অনেকক্ষণ পর্যন্ত নিস্তেজ হয়ে পড়ে রইল সে। কাশি থামলে পর ধীরে ধীরে শ্বাস নিতে লাগল স্বাভাবিক ভাবে। স্রোতের টানে জুতো খুলে গেছে বেল্ট থেকে। হারিয়ে গেছে নদীতে। বহুকষ্টে পা টেনে টেনে অন্ধকারে উঠে হাঁটতে লাগল ডেভিড। একটু পরেই দৌড়াতে শুরু করল। মুখের সামনে হাত এনে তালু থেকে দাঁত দিয়ে টেনে টেনে বের করে ফেলতে লাগল কাটার ভাঙা অংশ।
মাথার উপরে এখনো আলো ছড়াচ্ছে তারার দল। এই আলোতে রাস্তা দেখে এগোতে লাগল ডেভিড। প্রতি কদমের সাথে আরো জোরে দৌড়াতে লাগল। চারপাশ একেবারে চুপচাপ। মাঝে মাঝে নীরবতা ভঙ্গ করছে গাছের পাতা থেকে ঝড়ে পড়া পানির ফোঁটা বা বহুদূর থেকে ভেসে আসা বিদ্যুৎ চমকের শব্দ।
বাসা থেকে দুই-মাইল দূরে রাস্তার পাশে কিছু একটা গাঢ় ছায়া দেখল ডেভিড। এর কাছ থেকে কয়েক কদম দূরে থাকতেই বুঝতে পারল যে, এটা একটা গাড়ি বহু পুরাতন শেভি। এখানে এমনিই পড়ে আছে গাড়িটা, নিশ্চয় কোন একটা মাটি-কাদার গর্তে ছিল। বৃষ্টি এসে গর্তের মুখ ধুয়ে দেয়ায় এখন দেখা যাচ্ছে।
দরজা খোলা। ভেতরের আর পার্কিং লাইট জ্বালালে ডেভিড। সিটের উপর পড়ে আছে শুকনো রক্ত। গাঢ় রং। পিছনের সিটে কাপড়ের বান্ডেল। তাড়াতাড়ি খুলে ফেলল সে। তৎক্ষণাৎ বুঝতে পারল জেলেখানার কয়েদীর পোশাক এটা। বোকার মতো খানিকক্ষণ তাকিয়ে রইল সে। এরপর যেন মাথার উপর বাজ পড়ল।
চুরি করা হয়েছে গাড়িটা। রক্ত সম্ভবত দুর্ভাগা মালিকের শরীরের। কয়েদীর পোশাক বদল করা হয়েছে এখানে। সম্ভবত শেভির মালিকের পোশাকের সাথে।
জোহান আক্কারস এখন জাবুলানীতে, এ ব্যাপারে আর কোন সন্দেহই রইল না। যখন এসেছে তখন নিশ্চয়ই লুজান স্ট্রিমের ব্রিজ ঠিক ছিল। না হয় এ গাড়িটা এখানে থাকতো না–তার মানে তিন থেকে চার ঘণ্টা পার হয়ে গেছে এর মাঝে।
গাড়ির পিছনে কয়েদীর পোশাক ছুঁড়ে ফেলে দৌড় লাগাল ডেভিড।
.
জোহান আক্কারস শেভি নিয়ে পৌঁছে গেল লুজান স্ট্রিমের কাছে। পানি তখনো ততটা বাড়েনি। গাড়ির গায়ে লেগে আছে কাদা-পানি। স্টিয়ারিং ঘুরতে চাইছে না। দরজার নিচ দিয়ে আক্কারসের পায়ে লাগছে পানি। কিন্তু তারপরে নিরাপদে পৌঁছালো সে অপর তীরে। নরম মাটিতে ঘুরতে লাগল চাকা। স্কিড করতে লাগল শেভি। জাবুলানি যত কাছে এগিয়ে আসছে ততই মনে হলো অধৈর্য হয়ে উঠল সে। জেলে যাবার আগে আক্কারস ছিল ধীরস্থির স্বভাবের মানুষ। নিজের ইন্দ্রিয়ের উপর পূর্ণ দখল তার।
কিন্তু গত দুই বছরে জেলখানার পরিশ্রম আর প্রতিশোধের আগুন এখন সহ্যের শেষ সীমায় নিয়ে এসেছে তাকে।
বেঁচে থাকার একমাত্র কারণই হচ্ছে প্রতিশোধ নেয়া। প্রতিদিন না হলেও শত বার ব্যাপরটা আগা-গোড়া প্রতিটি অংশ রিহার্সাল করেছে সে। এমনভাবে পরিকল্পনা করেছে যেন জেল ভেঙ্গে তিনদিনের জন্যে মুক্তিলাভই যথেষ্ট হয়। এর মাঝেই যা করার করে ফেলবে সে। তারপর যা হয় হোক।
নিজের চোয়ালে নিজেই ব্যথা সৃষ্টি করেছে সে। দূষিত সুইয়ের খোঁচা দিয়ে পচন ধরিয়েছে। তারপর তার পরিকল্পনা মতো তাকে দাঁতের ডাক্তারের কাছে নিয়ে যাওয়া হয়েছে। গার্ডকে কাবু করতে কোন বেগ পেতে হয়নি। আর গলায় স্কালপেল ধরতেই ডেন্টিস্টও সাহায্য করতে দ্বিধা করেনি।
জেলখানা থেকে বের হবার সাথে সাথেই স্কালপেলটা ব্যবহার করেছে আক্কারস। অবাক হয়ে গেছে দেখে যে একটা মানুষের গলার শিরা দিয়ে কতটা রক্ত চলাচল করে। ময়লা ফেলার একটা জায়গাতে নিজের গাড়ির স্টিয়ারিং হুইলের উপর ফেলে এসেছে ডেন্টিস্টের মৃতদেহ। নিজের কয়েদীর পোশাকের উপর চাপিয়েছে সাদা গাউন। এরপর অপেক্ষা করছে ট্রাফিকের লাইটের জন্য।
লাল আলো দেখে থেমে গিয়েছিল চকচকে নতুন শেভি গাড়িটা। আক্কারস প্যাসেঞ্জার ডোর খুলেই গিয়ে বসল ড্রাইভারের গা ঘেঁষে।
লোকটা উচ্চতাতে আক্কারসের চেয়ে খাটো, মাংসল, সুখী-সুখী চেহারা, মসৃণ ত্বক, স্টিয়ারিং হুইল রাখা ছোট ছোট হাতে তেমন পশম নেই। আক্কারসের আদেশ হাসিমুখে মেনে নিয়ে গাড়ি চালাতে লাগল।
তুলতুলে সাদা শরীরের কাছে গড়িয়ে গেল আক্কারস। একটু পরেই তেমন ব্যবহার করা হয় না এমন একটা রাস্তায় ফেলে দিল মৃতদেহ। এরপর মাত্র চল্লিশ মিনিটের মাথায় শহরের বাইরের প্রথম রোড ব্লকে চলে এলো।
পাশের রাস্তা ধরে ধীরে ধীরে পূর্ব দিকে এগিয়ে এলো। চোয়ালে ইনফেকশনের ব্যথা মাথাচাড়া দিয়ে উঠল। ডেন্টিস্ট অবশ্য অ্যান্টিবায়োটিক দিয়েছিল। কিন্তু কাজ হয়েছে বলে মনে হয় না। গিয়ার লিভারের উপর তেমন কাজ করতে পারছে না অর্থব একটা হাত। ছিঁড়ে যাওয়া পেশী আর নার্ভগুলো আর জোড়া লাগেনি। মৃতের মতো হয়ে গেল হাতটা, নির্জীব।
প্রাকৃতিক ভাবেই একজন শিকারি সে। তার উপর রেডিওতে প্রচারিত হওয়া আবহাওয়ার সংবাদ শুনে মনে হচ্ছে ভাগ্য তার সহায় আছে। এখন জাবুলানিতে পৌঁছে আর তর সইছে না তাই।
চল্লিশ মাইল গতিতে কাদার গর্তে পড়ে গেল শেভি। পড়ে ঘুরতে লাগল চাকা। পেছন দিক কাদার গভীরে দেবে গেল।
সেখানেই গাড়িটাকে রেখে দিল আক্কারস। বৃষ্টি মাথায় হাঁটা শুরু করল যত দ্রুত সম্ভব। একবার মনে হল ঠাণ্ডায় দাঁতে দাঁত বাড়ি খেল। তারপর আবারো নিঃশব্দে লম্বা লম্বা পা ফেলে এগোতে লাগল।
