নিজেকে নিয়ন্ত্রণের চেষ্টা করতে করতে কান পেতে রইল কিছু শোনার আশায়।
এরপরই শুনতে পেল আসছে আক্কারস। ভারী পায়ের শব্দ স্পষ্ট শোনা গেল, ভেজা মাটিতেও কান এড়ালো না। মনে হলো সরাসরি ডেবরার কাছেই আসছে সে। হাত দিয়ে মুখ ঢেকে রেখে নিজেকে শান্ত করতে চাইল ডেবরা।
একেবারে শেষ মুহূর্তে ডেবরার কাছ দিয়ে চলে গেল পদশব্দ। মনে হল অসুস্থ হয়ে যাবে সে। কিন্তু আবার ফিলে এলো পদশব্দ। এতটা কাছে যে আক্কারসের হাঁপানির শব্দও পাচ্ছে সে।
ডেবরার জন্য চুপচাপ দাঁড়িয়ে রইল আকারস। একেবারে কাছাকাছি। দাঁড়িয়ে আছে দু’জনে। কিন্তু অন্ধকারে দেখতে পাচ্ছে না। আর মনে হলো সময়গুলো হয়ে গেল ভীষণ দীর্ঘ। মিনিট যেতে লাগল ঘণ্টার মতো করে। অবশেষে কথা বলল আক্কারস।
‘আহ্! এই তো পেয়েছি তোমাকে। পরিষ্কার দেখতে পাচ্ছি। খিকখিক করে হাসতে লাগল আক্কারস।
হৃৎপিণ্ডের ধুকপুকুনি বেড়ে গেল ডেবরার। যতটা কাছে ভেবেছিল তার চেয়ে কাছে দাঁড়িয়ে আছে আক্কারস। আরেকটু হলেই আবারো দৌড় লাগাতে যাচ্ছিল সে, কিন্তু মনের গভীরে কেউ একজন আশ্বস্ত করল যেন।
‘এই তো দেখতে পাচ্ছি তুমি লুকিয়ে আছে। আবার বলে উঠল আক্কারস। আমার কাছে বড়সড় একটা ছুরি আছে। এখনি ধরে জবাই করে ফেলবো দাঁড়াও।
কুলকুল করে কাঁপতে লাগল ডেবরা। আতঙ্কিত হয়ে শুনতে লাগল আক্কারস কথা। এরপর হঠাৎ করেই বুঝতে পারল যে ও এখনো নিরাপদ। আক্কারস তাকে এখনো দেখেনি। রাতের অন্ধকারে ঢেকে আছে ডেবরা। ঘন গাছপালার আবরণ থাকাতেও তাকে দেখতে পাচ্ছে না আক্কারস। লোকটা তাকে ভয় দেখাতে চাইছে শুধুমাত্র। চাইছে আবারো দৌড়াতে শুরু করলেই ধরে ফেলবে ডেবরাকে। তাই মনোযোগ দিয়ে একেবারে স্থির পাথরের মতো হয়ে দাঁড়িয়ে রইল ডেবরা।
আবারো চুপ করে রইল আক্কারস। শিকারির মতো ধৈর্য নিয়ে অপেক্ষা করতে লাগল। আবারো কাটতে লাগল মিনিটের পর মিনিট।
ব্লাডারের চাপে মনে হল কেউ গরম লোহা চেপে ধরেছে। চিৎকার করে কেঁদে উঠতে মন চাইল ডেবরার। এর সাথে আরেক যন্ত্রণা, চটচটে আঠালো কিছু একটা হাতের উপর দিয়ে উঠে আসছে। চামড়ার উপর হাজারো পায়ের সিড়সিড়ানি অনুভূতিতে মনে হলো আতঙ্কে মরেই যাবে সে। কিন্তু তারপরেও এতটুকু নড়লো না।
জিনিসটা মাকড়সা বা বিছা যাই হোক না কেন, গলার কাছে উঠে এলো। বুঝতে পারল যে কোন মুহূর্তে সব ভুলে গিয়ে চিৎকার করে উঠবে সে।
হঠাৎ আবারো চিৎকার করে উঠল আক্কারস- “ঠিক আছে। আমি গিয়ে একটা ফ্লাশ লাইট নিয়ে আসছি। দেখবো কত দূরে যেতে পারো। শীঘ্রিই ফিরে আসব আমি। ভেব না বৃদ্ধ আক্কারসকে কাবু করতে পারবে তুমি। তুমি শিখতে পারবে না এরকম হাজারো কৌশল জানা আছে আমার।’
শব্দ করে সরে গেল আক্কারস। ডেবরা চাইল তৎক্ষণাৎ গাল থেকে পোকাটাকে ফেলে দৌড় লাগাতে। কিন্তু আবারো কেউ একজন মনের গহীনে ফিসফিস করে বলে উঠল, সবকিছু ঠিক আছে, তুমি শান্ত হও। পাঁচ মিনিট অপেক্ষা করল ডেবরা। এরপর দশ। পোকাটা পৌঁছে গেল তার চুলে।
আবারো অন্ধকারে ঠিক তার পাশেই চিৎকার করে উঠল আক্কারস। ঠিক আছে?’ বেশি চালাক হয়েছিস তাই না শয়তানী দাঁড়া দেখাচ্ছি মজা। এবার সত্যি চলে গেল আক্কারস।
চুল থেকে ঝেড়ে পোকাটাকে ফেলে দিল ডেবরা। ভয়ে ঠকঠক করে কাঁপছে। এরপর আস্তে আস্তে হাঁটা ধরল আরো বনের ভেতরে। আঙুলগুলো শক্ত হয়ে গেছে ঠাণ্ডায় আর জোর করে কাপড় ধরে রাখায়। হাত ছেড়ে তলপেটের ভারমুক্ত হল ডেবরা।
আবারো উঠে দাঁড়াল। অনুভব করল পেটের মাঝে নড়ে উঠল তার সন্তান। এর সাথে জেগে উঠল মাসুলভ সব বোধগুলো। নিরাপদ স্থানে সরে যাবার তাগিদ অনুভব করল ডেবরা। নিজের সন্তানকে অবশ্যই নিরাপত্তা দিতে হবে। কিছু হতে দেবে না সে। চিন্তা করল পুলের পাশে গিয়ে লুকিয়ে থাকবে।
কিন্তু কীভাবে যাবে? পুরোপুরি পথ হারিয়ে ফেলেছে সে। এরপর মনে পড়ল ডেভিড বলেছিল বাতাসের কথা। পশ্চিম দিক থেকে বয় বৃষ্টির বাতাস। এখন খানিক হালকা হয়েছে বাতাসের গতি। অপেক্ষা করল গালের উপর আবার কখন স্পর্শ পাওয়া যায়। তাহলে পথ পেয়ে যাবে সে। তাই হলো, দিকনিদের্শনা পেল সে। ঘুরে দাঁড়িয়ে দুই হাত পাশে ছড়িয়ে দিল। আবারো হাঁটা শুরু করল। শুধুমাত্র পুলের কাছে পৌঁছাতে পারলেই লুকানো তীরে যেতে পারবে।
কিন্তু সাইক্লোনের বাতাস ঝড়ের মতো করে দিক পরিবর্তন করতে লাগল অথচ বিশ্বস্ততার সাথে এর পিছুপিছু যেতে লাগল ডেবরা। ফলে জঙ্গলের মধ্যে উদ্দেশ্যবিহীন ভাবে ঘুরে বেড়াতে লাগল শুধু।
জাবুলানির আলোকিত রাস্তা ধরে ঘরের মধ্যে ঝড়ের বেগে ঢুকলো আক্কারস। খোলা ড্রয়ার ধরে টান দিল, লাখি মারতে লাগল আটকানোগুলোতে।
ডেভিডের অফিসে বন্দুকের কেবিনেট খুঁজে পেল। চাবির জন্য হাতড়াতে লাগল ভোয়গুলো। কিছুই না পেয়ে হতাশায় দাঁত কিড়মিড় করতে লাগল।
এ রুম থেকে গেল বিল্ট ইন কার্বাড ইউনিটে। ডজনখানেক প্যাকেট করা শটগান শেল আর ইলেকট্রিক লণ্ঠন আছে একটা। তাড়াতাড়ি লণ্ঠন তুলে সুইচ জ্বালালো। সাদা আলো বের হল–খুশিতে আত্মহারা হয়ে উঠল আক্কারস।
আবারো দৌড়ে গেল রান্নাঘরে। কাটলারি ড্রয়ার খুলে লম্বা বাঁকানো ছুরি নিল একটা, স্টেইনলেস স্টিল দিয়ে তৈরি। তারপর তাড়াহুড়া করে উঠান পার হয়ে গেইটের দিকে ছুটল।
