গোপনে কনরাড বার্গ এসে ডেবরার সাহায্য নিতে লাগল যেন ডেভিড বোর্ড অব দ্য ন্যাশনাল পার্ক কমিটিতে মনোনয়ন পায়। সবিস্তারে আলোচনা করল দু’জনে। বোর্ডে একটা আসন মানে মানুষটা বেশ সম্মানীত হবে আর ডেভিডের চাইতেও বয়সে বড় আর প্রভাবশালী হবে। কিন্তু কনরাড এ ব্যাপারে আত্মবিশ্বাসী যে ডেভিডের সম্পদ আর নামের শেষে মরগ্যান পদবী, জাবুলানির মালিকানা, সংরক্ষণের প্রতি তার আগ্রহ আর এ সমস্ত কাজে যোগদানের জন্যে অফুরন্ত সময় দেখে নিশ্চয়ই বোর্ড সদস্যদের মন গলবে।
‘হা। সিদ্ধান্ত নিল ডেবরা। এটা ওর জন্যে ভালই হবে। আরো একটু বাইরে যাওয়া, বাইরের মানুষের সাথে মেশা, এখানে একা থাকলেই বরঞ্চ বিপদে পড়ব আমরা।’
করতে চাইবে সে?
‘চিন্তা করবেন না। এ ভার আমার উপর ছেড়ে দিন।
ডেবরার সিদ্ধান্তই সঠিক হয়েছে। বোর্ডের সাথে প্রথমবার সাক্ষাতের জড়তা কাটিয়ে ওঠার পর অন্যান্য সদস্যরাও যখন অভ্যস্ত হয়ে উঠতে লাগল এরকম অদ্ভুত বিভৎস চেহারা দেখতে আর বুঝতে পারল যে ডেভিড কতটা আন্তরিক আর উদ্যমী মানুষ, নিজের উপর আস্থা ফিরে পেল ডেভিড। এরপর প্রায়ই প্রিটোরিয়াতে বোর্ডের সাথে দেখা করতে লাগল সে। ওর সাথে উড়ে বেড়াত ডেবরা। আর বোর্ড মিটিংয়ের সময় জেন বার্গের সাথে ঘুরে ঘুরে সন্তান আর গৃহস্থালির আরাম আয়েশের সব কেনাকাটা সারতো। সাধারণত এসব জিনিস পাওয়া যেত না নেলটে।
কিন্তু নভেম্বর নাগাদ খারাপ লাগা শুরু করল ডেবরার। আর বেশ বড়সড় ভারী হয়ে গেল শরীর। বুঝতে পারলো নাভাজোর ককপিটে বসে লম্বা ভ্রমণ করা সম্ভব নয়। বিশেষ করে এমন সময়ে যখন-তখন বৃষ্টি হতে পারে বাতাসে ভরে উঠল মেঘের গুরুগুরু ডাক আর কালো মেঘে বেশির ভাগ সময় আচ্ছন্ন থাকে আকাশ। আর এরই মাঝে নিজের বইয়ের শেষ অংশ নিয়েও ব্যস্ত হয়ে গেল ডেবরা। আমি এখানে ভালোই থাকবো। ডেভিডকে আশ্বস্ত করল যে ‘আমার কাছে একটা টেলিফোন আছে, ছয়জন গেম রেঞ্জার, চারজন ভৃত্য আর ভয়ঙ্কর একটা হাউন্ডও আছে পাহারা দেবার জন্যে।
কিছুই মানতে চাইলো না ডেভিড। মিটিংয়ে যাবার আগে ঝগড়া করল পুরো পাঁচ দিন। অবশেষে রাজি হল।
‘আমি ভোর হবার আগেই বের হয়ে যাবো। নয়টার মাঝে মিটিংয়ে পৌঁছে যাবো। তিনটার ভেতরে আমাদের অধিবেশন শেষ হয়ে যাবে আর আমার এখানে ফিরে আসতে আসতে খুব বেশি হলে সাড়ে ছয়টা বাজবে।’ বিড়বিড় করল ডেভিড। আর যদি দেখি যে বাজেট তৈরি হয়নি, ফিনালশিয়াল অ্যাফেয়ারস ভোট দিয়েছে, তাহলে আমি অসুস্থ বলে চলে আসব।
‘এটা বেশি জরুরি, ডার্লিং। তুমি যাও।
‘তুমি ঠিক বলছো তো?’
‘আমি তো এমনকি বুঝতেও পারব না যে তুমি এখানে নেই।
‘এটা নিয়ে খুশি হয়ো না।’ ডেবরাকে জানালো ডেভিড। এমনো তো হতে পারে যে তোমাকে শাস্তি দেবার জন্যে থেকেও গেলাম।
সকালবেলা ওয়াইন রঙের বিদ্যুৎ চমকাতে লাগল। মাঝে মাঝে মনে হলো আকাশ ঢেকে গেল ধোয়ায়, কখনো মনে হল পাকা ফলের মতো টসটসে হল রং। ছোট্ট এয়ারক্রাফটটা এই জমকালো আবহাওয়ার হাতে পড়ে নাজেহাল হতে লাগল।
খোলা আকাশে একাই উড়ে বেড়াতে লাগল ডেভিড। আর নিজের মাঝে এই সান্ত্বনা ছিল যে আকাশে কখনো কিছু হয়নি তার। মাঝে মাঝেই কোর্স বদল করে পর্বত প্রমাণ সব মেঘমালা পার হল সে। এগুলোর মাঝে লুকিয়ে আছে মৃত্যু আর ধ্বংস। ঘূর্ণিবাতাস মেশিন থেকে পাখা খুলে নিয়ে যাবে। টুকরো টুকরো করে ভাসিয়ে দিবে উপরে। এত উপরে অক্সিজেন ছাড়া একটা মানুষকে টিকে থাকার কোন আশাই থাকবে না।
গ্রান্ড সেন্ট্রালে ল্যান্ড করল সে। ভাড়া করা গাড়ি এখানে অপেক্ষা করছিল তার জন্য। সকালের সংবাদপত্র পড়তে পড়তে প্রিটোরিয়া পৌঁছালো ডেভিড। শুধুমাত্র তখন অস্বস্তি হতে লাগল যখন আবহাওয়ার পাতায় দেখতে পেল মোজাম্বিক চ্যানেল থেকে দৃঢ়ভাবে এগিয়ে আসছে একটি ঝড়।
কনফারেন্সরুমে ঢোকার আগে রিসিপসনিস্টকে বলল জাবুলানিতে ফোন লাগাতে।
‘দুই ঘণ্টা দেরি হবে, মি: মরগ্যান।
ঠিক আছে লাইন পাওয়া গেলেই জানাবে আমাকে।
লাঞ্চের সময় আবারো মেয়েটাকে জিজ্ঞেস করল।
আমার ফোনের কী হল?
‘আমি দুঃখিত মি: মরগ্যান। আমি আপনাকে জানাতেই যাচ্ছিলাম, লাইন নষ্ট হয়ে গেছে। নিচু জায়গাতে প্রচুর বৃষ্টি হচ্ছে।
অস্পষ্ট অস্বস্তি বয়ে নিয়ে এলো মৃদু চিন্তা।
‘আবহাওয়া অফিসে ফোন করা যাবে?
আবহাওয়ার অবস্থা একেবারে বেহাল দশা বলা যায়। বাবারটন থেকে মপুভা মিলিয়া এবং লরেঙ্কো মারকুইস থেকে মাকাদোৰ্ডপ পর্যন্ত চলছে অবিরাম বৃষ্টিপাত। মাত্র বিশ হাজার ফুট উপরেই মেঘ। মনে হচ্ছে এখনি ভেঙ্গে পড়বে মাটিতে। নাভাজোতে কোন অক্সিজেন আর ইলেকট্রনিক নেভিগেশনাল যন্ত্রপাতি নেই।
‘কতক্ষণ পর্যন্ত আবহাওয়া অফিসে অফিসারের কাছে জানতে চাইল ডেভিড।
কতক্ষণ লাগবে পরিষ্কার হতে?
‘বলা কঠিন স্যার। দুই থেকে তিন দিন।
‘ধুত্তোরি! তিক্তভাবে চিৎকার করে উঠল ডেভিড। দৌড় দিল গভর্নমেন্ট বিল্ডিংয়ের নিচতলায় থাকা ক্যান্টিনে। কোণায় একটা টেবিলে অন্য আরো দু’জন বোর্ড মেম্বারের সাথে বসে আছে কনরাড বার্গ। কিন্তু ডেভিডকে দেখার সাথে সাথেই খোঁড়াতে খোঁড়াতে যত দ্রুত সম্ভব চলে এলো কাছে।
‘ডেভিড’, হাত ধরল কনরাড। গোলাকার লাল মুখটা বেশ সিরিয়াস দেখাচ্ছে। আমি এই মাত্র শুনলাম–গত রাতে জেল থেকে পালিয়েছে জোহান আক্কারস। একজন গার্ডকে খুন করে হাওয়া হয়ে গেছে। সতেরো ঘণ্টা হয়ে গেছে কোন পাত্তা নেই।
