উইটবাঙ্কের পর রাস্তা হয়ে গেল সরু। গাড়িতে গাড়িতে ভিড় জমে গেছে। আর প্রতিটি মোড় হয়ে উঠল বিপজ্জনক। ডেভিড মনোযোগ দিল রাস্তার উপর। জোর করে মন থেকে তাড়িয়ে দিল জনের ভুতকে।
লিনডেনবার্গে টার্ন নেয়ার পর চারপাশে গাড়ির সংখ্যা কমে গেল। মাঝে মাঝে একটা দুটো ট্রাক। আবারো গতির ঝড় তুলে এগোতে লাগল গাড়ি। এরপর হঠাৎ করে রাস্তা আবার মোড় নিয়ে নিচু ভূমিতে চলা শুরু করল।
ইরাসমাস টানেল থেকে বের হবার পর বৃষ্টির দেখা পেল ডেভিড। বাতাসে ভরে আছে কালো মেঘ। রাস্তা ভেসে যাচ্ছে পানিতে। ফলে গতি কমাতে বাধ্য হলো পিচ্ছিল রাস্তায় ডেভিড। উইন্ডশীল্ড পর্যন্ত পানির ধারা মুছে শেষ করতে পারছে না।
নিজের গাড়ির হেডলাইট জ্বালিয়ে নিল ডেভিড। এর ভেতরেও যত জোরে সম্ভব ছুটতে লাগল। নিজের সীটের উপর বসে গলা বাড়িয়ে সামনে তাকিয়ে রইল বৃষ্টি ভেদ করে দেখতে পাবার আশায়।
বৃষ্টির কারণে সন্ধ্যা এলো তাড়াতাড়ি। ভেজা রাস্তায় নিজের হেডলাইটের প্রতিবিম্ব মনে হল চোখ ধাধিয়ে দেবে। আর বৃষ্টির ফোঁটা মনে হল পাথরের মতো সশব্দে আড়ছে পড়তে লাগল। বাধ্য হলো গতি আরো খানিকটা কমাতে। সামনের রাস্তা চলে গেছে ব্যান্ডেলিয়ার হিলের দিকে।
অন্ধকারের কারণে আরেকটুকু হলেই মিস করে যেত মোড়। গাড়ি ঘুরিয়ে আবারো ফিরে এলো সে।
কাদামাটিতে পুরো রাস্তা ভরে গেছে। আবারো গতি কমাতে বাধ্য হলো সে। একবার তো ভুল করে চাকা হড়কে পাশের নালার মাঝেই পড়ে যাচ্ছিল আরেকটুকু হলে। এরপর চাকার নিচে আলগা পাথর বসিয়ে ইঞ্জিন চালিয়ে কোনমতে পার হলো এ রাস্তা।
লুজান স্টিমের ব্রিজের উপর যখন পৌঁছালো তখন ছয় ঘণ্টা হয়ে গেছে যে সে একনাগাড়ে বসে আছে পন্টিয়াকের হুইলের উপর। ঘড়িতে তখন আটটা বেজে আরো কয়েক মিনিট।
ব্রিজে পৌঁছাতে পৌঁছাতে হঠাৎ করেই আবার থেমে গেল বৃষ্টি। আবহাওয়া মনে হলো খেলা করতে লাগল তাকে নিয়ে। মাথার উপরেই দেখা গেল তারাদের মিটমিটে রহস্যময় আলো। চারপাশে অলস ভাবে ভাসছে কয়েক টুকরো মেঘ।
অন্ধকার চিরে দিল ডেভিডের হেডলাইট। দূরে একশ গজ পর্যন্ত দেখা যাচ্ছে পরিষ্কার ভাবে। পনের ফুট পানির নিচে তলিয়ে গেছে ব্রিজ। পানির স্রোত এত বেশি যে নিচের পাথরগুলো দেখা যাচ্ছে চকচক করছে। এর সাথে সাথে ভাসছে উপড়ে যাওয়া গাছের গুঁড়ি।
এখনকার অবস্থা দেখে বিশ্বাস করতে কষ্ট হবে যে এখানেই নদীবক্ষে বালির উপর দিয়ে সবুজ ফোর্ড নিয়ে জোহান আক্কারস তাড়া করেছিল কনরাড বার্গকে।
পন্টিয়াক থেকে নেমে পানির কিনারে গিয়ে দাঁড়াল ডেভিড। দাঁড়াতেই বুঝলে পারল যে পানি আরো বাড়বে।
চোখ তুলে তাকাল আকাশের দিকে। হিসাব কষে দেখল।
সিদ্ধান্ত নিয়ে নিল তৎক্ষণাৎ। দৌড়ে গেল পন্টিয়াকের দিকে। রিভার্স করে যতদূর যাওয়া যায় গেল। হেডলাইট এখনো নদীর কিনারে আলো ফেলছে। এরপর দরজার পাশে দাঁড়িয়ে শার্ট খুলে ফেলল। ট্রাউজার থেকে বেল্ট খুলে নিয়ে কোমরে পেঁচালো। জুতা জোড়া বেল্টের সাথে বেঁধে নিল।
খালি পায়ে দৌড়ে গেল পানির কিনারে। বুঝতে পারল নদীতীরে পা পিছলে যাচ্ছে। আরো কয়েক কদম এগিয়ে হাঁটু পানিতে যেতেই স্রোত ভাসিয়ে নিল তাকে। সর্বশক্তি দিয়ে নিজেকে ঠিক দিকে ধরে রাখল ডেভিড।
এভাবেই খানিক দাঁড়িয়ে রইল সে। সামনের দিকে তাকিয়ে দেখল একটা গাছের গুঁড়ি আসছে ভেসে ভেসে। শাখা-প্রশাখা এমন ভাবে ছড়িয়ে আছে যে শিকড় দেখে মনে হচ্ছে গাছের হাত-পা। এখনি পার হয়ে যাবে তার কাছে দিয়ে।
সময় হিসেবে করে ঝাঁপ দিল ডেভিড। অর্ধডজন শক্তিশালী স্টোক তাকে পৌঁছে দিল গুঁড়িটার কাছে। সাঁতার কেটে ধরে ফেলল একটা শিকড়। তৎক্ষণাৎ হেডলাইটের আলো থেকে ভয়ঙ্কর স্রোতশীল নদীর বুকে পড়ল সে। গাছের গুঁড়ি আঁকড়ে একবার ডুবে, একবার ভেসে কাশতে কাশতে এগিয়ে চলতে লাগল ডেভিড, একের সময় মনে হলো দম বন্ধ হয়ে যাবে।
হঠাৎ করেই কিছু একটা খোঁচা মারলো তাকে। কোমরের বেল্টের সাথে পেঁচানো শার্ট ছিঁড়ে চামড়াও কেটে গেল। আবারো পানিতে ডুবে গেল সে। তারপরেও ছাড়লো না গাছের গুঁড়ি।
চারপাশে অন্ধকারের মাঝে শুধু পানির বয়ে চলার শব্দই পাওয়া যাচ্ছে। এর শক্তির কাছে নিঃশেষ হয়ে যেতে লাগল ডেভিড। হাত-পা ছুঁড়ে জ্বালা করতে লাগল পাথরের টুকরা গাছের ভাঙা অংশের আঘাতে।
হঠাৎ করেই মনে হলো কোন কিছুর গায়ে আটকে গেছে গাছের গুঁড়ি। কেমন করে আবারো ছাড়া পেয়ে আবারো স্রোতে ভেসে যেতে লাগল।
কাদা জল চোখে গিয়ে মনে হলো অন্ধ হয় গেছে সে। জানে যে এভাবে বেশিক্ষণ টিকে থাকা সম্ভব নয়। ইতিমধ্যেই বেশ দুর্বল হয়ে পড়েছে। বুঝতে পারল মাথা কাজ করছে না। শরীর চলতে চাইছে না। মনে হলো কোন দৌড় প্রতিযোগিতায় দশম রাউন্ড শেষ করেছে সে।
বহুকষ্টে কাছাকাছি তীরের কাছে গিয়ে ঝাঁপ দিল ডেভিড। হাত থেকে সরে গেল গাছের গুঁড়ি। টান দিয়ে ধরল একটা কাটা গাছ। সর্বশক্তি দিয়ে টেনে ধরে উঠে এলো পাড়ে। হাতের তালু ছিঁড়ে গেল ছাঁটার খোঁচায়। ব্যথায় চিৎকার করে উঠল ডেভিড। তারপরেও ছাড়ল না। আস্তে আস্তে পানি থেকে উঠল হামাগুড়ি দিয়ে। কাশতে কাশতে ফুসফুস থেকে উগড়ে দিল পানি। নদীর তীরে কাদার উপর মুখ দিয়ে পড়ে গেল। বমির তোড়ে ভিজে গেল নাক মুখ।
