হঠাৎ আবিষ্কার করল পিটার, খালি গ্লাস নিয়ে হাঁটাহাঁটি করছে সে। দাঁড়িয়ে পড়ল খোলা জানালার সামনে, নিঃসঙ্গতা আবার ওকে পেয়ে বসল। অকস্মাৎ সুরেলা প্রলম্বিত কণ্ঠস্বর বাজল কানে, মনে পড়ে গেছে কথাগুলো।
আমি একা। কতদিন ধরে। নিঃসঙ্গতা আমাকে মেরে ফেলছে, পিটার। এই অভিশাপ থেকে আমি মুক্তি চাই। তুমি আমাকে উদ্ধার করতে পার না?
স্মৃতি বড় বেদনাদায়ক। খলিফার কথা আলাদা, কিন্তু ম্যাগডার কথা মুছে ফেলতে হবে মন থেকে। প্রায় ছিটকে জানালার সামনে থেকে সরে এল পিটার, বেরিয়ে এল কামরা থেকে। নিচের লবিতে এক মিনিট দাঁড়াল, প্রায় অন্ধকার রাস্তায় হাঁটতে হাঁটতে ব্যস্ত হাতে সিগারেট ধরাল একটা। মাথা ধরেছে, কিছুক্ষণ ঠাণ্ডা বাতাস পাওয়া দরকার।
লম্বা-চওড়া এক মেয়ে রাস্তা পেরিয়ে ফুটপাথে উঠে এল। ঠোঁটে লাল টকটকে লিপস্টিক মেখেছে। পিটারের পথ আগলে দাঁড়াল সে, ফিসফিস করে প্রস্তাব দিয়ে রূঢ় বাস্তবে ফিরিয়ে আনল পিটারকে।
মার্সি। দ্রুত মাথা নেড়ে তাকে পাশ কাটাল পিটার, হাঁটার গতি বাড়িয়ে দিল। দুমাইল হেঁটে আবার হিলটন হোটেলে সামনে চলে এল ও, নেড়েচেড়ে দেখল কয়েকটা। একটা ভোগ-এর পাতা ওল্টাচ্ছে, ইভস সেন্ট লরেত প্রদর্শনী সম্পর্কে কোনো তথ্য পাওয়া যায় কিনা খুঁজছে। তার বদলে একটা মেয়ের ছবি লাফ দিয়ে উঠে এল চোখে।
চকচকে গাঢ় চুল এমনভাবে ব্যাকব্রাশ করা, টান টান হয়ে আছে কপালের চামড়া। পিছন দিকে নিয়ে গিয়ে লম্বা চুলগুলো বিনুনি করা হয়েছে, তারপর কান জোড়ার ওপর মাথার দুপাশ উঁচু করে বাঁধা হয়েছে দুটো খোঁপা। উঁচু চোয়ালের স্লাভিক গড়ন সহজেই টের পাওয়া যায়, চেহারায় দৃঢ় মানসিকতার একটা ভাব এনে দিয়েছে। চোখ জুড়ানো রঙ গায়ের, হালকা গোলাপি। থুতনি সামান্য চৌকো, একটু যেন শক্ত, সৌন্দর্য নিখুঁত হবার পথে ছোটখাটো হলেও একটা বাধা। রমণীয় চেহারা, কিন্তু কোমলতার চেয়ে কাঠিন্যই যেন বেশি। মেয়েটা হয়তো বিশ্ব সুন্দরী হতে পারবে না, কিন্তু একবার তাকালে চোখ ফেরানোও সম্ভব নয়।
চারজনের একটা গ্রুপ ফটোর মধ্যে সেও একজন। দ্বিতীয় মহিলাটি বিখ্যাত এক পপ গায়কের স্ত্রী, তীক্ষ্ণ চেহারা, ঠিক মেয়েলি নয়। তার পাশে কিশোর-সুলভ চেহারা নিয়ে দাঁড়িয়ে রয়েছে আমেরিকান এক অভিনেতা, লোকটা অভিনয়ের জন্যে যতটা না তার চেয়ে মেয়ে-পটানোর জন্যে বেশি নাম কিনেছে। সাধারণত এ ধরনের লোকদের সাথে চলাফেরা বা ওঠাবসা করে না ব্যারনেস ম্যাগডা। তবে তার পাশে দাঁড়ানো লোকটা অভিজাত এবং সুপুরুষ, ব্যারনেস ম্যাগডার কাঁধে হাত দিয়ে আছে। ক্ষমতা আর কর্তৃত্ব ফুটে আছে লোকটার চেহারায়। ক্যাপশন না দেখেই তাকে চিনতে পারল পিটার-বৃহত্তম জার্মান অটোমোবাইল ম্যানুফ্যাকচারিং কমপ্লেক্সের চেয়ারম্যান। ক্যাপশনে লেখা রয়েছে, একটা ফ্যাশন-শো উদ্বোধন হতে যাচ্ছে, প্রধান অতিথি ব্যারনেস ম্যাগডা।
চেয়ারম্যানের দিকে তাকিয়ে থাকতে থাকতে পাঁজরের ভেতর চিনচিনে একটা অনুভূতি হলো পিটারের। ঘৃণা নাকি ঈর্ষা, ঠিক জানে না। ম্যাগাজিনটা র্যাকে রেখে দিয়ে হনহন করে হোটেলে ফিরে এল ও।
স্যুইটে ফিরে শাওয়ার সারল পিটার, আবার হুইস্কি নিয়ে খোলা জানালার সামনে একটা চেয়ার টেনে বসল। মেলিসা কিডন্যাপ হবার পর থেকে মদ খাবার পরিমাণ বেড়ে গেছে ওর। গুরুতর সন্দেহে ভুগতে থাকলে বা নিঃসঙ্গতা দূর করা না গেলে এর মাত্রা দিনে দিনে বাড়তেই থাকবে। এখন থেকেই ওর সাবধান হওয়া উচিত। গ্লাসটা হাতে নিয়ে চেয়ার ছাড়ল পিটার, আয়নার সামনে গিয়ে দাঁড়াল।
ব্রাসেলসে ফেরার পর থেকে ন্যাটোর অফিসার্স ক্লাবের জিমনেশিয়ামে রোজই যাচ্ছে পিটার। শরীরটাকে আগের মতোই একহারা আর শক্ত রাখতে পারছে সে, তলপেট হয়ে উঠছে গ্ৰেহাউন্ডের মতো। শুধু শ্ৰী হারিয়েছে মুখটা। ঘৃণাও মানুষের চেহারা বদলে দিতে পারে।
আয়নার দিকে পেছন ফিরতেই ফোন বেজে উঠল।
স্ট্রাইড, রিসিভারে বলল ও, বাথরুম থেকে বেরিয়ে এখন কাপড় পরেনি, ডান হাতে হুইস্কির গ্লাস।
প্লিজ হোল্ড অন, জেনারেল স্ট্রাইড। ইন্টারন্যাশনাল কল।
যান্ত্রিক শব্দজট ভেসে এল কানে। অনবরত ক্লিক ক্লিকের সাথে অন্যান্য অপারেটরদের আধা ইংরেজি আধা ফরাসি কথা অস্পষ্টভাবে শোনা গেল।
তারপর হঠাৎ করে কণ্ঠস্বর। সেই প্রলম্বিত সুর। এতই অস্পষ্ট, যেন বিশাল হলঘরে ফিসফিস করছে কেউ।
পিটার, তুমি?
ম্যাগডা? বিস্ময়ের ধাক্কা কাটিয়ে উঠতে সময় নিচ্ছে পিটার, রিসিভার থেকে প্রতিধ্বনিত হয়ে কানে ফিরে এল নিজের কণ্ঠস্বর। ম্যাগডা আবার কথা বলার আগে ক্লিক করে আওয়াজ হলো একটা, তার মানে যোগাযোগটা এখন রেডিও টেলিফোন লিঙ্কের মাধ্যমে চালু হলো।
তোমার সাথে আমার দেখা করতে হবে, পিটার। এভাবে দিন কাটানো আমার পক্ষে সম্ভব নয়। তুমি আমার কাছে আসবে, পিটার, প্লিজ?
কোথায় তুমি?
লে নিউফ পোইজোঁ। শব্দগুলো একেবারেই অস্পষ্ট আর ভাঙাচোরা, এবার
শুনতে চাইল পিটার।
লে নিউফ পোইজোঁ-দি নাইন ফিশ, পুনরাবৃত্তি করল ম্যাগডা। আসবে, পিটার, আসবে আমার কাছে?
তুমি কাঁদছ? জিজ্ঞেস করল পিটার। শব্দজট তুঙ্গে উঠল, হাজার হাজার যান্ত্রিক আওয়াজ ধ্বনি প্রতিধ্বনিত হচ্ছে। পিটারের মনে হলো, যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন হয়ে গেছে। হতাশায় চিৎকার করে উঠল সে, কাঁদছ নাকি?
