এই কাজের জন্যে থোরের পয়েন্ট টু-টু-টু স্নাইপার রাইফেল সবচেয়ে উপযোগী। এক্সট্রা লং ব্যারেল, ম্যাচ গ্রেড অ্যামুনিশন ব্যবহার করার জন্যে তৈরি করা হয়েছে, সাথে রয়েছে নতুন লেয়ার সাইট-সাতশ গজ দূর থেকে অব্যর্থ লক্ষ্যভেদ সম্ভব।
স্নাইপারকে শুধু বা হাত দিয়ে স্টকের মাথায় বোতামটা টিপতে হবে, সাথে সাথে রওনা হয়ে যাবে লেজার রশ্মিরশ্মি যে পথে গেছে সেই একই পথ ধরে যাবে বুলেটও। সিকি আকৃতির উজ্জ্বল সাদা মুদ্রার মতো দেখাবে ওটাকে, সাইটের টেলিস্কোপিক লেন্সে চোখ রেখে সাদা আলোটাকে পরিষ্কার দেখতে পাবে স্নাইপার। টার্গেটের ঠিক জায়গায় ওটাকে দেখতে পাবার সাথে সাথে ট্রিগার টানবে সে। এমনকি অদক্ষ একজন মার্কসম্যানের ব্যর্থ হবার কোনো আশঙ্কা নেই।
চাইলে কলিন নোবলস্ ওকে একটা না দিয়ে পারবে না। থোর কমান্ডের কমান্ডিং অফিসার হিসেবে এমন ব্যবস্থাও তার পক্ষে করা সম্ভব, প্যারিসের মার্কিন দূতাবাস থেকে নিজে এসে সিনিয়র একজন মিলিটারি অ্যাটাশে পিটারকে উপহার দিয়ে যাবে রাইফেলটা।
অথচ সে উপলব্ধি করল প্ল্যানটা নিয়ে অযথা সময় নষ্ট করছে সে, কাজে নেমে পড়ার কোনো তাগাদা অনুভব করছে না।
ব্রাসেলসে ফেরার পর মোল দিন পেরিয়ে যাচ্ছে, আজ শুক্রবার। সকালটা শহরের উত্তরে ন্যাটো রেঞ্জে কাটাল পিটার। শর্টরেঞ্জ অ্যান্টি-ট্যাঙ্ক মিসাইলে যে রাডার গাইডেন্স থাকে সেটাকে ফাঁকি দেয়ার জন্যে নতুন একটা ইলেকট্রনিক শীল্ড বানিয়েছে, পরীক্ষা করে দেখা হচ্ছিল সেটা। তারপর ইরানিয়ান অফিসারদের সাথে হেলিকপ্টার যোগে শহরে ফিরে এল ও, ওদেরকে নিয়ে লাঞ্চ খেল উপাউলে দে মুর্ত এ। লাউঞ্চে বসে গল্পগুজব চলল অনেকক্ষণ, তিনটে ঘণ্টা অপব্যয় হওয়ায় অপরাধবোধ দূর করার জন্যে রাত আটটা পর্যন্ত কাজ করল অফিসে।
চারদিকে অনেক আগেই অন্ধকার নেমে এসেছে, পিছনের দরজা দিয়ে বেরিয়ে এল পিটার। জানে অন্ধকার রাস্তায় খলিফার লোক ওত পেতে থাকতে পারে, সেজন্যে সম্ভাব্য সতর্কতা অবলম্বনে অবহেলা করেনি। কবে কোন দরজা দিয়ে বেয়োয় কেউ বলতে পারবে না, কখন বেরোয় তারও কোনো ঠিক নেই। প্রতিদিনই আলাদা রাস্তা ব্যবহার করে। গ্র্যান্ড প্যালেস থেকে আজ কয়েকটা সান্ধ্য পত্রিকা কিনল ও, চৌরাস্তায় প্রায় সবটুকু দেখা যায় এমন একটা কফি শপে বসে প্রথমে ইংরেজি পত্রিকাটা পড়ল।
হেডিংটা লাফ দিয়ে উঠে এল চোখে।
‘অপরিশোধিত তেলের দাম কমল।‘
কফির কাপে চুমুক দিতে দিতে রিপোর্টটা পড়ল পিটার, দ্রুর ওপর কুঁচকে থাকল চামড়া। পড়া শেষ করে মুখ তুলল ও। রাস্তা দিয়ে ট্যুরিস্টরা দল বেঁধে হাঁটছে, হাসি-আনন্দে মুখর সবাই।
ব্যাপারটা ব্ল্যাকমেইল। প্রাণ হরণের হুমকিতে কাজ হয় কিনা তার পরীক্ষা। আন্তর্জাতিক বাজার নিয়ন্ত্রণ করার প্রথম প্রচেষ্টা খলিফার। পুরোপুরি সফল হয়েছে সে।
তার আত্মবিশ্বাস বেড়ে যাবে। ক্ষমতার লোভে সীমা ছাড়িয়ে নির্দয় হয়ে উঠবে সে। হত্যাযজ্ঞের নায়িকা হিসেবে আত্মপ্রকাশ করবে এবার।
পিটার জানে আর তার দেরি করা উচিত নয়। দ্রুত কয়েকটা সিদ্ধান্ত নিয়ে ফেলল ও। মিথ্যে একটা অজুহাত তৈরি করে সোমবার সকলে লন্ডনে যাবে ও, আগেই ব্যবস্থা করবে এয়ারপোর্টে যাতে দেখা হয় কলিনের সাথে। তাকে সব কথা জানানোর দরকার আছে। পিটার জানে, তার কাছ থেকে পূর্ণ সমর্থন পাবে বলে আশা করতে পারে ও। তারপর ফিরে আসবে প্যারিসে, শেষবার ভেবে নেবে বধ্যভূমি। কালেকশনের প্রদর্শনী শুরু হতে এখনো দুসপ্তাহ বাকি। আরো ভালোভাবে প্ল্যান করার জন্যে যথেষ্ট সময় থাকবে হাতে।
হঠাৎ করেই ক্লান্তি অনুভব করল পিটার, যেন সিদ্ধান্ত নিতে গিয়ে শরীরের অতিরিক্ত শক্তি ক্ষয় হয়ে গেছে। এতই ক্লান্ত, হোটেল পর্যন্ত সামান্য পথ হেঁটে আসতে দম ফুরিয়ে গেল ওর। হুইস্কির অর্ডার দিল ও, গ্লাসে ধীরে ধীরে চুমুক দিয়ে চাঙা হতে চেষ্টা করল।
নার্মকোর তরফ থেকে হিলটনের দুটো স্যুইট সারা বছর সিনিয়র একজিকিউটিভ আর গুরুত্বপূর্ণ ভিজিটরদের জন্যে রিজার্ভ রাখা হয়, তারই একটায় থাকছে পিটার। গ্লাস হাতে এক ঘর থেকে আরেক ঘরে হাঁটাহাঁটি করল কিছুক্ষণ, কিন্তু নিঃসঙ্গতার যন্ত্রণা থেকে নিস্কৃতি পাওয়া গেল না।
নিঃসঙ্গতা অনেক দিন থেকেই কুরে কুরে খাচ্ছে ওকে। ব্যারনেস ম্যাগডাকে চোখে দেখার আগেই ওর মনে হয়েছিল, একটা মেয়ে ওর জীবনে আসছে, ওর নিঃসঙ্গতা দূর করে দেবে সে, অর্থবহ করে তুলবে জীবনটাকে। ম্যাগডাকে দেখার পর মনে হলো, এই তো সেই মেয়ে।
তারপর সব ওলটপালট হয়ে গেল। জানা গেল খলিফার আসল পরিচয়।
শ্বেতাঙ্গদের জন্যে পরিচ্ছন্ন, নিরাপদ একটা বিশ্ব গড়ে তুলতে চায় সে। শ্বেতাঙ্গরা ছাড়া বাকি সব নোংরা আবর্জনা, কাজেই তাদেরকে সমূলে ধ্বংস করতে হবে।
তাকে খুন না করে উপায় কি? এবং করলে তাড়াতাড়ি করতে হবে, তা না হলে উন্নত বিশ্ব বিশেষ করে পশ্চিম ইউরোপ, কানাডা, যুক্তরাষ্ট্র, অস্ট্রেলিয়া অর্থাৎ শ্বেতাঙ্গ-প্রধান দেশগুলোর কাছে থেকে উৎসাহ এবং সহযোগিতা পেতে শুরু করবে খলিফা, তখন তাকে ঠেকানোর সাধ্য কারো থাকবে না। খলিফার আদর্শ, স্বপ্ন, পরিকল্পনা সম্পর্কে এখনো ভালো ধারণা নেই কারো, সেটাই রক্ষা। জার্মানরা এত উন্নত জাত, অথচ তারাই হিটলারকে সমর্থন করেছিল। স্বজাতির একচেটিয়া প্রাধান্য বিস্তারের সুযোগ আছে দেখলে শ্বেতাঙ্গ কোনো সরকারই সেটা হাতছাড়া করতে চাইবে না।
