হাঁ করে তাকিয়ে রইল ডেভিড। এতটাই ধাক্কা খেয়েছে যে মুখে কথা ঝরছে না।
‘ডেবরা কী একা?’ জানতে চাইল কনরাড়। মাথা নাড়াল ডেভিড। ক্ষত বিক্ষত টিস্যু ঢাকা মুখটা শক্ত হয়ে আছে। কিন্তু চোখগুলোতে বাসা বেঁধেছে
তুমি এখনি চলে যাও।
আবহাওয়া–সব এয়ারক্রাফট কে নামিয়ে আনা হয়েছে।’
‘আমার ট্রাক নিয়ে যাও!’ তাড়াতাড়ি বলে উঠল কনরাড।
এর চেয়েও দ্রুতগতির কিছু প্রয়োজন আমার।
“তুমি কি চাও আমিও আসি তোমার সাথে?
না, জানাল ডেভিড। আপনি আজ সন্ধ্যায় এখানে না থাকলে তারা নতুন বেড়ার জন্যে বরাদ্দ দেবে না। আমি একাই চলে যাবো।
.
ডেস্কে বসে কাজ করছে ডেবরা, এমন সময় বাতাসের শব্দ শুনতে পেল। টেপ রেকর্ডার বন্ধ করে বারান্দায় গেল। কাছে কাছে রইল কুকুরটা।
দাঁড়িয়ে গর্জন শুনল খানিকক্ষণ। বুঝতে পারল না কিসের আওয়াজ। কেমন যেন একটা শব্দ, মনে হল পাথুরে সমুদ্রতীরে আছড়ে পড়ছে ঢেউ।
কুকুরটা সরে এলো ডেবরার পায়ের কাছে। উবু হয়ে পাশে বসে কুকুরের গলায় হাত বুলাতে লাগল ডেবরা। শুনতে লাগল বাতাসের গর্জন। বুঝতে পারল ক্রমশ বাড়ছে। মারুল্লা বনে গাছের ডাল ভেঙ্গে পড়ার শব্দ পাওয়া গেল।
নাক দিয়ে শব্দ শুরু করল জুলু। নিজের আরো কাছে টেনে নিল ডেবরা।
‘কিছু হবে না। এইতো এইতো’, ফিসফিস করল ডেবরা। সর্বশক্তি নিয়ে ঝাঁপিয়ে পড়ল বাতাস। গাছের মাথা ভেঙ্গে পড়ার পটপট শব্দ পাওয়া গেল।
বারান্দায় পোকা-মাকড়ের হাত থেকে বাঁচার জন্য যে জাল লাগানো হয়েছিল তার উপর পড়ল এসে গাছের ভাঙা অংশ। মনে হলো নৌকার বড় পাল ছিঁড়ে পড়েছে। কামানের গোলার মতো ছিটকে গেল দরজা জানালার হুড়কো।
লাফ দিয়ে পিছন ফিরে নিজের কাজের রুমে ফিরে এল ডেবরা। জানালার পাল্লা বাড়ি খেতে লাগল এপাশ-ওপাশ ধুলা। ময়লা সব ঢুকে যেতে লাগল-এর মাঝ দিয়ে কাধ ঠেকিয়ে আটকে ফেলল ডেবরা জানালা। এরপর একই ভাবে দৌড়ে গিয়ে আটকালো আরো একটি জানালা। এর মাঝে দৌড়ে এলো ভৃত্য।
ম্যাডাম বৃষ্টি আসবে এখন। অনেক বৃষ্টি।
যাও, তোমার পরিবারের কাছে যাও।’ ভৃত্যকে জানাল ডেবরা।
‘ডিনার ম্যাডাম?’
‘চিন্তা করো না। আমি তৈরি করে নেব।’
কৃতজ্ঞ দৃষ্টিতে ভূত্যের দল দৌড় লাগাল তাদের ঘরের দিকে।
পনের মিনিট ধরে স্থায়ী হল এই দমকা বাতাস। এক জায়গায় দাঁড়িয়ে রইল ডেবরা। বুঝতে পারল তার শরীর কাঁপছে। উত্তেজিত হয়ে হাসতে শুরু করল ডেবরা। ঝড়ের তাণ্ডব উপলব্ধি করে।
এরপর হঠাৎ করেই থেমে গেল বাতাস। যেভাবে হঠাৎ এসেছিল সেভাবে হঠাৎ করেই শান্ত হয়ে গেল চারপাশ। শুনতে পেল পুলের উপর দিয়ে পাহাড়ের দিকে চলে গেল বাতাসের গর্জন।
নিঃশব্দতার মাঝে মনে হল পুরো পৃথিবী অপেক্ষা করে আছে যে কিছু একটা ঘটবে। ঠাণ্ডা লাগল ডেবরার, তাপমাত্রা হঠাৎ করে কমে গেল। মনে হল হঠাৎ করে বরফের বাক্স খুলে গেছে। কাঁপতে লাগল ডেবরা। কিন্তু দেখতে পেল না যে বিশাল বড় একটা কালো মেঘ অন্ধকার ছড়িয়ে দিল জাবুলানির উপর। কিন্তু তারপর কীভাবে যেন খানিকটা অনুভব করলো যে কী ঘটতে চলেছে।
প্রথম বিদ্যুৎ চমকের সাথে সাথে এত শব্দ হল যে ডেবরা নিজেও বুঝতে পারল না যে ও কাঁদতে শুরু করেছে। এত জোরে বাজ পড়ল যে মনে হল সারা আকাশ ভেঙ্গে চুড়ে পড়বে। পৃথিবীর ভূমিতল পর্যন্ত কেঁপে উঠল।
ঘুরে দাঁড়িয়ে আরো ভেতরের দিকে সরে যেতে চাইল ডেবরা। নিজের বেডরুমে গিয়ে দরজা বন্ধ করে দিল। কিন্তু বৃষ্টি আসার পর মনে হল দেয়ালের বাধাও মানতে চাইছে না পানির স্রোত। ড্রামের মতো শব্দ হতে লাগল চারপাশে। মনে হলো কানে তালা লেগে যাবে। জানালার কাঁচ ভেঙ্গে কাঠামো শব্দ করে বাড়ি ভেসে গেল পানিতে।
এত বৃষ্টির পরেও বজ্রপাতের কড়কড় শব্দে নার্ভাস বোধ করতে লাগল ডেবরা। প্রতিবার ভয়ে কেঁপে উঠতে লাগল ডেবরা। আর মনে হল সরাসরি ওর উপরই পড়তে লাগল বজ্রপাত।
নিজের বিছানার উপর গুটিসুটি মেরে বসে রইল সে। কাছে জড়িয়ে ধরল জুলুকে। মনে হলো ভূত্যদেরকে চলে যেতে বলাটা ঠিক হয়নি। মনে হল বোমার মতো বজ্রপাতের আঘাতে কিছু একটা হয়ে যাবে ওর।
অবশেষে আর ধরে রাখতে পারল না নিজেকে। লিভিংরুমের দিকে পা বাড়ালো। অবস্থা এমন হলো যে, মনে হলো নিজের রুমের পথঘাট ভুলে গেছে সে, তারপরও টেলিফোন হাতে পেয়ে কানের কাছে তুলল।
সাথে সাথে বুঝতে পারল ফোন ডেড হয়ে আছে। কোন শব্দ নেই। তারপরেও পাগলের মতো ডায়াল করতে লাগল। কিন্তু শেষমেশ বাধ্য হলো ছেড়ে দিতে। তারের সাথে ঝুলতে লাগল রিসিভার।
নিজের কাজের রুমে ফিরে আসতে আসতে ফুঁপিয়ে কান্না করতে লাগল ডেবরা। নিজের পেটে হাত বুলিয়ে অনুভব করল সন্তানের উপস্থিতি। বিছানার উপর ধপ করে বসে দুই হাতে কান ঢাকালো। বন্ধ করো চিৎকার করে উঠল ডেবরা। বন্ধ করো। ওহ, প্লিজ গড়, বন্ধ কর।
.
নতুন তৈরি করা ন্যাশনাল হাইওয়ে যেটা কয়লার খনির শহর উইটবাঙ্ক পর্যন্ত গেছে, বেশ চওড়া আর মসৃণ। ছয় লেন ধরে গাড়ি-ঘোড়া চলছে। প্রথম লেনে ভাড়া করা পন্টিয়াক চালাতে লাগল ডেভিড। পা শক্ত করে চেপে বসে রইল। ঘন্টায় একশ ত্রিশ মাইল বেগে চলতে লাগল গাড়ি। রাস্তার উপর এতটাই স্বচ্ছন্দে চলতে লাগল গাড়ি যে মনে হলো ড্রাইভ না করলেও চলবে। মনের মাঝে সব ভয়ের কাহিনী ভাসতে লাগল। মনে পড়ে গেল কোর্ট রুমে অপরাধীর কাঠগড়ায় দাঁড়িয়ে কেমন শীতল চোখে তাদের দিকে তাকিয়ে ছিল জোহান আক্কারস। গভীরে কোটরে বসা কাদার মতো চোখ, মুখ খোলা মানে হল এখনি থুথু মেরে বসবে। ওয়ার্ডার এসে সিঁড়ি দিয়ে নামিয়ে জেলেখানায় নিয়ে যাবার সময় পিছন ফিরে চিৎকার করেছিল আক্কারস, ‘আমি তোকে দেখে নিব। এর জন্যে যদি উনত্রিশ বছরও লেগে যায় আমি অপেক্ষা করব।’ এরপর জেলে কক্ষে ঢুকিয়ে দেয়া হল আক্কাসকে।
