরপর হাঁটতে লাগল পাশে পাশে গর্বের সাথে আর অধিকার বলে জড়িয়ে রাখল ডেভিডের কনুই। গোলাকার কাঁচের বেলজিয়াম বিল্ডিংয়ে তাড়াতাড়ি ডিনার করতে নিয়ে গেল ডেভিডকে।
খেতে খেতে একটা মাত্র সাধারণ প্রশ্নে ডেভিড জেনে গেল নিজের খ্যাতি বজায় রাখার জন্য কোন কৌশলের আশ্রয় নিয়েছে ডেবরা।
‘আমি সম্ভবত প্রথম কয়েক সপ্তাহ বেস থেকে বের হতে পারব না। কিন্তু মালিক স্ট্রিটে লিখবো তোমাকে।
‘না। তাড়াতাড়ি বলে উঠল ডেবরা। আমি ওখানে থাকবে না। বিশাল বিছানাটাতে তুমি ছাড়া বেশি একাকী লাগবে।’
তাহলে কোথায়? তোমার বাবা-মায়ের কাছে?
‘এটা হবে আরো খারাপ। যতবার তুমি শহরে আসবে আমাকে বাসা ছাড়তে হবে! না, তারা ভাবছে আমি বিশ্ববিদ্যালয়ে হোস্টেলে আছি। আমি তাদের জানিয়েছি যে আমি ডিপার্টমেন্টের কাছাকাছি থাকতে চাই’
‘এখানে তোমার একটা রুম আছে? ডেবরার দিকে তাকিয়ে রইল ডেভিড।
‘অবশ্যই ডেভিড। আমাকে একটু আলাদা হতে হবে। আমি আমার আত্মীয়স্বজন, বন্ধু-বান্ধব বা চাকুরিদাতাকে তো বলতে পারি না যে আমাকে মেজর ডেভিড মরগ্যানের ঠিকানায় চিঠি লেখো। হতে পারে এটা বিংশ শতাব্দী আর আধুনিক ইস্রায়েল, কিন্তু তারপরেও এখনো আমি একজন ইহুদি, মমতা আর তার ঐতিহ্যে মোড়ানো।’
