মানুষের স্বপ্ন এবং উচ্চাশা কখন আর কেন সীমা ছাড়ায় বোঝে পিটার, কিন্তু ক্ষমা করতে রাজি নয় ও। আর তার ব্রাসেলসে ফিরে আসার সাতদিন পর কর্তব্যের দিকে মুখ ফেরাতে নিজেকে বাধ্য করল।
ব্যারনেস ম্যাগডা অল্টম্যান নির্লিপ্ত আচরণ করছে। শেষবার ওরলি এয়ারপোর্টে অল্প সময় কথা হওয়ার পর পিটারের সাথে আর যোগাযোগ করেনি সে। পিটার বুঝতে পারল, ওকেই তার কাছে যেতে হবে।
খুন করার জন্যে যথেষ্ট কাছে পৌঁছুনো এখনো সম্ভব ওর পক্ষে, এ ব্যাপারে নিশ্চিত পিটার। ওরলিতে যে ধরনের সুযোগ পেয়েছিল, সে ধরনের সুযোগ আবার তৈরি করে নেয়া কঠিন হবে না। তবে ওখানে যদি কাজটা করত, আত্মহত্যা করারই নামান্তর হতো সেটা। দেহরক্ষীদের দ্রুত পাল্টা আঘাত থেকে নিজেকে বাঁচাতে পারলেও, আইনের যন্ত্রণাকর প্যাঁচ থেকে নিজেকে ছাড়ানো সম্ভব নাও হতে পারত। খুব গভীরভাবে চিন্তা না করেই ধরে নিল, খলিফার গল্পটাকে আত্মরক্ষার জন্যে ব্যবহার করতে পারবে না সে। দুনিয়ার কোনো কোর্ট ওর কথা বিশ্বাস করবে না। অ্যাটলাস বা ব্রিটিশ ও মাকিন ইন্টেলিজেন্সের সমর্থনহীন স্ট্রাইড পিটারকে ম্যানিয়াক বলে চিত্রায়িত করা হবে। ওরা যে সমর্থন করবে না, এ ব্যাপারেও পিটার নিশ্চিত। খলিফাকেও খুন করলে ওরা খুশি হবে, কিন্তু ওর সমর্থনে টু-শব্দটিও না করে ওর কল্লা নেবে।
তার মানে সম্পূর্ণ একা পিটার। অ্যাটলাস যে সাহায্য করবে না, ডক্টর পার্কার সেটা পরিষ্কার জানিয়ে দিয়েছেন। এবং অকালে প্রাণ হারানোর কোনো ইচ্ছে পিটারের নেই। খলিফাকে থামানোর জন্যে নিজেকে বলি দিতে প্রস্তুত নয় সে অন্তত অন্য কোনো উপায় থাকা পর্যন্ত। এক-আধটা উপায় নিশ্চয় আছে।
প্ল্যান করার সময় শিকারকে শুধু খলিফা হিসেবে কল্পনা করল পিটার, একবারও ম্যাগডা অল্টম্যান হিসেবে নয়। তাতে সমস্যাটা নিয়ে ঠাণ্ডা মাথায় চিন্তা করা সহজ হলো। ওর সামনে তিনটে প্রশ্ন–কোথায় খুন করা যায়, কখন, কিভাবে।
খলিফার ব্যক্তিগত নিরাপত্তার ব্যবস্থা নতুন করে সাজিয়ে ব্যাপারটাকে নিজেই জটিল করে তুলেছে ও। এমন একটা সিস্টেম করে দিয়েছে, খলিফা কোথায় কখন থাকবে বা যাবে আগে থেকে জানার কোনো উপায় নেই। রাষ্ট্রীয় গোপন দলিল যেভাবে পাহারা দেয়া হয়, খলিফার সফরসূচি লেখা খাতাটা তার চেয়েও নিখুঁতভাবে পাহারা দেয়া হয়। খলিফা কোথাও যাবার পর খবরটা প্রকাশ পায়, যাবার আগে কিছুই জানানো হয় না প্রেসকে।
তাকে যদি এলিসি প্রাসাদে ডিনার খাওয়ার আমন্ত্রণ জানানো হয়, খবরটা প্রেসে যায় পরদিন, আগের দিন নয়। তবে বাৎসরিক কিছু উপলক্ষ্য বা অনুষ্ঠান আছে বটে, ভুলেও অনুপস্থিত থাকে না খলিফা। তার ব্যক্তিগত নিরাপত্তা বিষয়ে আলাপ করার সময় এই দুর্বলতাগুলো সম্পর্কে জেনেছিল পিটার। তখন ম্যাগডার আসল পরিচয় জানত না ও, দুর্বলতাগুলো দূর করার জন্যে কিছু পরামর্শ দিয়েছিল। মনে আছে, হাসতে হাসতে প্রতিবাদ করেছিল ম্যাগডা।
তুমি চাওটা কি, শুনি—আমাকে কয়েদি বানাবে? এগুলো আমার জীবনের সত্যিকার আনন্দ, আমি বিশ্বাস করি না এ-সব তুমি কেড়ে দিতে পার!
বছরের প্রথমবার যখন উভস সেন্ট লরেতের কালেকশন দেখানো হয়, প্রথম দিনই সেখানে যাওয়া চাই খলিফার। লংচ্যাম্পে অনুষ্ঠিত হয় গ্র্যান্ড প্রি ডি প্যারিস, ওখানেও যাবে সে আইস লেপার্ড নামে তার একটা বিখ্যাত ঘোড়া আছে, বছরে মাত্র দুবার দৌড়ায়, প্রতিটি রেষে উপস্থিত থাকবে সে।
সম্ভাব্য বধ্যভূমির তালিকা তৈরি করল পিটার। তারপর এক এক করে বাতিল করে ছোট করল তালিকাটা। যেমন, লা পিয়েরে বেনিত। এর একটা সুবিধে হলো বাড়িসহ বিশাল এস্টেটটা পিটারের পরিচিত। সৈনিকের চোখ দিয়ে লক্ষ্য করেছে ও, টেরেসগুলোর সামনে লনগুলো লেকের দিকে নেমে যাওয়ায়, লেকের কিনারা থেকে জঙ্গলের ভেতর দাঁড়িয়ে গুলি করা সম্ভব। আর বাড়ির পিছনে রয়েছে মাটির ঢিবি, ঢিবির মাথা থেকে আস্তাবল আর প্রশস্ত উঠান পরিষ্কার দেখা যায়, দূরত্বও খুব বেশি নয়। কিন্তু গোটা এস্টেটে পাহারার ব্যবস্থা নিখুঁত। তাছাড়া শিকারের গতিবিধি সম্পর্কে আগাম কিছু জানা প্রায় অসম্ভব। সে যখন রোম বা নিউ ইয়র্কে থাকবে, সাতদিনের জন্যে বাড়ির কাছাকাছি কোনো জঙ্গলে অ্যামবুশ পেতে বসে থাকতে পারে পিটার। আরেকটা চিন্তার বিষয় হলো, পালানোর পথ ঝুঁকিবহুল। গোটা এস্টেটে লোকবসতি কম হলেও ছড়িয়ে ছিটিয়ে আছে, সবগুলোই পথের ধারেকাছে, আর পথও মাত্র দুটো। দ্রুত এবং সহজেই সেগুলো বন্ধ করে দিতে পারে পুলিশ। না, লা পিয়েরে বেনিত তালিকা থেকে বাদ দেয়াই ভালো।
শেষপর্যন্ত তালিকায় মাত্র দুটো জায়গার নাম থাকল। লংচ্যাম্প, আর ইভস সেন্ট লরেত মিউজিয়াম–ছেচল্লিশ নম্বর এভিনিউ ভিক্টর হুগো।
আশেপাশের কোনো বিল্ডিংয়ে অফিস ঘর ভাড়া করা যেতে পারে। ভুয়া পরিচয় দেবে পিটার। তবে দুটোর মধ্যে কোন জায়গাটা, পরে ঠিক করবে ও। তার আগে দেখে আসবে।
খলিফাকে এই দুজায়গায় মারতে চাইলে একটা বিশেষ সুবিধে পাবে পিটার। দূর থেকে গুলি করতে হবে ওকে। কাছ থেকে হলে ছুরি, পিস্তল বা হাত ব্যবহার করতে হত। না, কাছ থেকে তাকে মারতে চায় না পিটার।
