সাথে সাথে থেমে গেল হাতল ঘুরানোর শব্দ। থেমে গেল লোকটা। ডেবরা স্পষ্ট কল্পনা করতে পারল যে সিঁড়ির মাথায় দাঁড়িয়ে অন্ধকার বারান্দায় তাকে দেখতে চেষ্টা করছে লোকটা। তৎক্ষণাৎ গাঢ় রঙের পোশাক পরায় নিজেকে ধন্যবাদ দিল সে।
চুপচাপ নড়াচড়া না করে কান পেতে শুনতে লাগল ডেবরা। শুনতে পেল বাতাস এসে নড়ে উঠল গাছের মাথা, টুপটুপ করে অনেকগুলো ফোঁটা একসাথে মাটিতে গড়িয়ে পড়ল। বাঁধের কাছে ডেকে উঠল একটা শিকারি পেঁচা। পাহাড়ের কাছে কড়াৎ কড়াৎ করে বিদ্যুৎ চমকাতে লাগল, পয়েনসেটিয়া ঝোঁপ থেকে কর্কশ স্বরে ডেকে উঠল একটা নিশাচর পাখি।
আরো অনেকক্ষণ চুপচাপ রইল চারপাশ। বুঝতে পারল বেশিক্ষণ সহ্য করতে পারবে না সে। অনুভব করল ঠোঁট কাঁপছে। ঠাণ্ডা আতঙ্ক, সন্তানের ভার সব মিলিয়ে চাপ পড়েছে ব্লাডারের উপর। ইচ্ছে করল দৌড়ে পালায়—কিন্তু কোথায় যাবে।
এরপরই নীরবতা ভেঙ্গে গেল। অন্ধকার খিকখিক করে হেসে উঠল কেউ। এত কাছে আর এত উন্মাদের মতো শোনাল হাসিটা–আতঙ্কে মনে হলো হার্ট অ্যাটাক হয়ে যাবে তার। পা দুর্বল হয়ে গেল, কাঁপতে শুরু করল ডেবরা। ব্লাডারের উপর চাপ আর নিতে পারছে না সে–কেননা এই হাসি পরিষ্কার ভাবে চিনতে পারছে সে। মনের গহীনে থেকে যাওয়া ভয়ঙ্কর স্মৃতি স্মরণে এলো।
দরজার হাতল ঘোরাতে লাগল হাতটা। বাঁকাতে লাগল জোরে জোরে। এরপর কাধ দিয়ে বাড়ি মারলো কাঠামোর গায়ে। এটা পাতলা একটা দরজা, ভার সহ্য করার মতো তৈরি হয়নি। ডেবরা জানে যে কোন মুহূর্তে ভেঙ্গে পড়বে এটা।
আবার চিৎকার করে উঠল ডেবরা, আতঙ্কে ভয়াবহ শব্দ বের হলো গলা চিরে। আর মনে হল এতেই কাজ হল। সব ধরনের জড়তা কেটে গেল। পা আবার নড়ে উঠল, ব্রেইন কাজ করা শুরু করল।
তাড়াতাড়ি উঠে নিজের ওয়ার্করুমে দৌড় দিল সে। দরজা বন্ধ করে তাড়াতাড়ি লক্ করে দিল।
এরপর বিছনার কাছে গিয়ে গুটিশুটি মেরে বসে চিন্তা করতে লাগল কী করা যায়। জানে যে ঘরে ঢোকার সাথে সাথে আলো জ্বেলে দিবে আক্কারস। বৈদ্যুতিক জেনারেটর অটোম্যাটিক্যালি জ্বলে উঠলেই পুরোপুরি আক্কারসের হাতে পড়ে যাবে সে। অন্ধকার ডেবরার একমাত্র ভরসা এখন। এতে তার সুবিধা হবে, কেননা অন্ধকারেই অভ্যস্ত সে।
আবারো নিশাচর পাখি আর পেচার ডাক শুনতে পেল। বুঝতে পারল রাত নেমেছে বাইরে। আর সম্ভবত মেঘ এখনো ঢেকে রেখেছে চাঁদ আর তারাদের। বাইরের জঙ্গলেও এখন অন্ধকার। এখন যা করতে হবে তা হলো বাইরে গিয়ে সার্ভেন্টস কোয়ার্টারে পৌঁছানো।
তাড়াতাড়ি আবার উঠে রুমের মাঝখানের দরজা দিয়ে আরো ভেতরের রুমে চলে গেল সে। যেতে যেতে ভাবতে লাগল অস্ত্র হিসেবে কী ব্যবহার করা যায়। ডেভিডের অফিসের স্টিলের কেবিনেটে গোলাবারুদ রাখা আছে। রান্নাঘরের দিকে দৌড় দিল ডেবরা। দরজার কাছে জায়গা মতেই রাখা আছে তার ওয়াকিং স্টিক। হাতে নিয়ে দরজা খুলে ফেলল।
ঠিক তখনি শুনতে পেল সামনের দরজা ভেঙ্গে গেল। তালার উপর ভারী পায়ে লাথি মেরে লিভিং রুমে ঢুকে গেল আক্কারস। পেছনে রান্নাঘরের দরজা বন্ধ করে দিল ডেবরা। তাকাল উঠানের দিকে। চেষ্টা করল নিজেকে শান্ত করতে। ভয় পেলে চলবে না। পথ হারানো যাবে না। প্রতিটি পা গুনেগুনে ফেলতে লাগলা। কোপজেতে সার্ভেন্টস কোয়ার্টারে যাবার রাস্তা খুঁজে পেতে হবে তাকে।
ওর প্রথম ল্যান্ডমার্ক হলো বেড়ার গায়ের দরজাটা যেটা বাড়ির চারপাশে ঘিরে আছে। এর কাছে পৌঁছানোর আগেই শুনতে পেল ইলেকট্রিসিটি জেনারেটর গ্যারাজের পেছনে স্বশব্দে চলা শুরু করল। আক্কারস লাইটের সুইচ খুঁজে পেয়েছে।
পথ থেকে সরে গেল ডেবরা। দৌড়াতে লাগল কাটাতারের বেড়ার দিকে। উন্মাদের মতো চেষ্টা করল দরজাটা খুঁজে পেতে। মাথার উপরে শুনতে পেল বাতির চড়চড় শব্দ। তার মানে এখনি আলোর বন্যায় ভেসে যাবে পুরো বাগান।
এতক্ষণে নিশ্চয়ই রান্নাঘরের দরজার পাশে থাকা বাতির সুইচের গায়ে চোখ পড়েছে আক্কারসের। মনে হল আলোর নিচে তাকে নিশ্চয় দেখে ফেলেছে লোকটা।
শুনতে পেল তার পেছনে চিৎকার করছে আক্কারস। বুঝতে পারল তাকে দেখতে পেয়েছে। সেই মুহূর্তে গেইট পেয়ে গেল ডেবরা। স্বস্তির শ্বাস ফেলে গেইট খুলেই দৌড়াতে লাগল।
তাকে আলো থেকে সরে যেতে হবে। অন্ধকারে হারিয়ে যেতে হবে। আলোই এখন বিপদ ডেকে আনবে, অন্ধকার তাকে রক্ষা করবে।
রাস্তাটা হচ্ছে আঁকাবাকা, পুলের বাম পাশ দিয়ে ডানদিকে ভৃত্যদের কোয়ার্টার ডানহাতি রাস্তা দিয়ে দৌড়াতে লাগল ডেবরা। পেছনে খুলে গেল গেইট। তার পেছনেই আসছে আক্কারস।
দৌড়াতে গিয়েও গননা করতে ভোলেনি ডেবরা। পাঁচশো কদম সামনে গেলেই নতুন মোড়। কিন্তু পড়ে গেল বেচারা।
হাঁটুতে বেঁধে গড়িয়ে গেল। হারিয়ে গেল ওয়াকিং স্টিক। এটা খুঁজতে গিয়ে সময় নষ্ট করার মানে হয় না। আবারো দৌড়াতে শুরু করল।
আরো পঞ্চাশ কদম গিয়েই বুঝতে পারল যে সে ভুল পথে এসেছে। এই পথ পাম্পহাউজের দিকে গেছে-এই রাস্তা সে ততটা ভালো চেনে না। এই পথে তেমন আসে না সে।
একটা মোড় নিতে ভুলে যাওয়ায় এবড়ো-খেবড়ো মাটিতে চলে গেল সে। পায়ে ঘাস জড়িয়ে এক পাশে কাত হয়ে পড়ে গেল। পুরোপুরি দিশেহারা অবস্থা তার। জানে যে পথ ভুলে বসে আছে। কিন্তু এটুকু সান্ত্বনা যে আলোর কাছ থেকে সরে এসেছে। ভাগ্যক্রমে চারপাশে একেবারে অন্ধকার–কিন্তু এত দ্রুত হার্টবিট হচ্ছে যে বুঝতে পারল ভয়ে আত্মারাম খাঁচা ছাড়া হয়ে যাবার জোগাড়।
