‘মানুষকে কী দরকার?’ একমত হল ডেভিড। জানে যে তার জন্যেই এ সিদ্ধান্ত নিয়েছে ডেবরা। আবার এটাও জানে যে ডেবরার মতো সুন্দরী অন্ধ, বেস্ট সেলিং লেখক কোথাও গেলে সাড়া পড়ে যাবে। আর একটা টুর হয়তো তাকে খ্যাতির চূড়ায় পৌঁছে দেবে।
এর মাধ্যমে আবার টালমাটাল হয়ে গেল ওর দুনিয়া। নিজেকেই বোঝাতে চাইল যে আলোর প্রতি সংবেদনশীল মানেই এই নয় যে ডেবরা তার দৃষ্টিশক্তি আবার ফিরে পাবে। ও এখন এখানেই খুশি আছে। নিজের মতো করে পৃথিবী তৈরি করে নিয়েছে। মিথ্যে আশা বা নিষ্ঠুর একটা সার্জারি হয়ত হিতে বিপরীত হয়ে যাবে।
নিজের সমস্ত চিন্তায় চেষ্টা করল ডেবরার প্রয়োজনকেই বেশি গুরুত্ব দিতে। কিন্তু আবার এও জানে যে নিজের সাথে ছলনা করছে সে। এই আকুতি জানাচ্ছে ডেভিড মরগ্যান। ডেভিড মরগ্যানেরই জন্য যদি ডেবরা তার দৃষ্টিশক্তি খুঁজে পায়—-নিজের খুশি হয়তো ধ্বংস করে ফেলবে সে।
এক সকালে জাবুলানির শেষ মাথা পর্যন্ত গাড়ি চালিয়ে গেল ডেভিড। এরপর কাটা গাছ ভর্তি একটা জায়গায় পার্ক করল গাড়ি। ইঞ্জিনের সুইচ অফ করে ড্রাইভিং সিটে বসে আয়নার দিকে তাকিয়ে দেখতে লাগল নিজের মুখমণ্ডল। প্রায় এক ঘণ্টা ধরে পরীক্ষা করল নিজের চেহারা। মানুষ হিসেবে ভাবাই যায় না শুধু চোখ দুটো ছাড়া–এত কুৎসিত দেখতে ক্ষতবিক্ষত মুখটার প্রতি সে জানে কোন নারীই আকর্ষণ বোধ করবে না। কাছাকাছি আসতে চাইবে না, স্পর্শ করতে চাইবে না, ভালোবাসতে চাইবে না। আস্তে আস্তে গাড়ি চালিয়ে বাসায় ফিরে এল ডেভিড। উচছুসিত ভঙ্গিতে সিঁড়ি দিয়ে নেমে এল ডেবরা। তার পরনে রং-চটা ডেনিম আর উজ্জ্বল গোলাপি ব্লাউজ। ডেভিডের কাছে এসে মুখ তুলে ধরল কিস্ করার জন্য।
এই সন্ধ্যায় বারবিকিউ করার আয়োজন করল ডেবরা। গাছের নিচে আগুনের পাশ বসল দুজনে। শুনতে লাগল নিশাচর পাখিদের গান। রাতটা বেশ ঠাণ্ডা। কাঁধের উপড়ে হালকা ভাবে সোয়েটার ফেলে রেখেছে ডেবরা। নিজের ফ্লাইং জ্যাকেট ছুঁড়ে ফেলে দিয়েছে ডেভিড।
বুকের কাছে রয়ে গেছে এখনো চিঠিটা। মনে হল মাংসের মাঝে গেঁথে যাবে। চামড়ায় জ্যাকেটের পকেট খুলে চিঠিটা হাতে নিল ডেভিড। পাশে বসে কলকল করে চলেছে আনন্দিত ডেবরা। হাত বাড়িয়ে রেখেছে আগুনের শিখার দিকে। হাতের মাঝে চিঠিটা আস্তে আস্তে ঘুরতে লাগল ডেভিড।
হঠাৎ করে মনে হল জীবন্ত একটি বিছা বা এ জাতীয় কিছু, এমন ভাবে আগুনের মাঝে হাতের চিঠিটা ছুঁড়ে মারল ডেভিড। তাকিয়ে দেখতে লাগল আগুনে পুড়ে এটা ছাই হয়ে যাবার দৃশ্য।
এত সহজে শেষ হয়ে যায়নি ব্যাপারটা। সে রাতে ঘুমাতে যাবার পর মাথার মধ্যে কেবল ঘুরতেই লাগল চিঠির কথাগুলো। এতটুকু স্বস্তি পেল না ডেভিড। চোখ ঢুলুঢুলু হয়ে এলেও ঘুমাতে পারল না।
এরপর থেকে দিনের বেলা অধিকাংশ সময় চুপচাপ বসে থাকতে শুরু করল ডেভিড। বুঝতে পারল ডেবরা যে কিছু একটা হয়েছে, যদিও অনেক চেষ্টা সত্ত্বেও কিছুই জানতে পারল না ভয় পেয়ে গেল সে। ভাবল ডেভিড তার সাথে রাগ করেছে। আরো বেশি করে করে ডেভিডকে ভালোবাসা দিয়ে চেষ্টা করল ব্যাপারটা ভুলিয়ে দিতে।
কিন্তু ফল হল উল্টো। নিজের কাছে আরো বেশি করে অপরাধী হয়ে গেল ডেভিড।
হতাশায় মুষড়ে উঠে এক সন্ধ্যায় যখন মুক্তোর ছড়ার কাছে একসাথে গেল দুজনে, ল্যান্ড রোভার ছেড়ে দিয়ে হাতে হাত ধরে পানির কিনারে গেল। পড়ে থাকা গাছের গুঁড়ি পেয়ে পাশাপাশি বসল চুপচাপ। এই প্রথমবারের মতো মনে হলো একে অপরকে বলার মতো কোন কথা নেই।
গাছের পাতায় ডুবে গেল বিশাল লাল সূর্য। বনের ভিতর নেমে এলো সন্ধ্যা। হালকা পায়ে এগিয়ে এলো নায়লার দল। মনে হল ছায়ার মাঝে নড়াচড়া শুরু করল।
ফিসফিস করে কথা বলা শুরু করল ডেভিড। কাছে এগিয়ে এসে মনোযোগ দিয়ে শুনতে লাগল ডেবরা।
‘আজ কেন যেন বেশ সচকিত হয়ে আছে নায়লার দল। মনে হচ্ছে বৃদ্ধ। পুরুষটার নার্ভাস ব্রেক ডাউন হয়েছে। এত মনোযোগ দিয়ে কিছু শুনছে যে স্বাভাবিকের চাইতে দ্বিগুণ লম্বা হয়ে গেছে কান। মনে হয় আশেপাশে নিশ্চয় চিতাবাঘের অস্তিত্ব টের পাচ্ছে কোথাও তারপরই থেমে গিয়ে আস্তে করে চিৎকার করে উঠল।
‘ওহ এই তো এসে গেছে!
উত্তেজনায় নড়েচড়ে বসল ডেবরা। ডেভিডের হাত ধরে ঝাঁকুনি দিতে লাগল, কী হয়েছে ডেভিড?
‘একটা নতুন শাবক! গলার স্বরে ফুটে উঠল উত্তেজনা। একটা হরিণী শাবক প্রসব করেছে। ওহ্ গড ডেবরা! এখনো পা নাড়াতে পারছে না ঠিকমত’ শাবকের বর্ণনা দিতে শুরু করল ডেভিড। মা হরিণের সাথে বাইরে বেরিয়ে এসেছে। পুরো মনোযোগ দিয়ে শুনতে লাগল ডেবরা। বোঝা গেল নিজের ভেতরের মাতৃত্বকে টের পেল। সম্ভবত ভাবতে লাগল নিজের মৃত সন্তানের কথা। ডেভিডের হাতে থাকা হাত শক্ত হয়ে গেল। সন্ধ্যার আলোতে দেখা গেল উজ্জ্বল দেখাচ্ছে মধুরঙা চোখ জোড়া। হঠাৎ কথা বলে উঠল সে। নিচু স্বরে কিন্তু পরিষ্কারভাবে ব্যথিত গলায় বলে উঠল, “আমার ইচ্ছে করছে দেখতে। ওহ গড! গড! আমাকে দেখার শক্তি দাও। প্লিজ আমি আবার দেখতে চাই। হঠাৎ করেই কাঁদতে লাগল ডেবরা। পুরো শরীর কাঁপিয়ে কাঁদতে লাগল।
পুলের কাছে ভয়ে পেয়ে গেল নায়লার দল। দ্রুত পালিয়ে গেল গাছের আড়ালে। ডেবরাকে ধরে শক্ত করে বুকের কাছে চেপে ধরল ডেভিড। মাথায় হাত বুলিয়ে দিল। চোখের পানিতে ভিজে গেল তার শার্ট আর বুকের অনেক গভীরে অনেক অনেক গভীরে ছড়িয়ে পড়ল হতাশার ঠাণ্ডা ভাব।
