জাবুলানিতে বাসার পেছনের কোপজেতে সে পৌঁছালো ততক্ষণে অন্ধকার হয়ে গেছে। এরপর দুই ঘণ্টা চুপচাপ বসে বৃষ্টি দেখল, অপেক্ষা করল রাত নামার জন্য। রাত নামার পর অবশ্য একটু চিন্তায় পড়ে গেল কোথাও আলো জ্বলছে না, এতক্ষণে আলো জ্বেলে দেবার কথা।
কোপজে ছেড়ে সাবধানে পাহাড়ের নিচে এগোতে লাগল। আস্তে করে পার হয়ে গেল ভৃত্যদের কোয়ার্টার, গাছের ফাঁক দিয়ে পৌঁছে গেল ল্যান্ডিং স্ট্রিপে।
হ্যাঙ্গারের পাশের দেয়াল অনুসরণ করে দরজার কাছে পৌঁছাল।
উন্মাদের মতো হাত বাড়িয়ে খুঁজতে লাগল এয়ারক্রাফটকে, যেটা সেখানে থাকার কথা। যখন বুঝতে পারল যে এটা নেই, হতাশায় মুষড়ে পড়ল সে।
তারা চলে গেছে। এত কষ্ট, এত পরিকল্পনা, এত প্রচেষ্টা সব মাঠে মারা গেল।
জন্তুর মতো গর্জন করে সুস্থ হাতের মুঠি পাকিয়ে দেয়ালে মারলো আক্কারস। হতাশার চোটে ব্যথাও খারাপ লাগল না। এতটাই ঘৃণা তার আর এতটাই রেগে উঠল সে জ্বরতপ্ত রোগীর মতো কাঁপতে লাগল শরীর। চিৎকার করে উঠল, যেন বোধবুদ্ধিহীন জড় কোন জন্তু চিৎকার করছে।
হঠাৎ করেই থেমে গেল বৃষ্টি। হ্যাঙ্গারের লোহার ছাদের উপর ড্রামের বাজনার মতো বৃষ্টি শব্দ থেমে গেল। অবাক হয়ে গেল আক্কারস। খোলা জায়গায় গিয়ে বাইরে তাকাল। উপরে ঘুরে বেড়াচ্ছে তারকারাজি শব্দ বলতে কেবল পানি বয়ে চলার কুলকুল ধ্বনি আর পাতা থেকে টুপটাপ করে ঝরে পড়ার শব্দ।
আলোর আভা দেখা গেল। গাছ-পালার ফাঁকে বাসার সাদা দেয়াল উজ্জ্বলতা ছড়াতে লাগল। আক্কারস বুঝতে পারল যে এখনো কিছু করতে পারবে সে। নিজের হতাশা মেটানোর জন্য কিছু না কিছু তো করবেই সে। ফার্নিচার আছে, ভেঙ্গে ফেলবে। ঘরের চাল জ্বালিয়ে দেবে-ভেতর থেকে আগুন লাগিয়ে দিলে এই আবহাওয়াতেও দাউদাউ করে আগুন জ্বলে উঠতে কোন সমস্যাই হবে না।
অন্ধকারের মাঝে গাছের মধ্য দিয়ে পথ করে বাড়ির দিকে পা বাড়ালো আক্কারস।
.
নীরবতার মাঝে ঘুম ভাঙ্গলো ডেবরার। ঝড়ের মাঝামাঝি সময়ে ঘুমিয়ে পড়েছিল সে। হয়তো ভয়ের হাত থেকে পালাবার জন্য ক্লান্ত দেহ আপনাতেই ঘুমিয়ে গেছে।
হাত বাড়ালো জুলর দিকে কিন্তু নেই কুকুরটা। ডেবরার পাশে বিছানার যে অংশে কুকুরটা ছিল সেখানটা এখনো গরম হয়ে আছে।
মনোযোগ দিয়ে শুনল ডেবরা। পানির মৃদু শব্দ আর অনেক দূরে মাঝে মাঝে বিদ্যুৎ চমকানোর আওয়াজ ছাড়া আর কোন শব্দ নেই।
বিছানা থেকে নেমে দাঁড়ালো। এ সময়ে পরার জন্য টিলা ধরনের ফোলানো পোশাকের মাঝে কাঁপছে শরীর। বুড়ো আঙুল ঠেকালো মেঝেতে। পাথরের মেঝেতে হালকা ব্যালে পাম্প সু পেয়ে পা গলিয়ে দিল।
ড্রেসিংরুমের দিকে যেতে লাগল সোয়েটারের জন্য। এরপর ঠিক করল নিজের জন্য গরম এক কাপ স্যুপ তৈরি করে নেবে।
ঘেউ ঘেউ করে উঠল জুলু। সামনের বাগানে আছে কুকুরটা বোঝা গেল। নিশ্চিত বারান্দার দেয়ালের মাঝে তার জন্য তৈরি করা বিশেষ দরজা দিয়ে বের হয়ে গেছে কুকুরটা।
বিভিন্ন রকম ভাবে ঘেউ ঘেউ করে কুকুরটা। প্রতিটার নির্দিষ্ট অর্থ আছে যা ডেবরা ঠিকই বুঝতে পারে।
নিজের মতো করে উফ শব্দ যেটা শুনে মনে হয় ওয়াচম্যানের-জুন মাসের রাতে দশটা বেজেছে–সবকিছু ঠিক আছে।
অথবা লম্বা একটা একটানা শব্দ। যেটার মানে আজ রাতে পূর্ণিমা আর আমার রক্তে থাকা নেকড়ের রক্ত আমাকে ঘুমাতে দিচ্ছে না।
একটা তীক্ষ্ণ, অর্থবহ ঘেউ ঘেউয়ের মানে হচ্ছে, পাম্প হাউজের কাছে কিছু একটা ঘুরছে। হতে পারে এটা একটা সিংহ।
আর এছাড়া আছে জরুরি কোরাস, ভয়াবহ বিপদ আসছে। সাবধান! সাবধান!
এখন এভাবেই চিৎকার করছে কুকুরটা। এর সাথে সাথে চোয়াল বন্ধ করে গরগর করছে। তার মানে কিছু একটা দেখে ভয় পেয়েছে।
বারান্দায় এলো ডেবরা। অনুভব করল পায়ের জুতা ভিজে গেছে পানিতে। সামনের বাগানে কিছু একটা দেখছে জুলু। গর্জন শুনতে পাচ্ছে। ডেবরা। কিছু একটা নিয়ে যুদ্ধ করছে জুলু।
চুপচাপ দাঁড়িয়ে রইল সে। কী করবে বুঝতে পারছে না। জানে যে ইচ্ছে করলেই যেতে পারবে না জুলুর কাছে। অচেনা শত্রুর সামনে অন্ধ ডেবরা ভয়ঙ্কর অসহায়। দ্বিধার মাঝেই শুনতে পেল ভারী কিছু একটা দিয়ে বাড়ি মারার শব্দ। হাড়ের উপর পড়ে ভাঙার শব্দও পেল সে। থপ করে পড়ে গেল একটা শরীর। হঠাৎ করেই থেমে গেল জুলুর শব্দ। আবার নেমে এলো নীরবতা। কিছু একটা হয়েছে কুকুরটার। এবার সে সত্যিকারের একা হয়ে গেল।
না, পুরোপুরি নীরব নয়। নিঃশ্বাস ফেলার শব্দ পাওয়া যাচ্ছে–জোরে জোরে হাঁপাচ্ছে কেউ।
পিছু হটে বারান্দার দেয়ালের গায়ে সেঁটে গেল ডেবরা। চুপচাপ শুনছে। আর অপেক্ষা করছে।
শুনতে পেল পায়ের শব্দ। বাগানের মাঝে দিয়ে কেউ একজন এগিয়ে আসছে সদর দরজার দিকে। বৃষ্টির কাদায় মাঝে মাঝে পিছলে যাচ্ছে শব্দ।
চিৎকার করে আগন্তুকের পরিচয় জানতে চাইতে ইচ্ছে করল তার। কিন্তু মনে হলো গলার কাছে জমে গেছে কিছু একটা। মনে হলো দৌড় লাগাবে। কিন্তু সামনের সিঁড়িতে পায়ের আওয়াজ পেয়ে নিজের পা দুটো মনে হল জমে গেছে।
বারান্দার জালের নেটের দিকে হাত বাড়ালো কেউ একজন। হ্যাঁন্ডেলে হাত রেখে আস্তে করে মোচড় দিল।
অবশেষে স্বর খুঁজে পেল ডেবরা ‘কে?’ ভয়ার্ত স্বরে কেঁদে উঠল সে। রাতের নীরবতায় কানে বাজালো ঝনঝন করে।
