লণ্ঠনের আলোয় পরিষ্কার দেখা গেল ভেজা মাটিতে ডেবরার পায়ের ছাপ। পাশাপাশি নিজের পায়ের ছাপও দেখতে পেল আক্কারস। অনুসরণ করে গেল সে। যেখানে বসে মূত্রত্যাগ করেছে খুঁজে পেল সে জায়গাও।
‘চালাকের হাড়ি কোথাকার। বিড়বিড় করে উঠল আক্কারস। বনের গভীরেও অনুসরণ করে চলল ডেবরাকে। পরিষ্কার ছাপ আর চিহ্ন রেখে গেছে ডেবরা। বৃষ্টিস্নাত ঘাসের বুকে। গাছের গায়ে থেকে পানি মুছে গেছে ডেবরার হাতের চাপে। শিকারির চোখে এ পরিষ্কার চিহ্ন ভুল হবার কথা নয়।
প্রতি মিনিট অন্তর অন্তর থেমে দাঁড়িয়ে লণ্ঠন বাড়িয়ে নিজের সামনের অংশও দেখে নিচ্ছে আক্কারস। শিকারি সুলভ উত্তেজনা জেগে উঠল। আদিম এই বোধটুকুই এখনো বাঁচিয়ে রেখেছে তাকে। প্রথমবার ব্যর্থ হওয়ায় এবার আরো বেশি উত্তেজনা বোধ করছে সে।
সাবধানে এগোতে লাগল সে। বিশাল একটা চক্রাকারে ঘুরতে লাগল ডেবরার উদ্দেশ্যহীন পায়ের ছাপ।
আবারো থেমে গেল আক্কারস! খাদের মাথাগুলো পরীক্ষা করে দেখল লণ্ঠন বাড়িয়ে। দেখতে পেল আলোর শেষ মাথায় গোলগোল কিছু একটা ছুটে গেল।
আলো ধরে রাখল এটার উপর। দেখতে পেল পাণ্ডুর আতঙ্কিত এক মুখ আস্তে আস্তে দ্বিধাভরা পায়ে সামনে এগোচ্ছে। মনে হল ঘুমের ঘোরে হাঁটছে। ডেবরা। হাত দুটো সামনে বাড়ানো।
সরাসরি আক্কারসের দিকে এগিয়ে আসছে মেয়েটা। আলোর মাঝে ধরা পড়ে গেছে সে সম্পর্কে বিন্দুমাত্র ধারণা নেই। একবার থেমে নিজের পেটে হাত বুলিয়ে ভয়ের চোটে ফোঁপাতে লাগল।
পায়ের ট্রাউজার ভিজে গেছে বৃষ্টির পানিতে। জুতা এরই মাঝে ছিঁড়ে একাকার। যতই কাছে এলো আক্কাস দেখল হাত আর ঠোঁট নীল হয়ে গেছে ঠাণ্ডায়।
চুপচাপ দাঁড়িয়ে ডেবরাকে দেখতে লাগল আক্কারস। মনে হল মুরগি দেখে সম্মোহিত হয়ে তাকিয়ে আছে একটা কোবরা।
কাধ জুড়ে নেমে গেছে ভেজা দড়ির মতো কালো চুল, মুখেও লেপ্টে আছে কিছু। পাতলা ব্লাউজটাও গাছের গায়ে থেকে পানি পড়ে ভিজে গেছে। পুরো কাপড় লেপ্টে আছে পর্বতপ্রমাণ পেটের উপর।
মেয়েটাকে আরো কাছে আসতে দিল আক্কারস। উত্তেজনায় মনে হল ফেটে পড়বে এত সহজে তাক হাতে পাওয়ায়। অবশেষে প্রতিশোধ নিতে পারবে সে। প্রতিটি মুহূর্ত উপভোগ করতে চায় সে।
মাত্র পাঁচ কদম দূরে থাকতেই ডেবরার ঠিক মুখের উপর আলো ফেলল আক্কারস। খিকখিক করে হাসতে লাগল।
চিৎকার করে উঠল ডেবরা। পুরো মুখ বিকৃত হয়ে উঠল। বন্য পশুর মতো ঘুরে দাঁড়িয়েই অন্ধের মতো দৌড় লাগাল, বিশ কদম সামনে গিয়ে পা বেঁধে পড়ে গেল মারুলা গাছের শিকড়ের সাথে।
পড়ে গিয়ে হাঁটুতে ব্যথা পেয়ে জোরে চিৎকার করে কেঁদে উঠল। হাত বুলাতে লাগল গালের ক্ষতে।
হাচোড়-পাচোড় করে আবারো উঠে দাঁড়িয়ে কাঁপতে কাঁপতে মুখ ঘুরিয়ে তাকাল। শুনতে চাইল পরবর্তী শব্দ।
নিঃশব্দে ডেবরার চারপাশে ঘুরে ঘুরে কাছে এগিয়ে গেল আক্কারস। তারপর ঠিক পিছনেই দাঁড়িয়ে আবারো খিকখিক করতে লাগল।
আবারো চিৎকার করে উঠে দৌড়াতে লাগল ডেবরা। আতঙ্কিত হয়ে পড়ে গেল পিপড়ার গর্তে পা দিয়ে। সশব্দে মাটির উপর আছাড় খেল। শুয়ে ফোঁপাতে লাগল বেচারা।
অলসভাবে হেলেদুলে তার কাছে এগিয়ে গেল আক্কারস গত দুই বছরের মাঝে এই প্রথমবার বেশ আনন্দ হচ্ছে তার। বিড়ালে মতো পুরো ব্যাপারটাকে এত তাড়াতাড়ি শেষ করতে চায় না সে। বহুক্ষণ ধরে খেলাতে চায়।
ডেবরার গায়ের উপর গিয়ে উচ্চারণ করল কুৎসিত সব শব্দ। তৎক্ষণাৎ আবার উঠে দাঁড়িয়ে দৌড়াতে শুরু করল ডেবরা। পেছন থেকে ছুটতে লাগল আক্কারসও। মনে পড়ে গেল তার শিকার করা হাজারো জন্তুর কথা।
.
রাস্তার ভেজার নরম মাটির উপর দিয়ে খালি পায়ে দৌড়াতে লাগল ডেভিড। নিজের ব্যথা প্রায় ভুলেই গেল। এমনকি হৃৎপিণ্ডের নিস্তেজ ভাব বা ফুসফুসের জ্বলুনিও টের পেল না।
পাহাড়ের গায়ে ঘুরে গেল পথ। ঘরের কাছে এসে থেমে দাঁড়াল। হাপাতে হাপাতে তাকিয়ে রইল বাড়ি উজ্জ্বল করে জুলতে থাকা আলোর দিকে। জাবুলানির বাগান ভেসে যাচ্ছে আলোর বন্যায়। এ সময় ফ্লাডলাইট জ্বলার কোন কারণ নেই। নতুন করে সর্তক ঘণ্টা বেজে উঠল মনের মাঝে। পাহাড়ের গা বেয়ে লাফিয়ে নামাতে লাগল।
শূন্য, তছনছ হওয়া ঘরের মাঝে ডেবরার নাম ধরে ডাকতে লাগল ডেভিড। কিন্তু নিজের শব্দের প্রতিধ্বনি শুনল কেবল।
সামনের বারান্দায় পৌঁছে কিছু একটা দেখতে পেল। অন্ধকারে নড়ছে কিছু একটা।
‘জুলু! সামনে দৌড়ে গেল ডেভিড, ‘হিয়ার বয়! হিয়ারডেবরা কোথায়?
সিঁড়ি দিয়ে ঘসটে ঘসটে উঠে এল জুলু। বোঝা গেল অনেক আঘাত পেয়েছে কুকুরটা। মাথার একপাশে ভারী কিছুর বাড়ি খাওয়ায় চোয়াল ভেঙ্গে গেছে। অথবা জায়গা থেকে সরে গেছে। তাই হাস্যকরভাবে ঝুলছে এটা। নিস্তেজ হয়ে আছে জুলু।
হাঁটু গেড়ে বসল ডেভিড। ডেবরা কোথায় জুলু, কোথায়?
কুকুরটা মনে হল চেষ্টা করছে নিজেকে প্রকাশ করতে। কোথায় সে বয়? ও ঘরে নেই। কোথায় তাহলে? ফাইন্ড হার বয়! ফাইন্ড হার। আকুতি জানাল ডেভিড।
উঠানে কুকুরটাকে ফেলে এল ডেভিড। কিন্তু তার পিছুপিছু ঘুরতে লাগল জুলু। পিছনের দরজায় ভেজা মাটির গন্ধ পেল কুকুরটা। ফ্লাডলাইটের আলোয় পায়ের চিহ্ন দেখতে পেল ডেভিড। ডেবরার আর তার পিছনে বড় বড় পুরুষালী পা।
