ক্ষমা, ম্যাগডা? ভয়ঙ্কর এমন কিছু কি আমাদের জীবনে ঘটবে যা ক্ষমা করার যোগ্য নয়?
ঘটবে না, পিটার, আমি ঘটতে দেব না!
ঘটতে দেবে না? তার মানে কি ওকে ঠেকাবে ম্যাগডা? হুমকি দিচ্ছে?
চোখ তুলে মুহূর্তের জন্যে তাকাল ম্যাগডা, তার চোখে চোখ রেখে মনে মনে নিজেকে শোনাল পিটার, পারি-এ খুনি এই অপরূপ সৌন্দর্য আমি ধ্বংস করে দিতে পারি। কিন্তু ম্যাগডার চোখে নতুন একটা ভাষা, চিন্তায় বাধা পেল পিটার। ম্যাগডার দৃষ্টিতে কিসের যেন আবেদন-সম্ভবত করুণা প্রার্থনা করছে। পিস্তল, নাকি খালি হাত? দুহাত দিয়ে গলা টিপে ধরতে পারলে ভালো হয়, ব্যক্তিগত আক্রোশ চরিতার্থ হয়! ওর বুক আর উরুর নিচে মোচড় খাবে থরথর যৌবন, কয়েক ইঞ্চি দূর থেকে দেখতে পাবে পিটার, প্রাণবায়ু বেরিয়ে যাচ্ছে।
কোণের একটা ডেস্কে ঝনঝন করে উঠল টেলিফোন। দ্বিতীয়বার বেল বাজতে সহকারী ম্যানেজার রিসিভার তুলল, তারপর ধরিয়ে দিল সেক্রেটারির হাতে। দুএকটা কথা বলে রিসিভার নামিয়ে রাখল সে, ওদের দিকে কয়েক পা এগিয়ে এসে দাঁড়াল।
মাই ব্যারনেস, প্লেন রেডি।
এখুনি রওনা হব, সেক্রেটারিকে বলল ম্যাগডা, তারপর পিটারের দিকে ফিরল আমি দুঃখিত, পিটার।
আবার কখন দেখা হবে আমাদের?
কাঁধ ঝাঁকাল ম্যাগডা, সামান্য ছায়ায় ঢাকা পড়ল চোখ জোড়া। বলা কঠিন ঠিক জানি না… তোমাকে আমি টেলিফোন করব। কিন্তু এখন আমাকে যেতে হয় পিটার। গেলাম প্রিয়তম।
ম্যাগডা চলে যাবার পর জানালার সামনে দাঁড়িয়ে এয়ারফিল্ডের দিকে তাকাল পিটার। বাইরে সোনালি আলো ঝরা বসন্তের বিকেল। টারমাকের কিনারায় ছোট ছোট বাগানে রঙচঙে ফুল ফুটেছে। ফুলগুলোকে ঘিরে উড়ে বেড়াচ্ছে ফড়িং আর মৌমাছি। রঙিন ডানা ঝাঁপটে একঝাক পাখি উড়ে গেল। লিয়ার জেটের বিকট আওয়াজ ওগুলোকে যেন স্পর্শই করছে না।
সাক্ষাৎকারের প্রতিটি মুহূর্ত স্মরণ করল পিটার। ম্যাগডার চেহারা কতবার কখন কখন বদলেছে, সব মনে আছে ওর। ঠিক কোনো সময়টা খোলস ঝেড়ে ফেলে বেরিয়ে এসেছিল খলিফা।
সন্দেহের আর কোনো অবকাশ নেই। আগেও ছিল কি? ও আসলে মনে মনে, হয়তো অবচেতনভাবে চাইছিল এমন কিছু ঘটুক যাতে প্রমাণিত হয় ম্যাগডা খলিফা নয়। কিন্তু না, তেমন কিছু ঘটেনি, ঘটার নয়।
এখন কাজটা করার জন্যে নিজেকে প্রস্তুত করা দরকার ওর। তোমাকে আরো কঠিন হতে হবে, পিটার। আগে যেমন সহজ ভেবেছিলে, কাজটা তারচেয়ে অনেক শক্ত। মুহূর্তের জন্যেও একা ছিল না ওরা, সারাক্ষণ দেহরক্ষীরা নজর রাখছিল ওদের ওপর। এও আরেকটা লক্ষণ, ম্যাগডা সতর্ক হয়ে আছে। নিরিবিলিতে কোথাও দুজন একা হবে, সে সুযোগ আর আসবে বলে মনে হয় না। তারপর পিটারের মনে পড়ল, যাবার সময় গেলাম, প্রিয়তম বলে গেল ম্যাগডা।
গেলাম মানে কি? আর কখনো দেখা হবে না চলে গেল চিরতরে? ডক্টর পার্কার পিটারকে বলেছিলেন, প্রয়োজন ফুরালে আর সব পুরুষ প্রেমিকের মতো পিটারকেও বাতিল কাগজের মতো ফেলে দেবে ব্যারনেস। নাকি কথাটার মধ্যে প্রচ্ছন্ন হুমকি লুকিয়ে আছে?
আশ্চর্য, মন এত খারাপ কেন? এরপর শুধু গানসাইটে চোখ রেখে ম্যাগডাকে দেখতে হবে, তাই?
এয়ারফিল্ডে তাকিয়ে আছে পিটার, কিন্তু কিছুই দেখছে না। মনে পড়ল প্রথমবার খলিফা নামটা শোনার পর কিভাবে ওর ক্যারিয়ার আর জীবন ভেঙে পড়তে শুরু করে।
কাঁধের পিছন থেকে নরম একটা কণ্ঠস্বর ওর সংবিৎ ফিরিয়ে আনল। সহকারী ম্যানেজার জানল, কে এলএম-এর ব্রাসেলস ফ্লাইট রেডি, জেনারেল।
ওভারকোট আর ব্রিফকেসটা তুলে নিয়ে এগোল পিটার। ব্রিফকেসটা উপহার পেয়েছে ও। মেয়েটা বলতে চায়, সে নাকি ওকে প্রাণ মন দিয়ে ভালোবাসে। তাকেই খুন করতে হবে পিটারের।
.
পিটারের নতুন অফিসের ডেস্কে গাদা গাদা চিঠি আর ফাইল জমা হয়ে আছে, কাজে ডুবে যেতে হলো ওকে। নিজের অজান্তেই স্বস্তি বোধ করল ও। খলিফার বিরুদ্ধে প্ল্যানটা আপাতত স্থগিত রাখার একটা অজুহাত পাওয়া গেছে।
একটু অবাক হয়ে উপলব্ধি করল পিটার, অস্ত্র বিক্রি করার নতুন এই দায়িত্ব উপভোগ করছে সে। ক্রেতা দেশের প্রতিনিধিরা সবাই প্রথম শ্রেণির ব্রেন, শাণিত বুদ্ধির অধিকারী, যে-কোনো পণ্ডিত অধ্যাপককেও বুদ্ধির প্রতিযোগিতায় হারিয়ে দিতে পারে। ভবিষ্যৎ যারা নিয়ন্ত্রণ করেন তাদের মন-মানসিকতা বোঝার একটা সুযোগও পেয়ে গেল পিটার। কিভাবে সময় কাটতে লাগল নিজেও টের পেল না।
ডেস্কে ফিরে আসার তিনদিন পর ইরানি এয়ারফোর্সের সাথে একটা চুক্তিতে পৌঁছল পিটার। এই প্রথম কেসট্রেল মিসাইলের অর্ডার দিল ওরা। একশ বিশ ইউনিট, দাম পড়ল দেড়শ মিলিয়ন ডলারের কিছু বেশি। চুক্তিপত্র সই করার পর অদ্ভুত একটা আনন্দঘন অনুভূতি হলো পিটারের, সেই সাথে একটা মোহ স্পর্শ করল ওকে। এই মোহ আরো শক্তিশালী হয়ে উঠতে পারে, এক সময় অ্যাডিক্টেড হয়ে ওঠাও বিচিত্র নয়।
এর আগে পর্যন্ত টাকাকে একটা ঝামেলা বা বিড়ম্বনা বলে মনে করে এসেছে পিটার, কিন্তু এখন উপলব্ধি করতে পারল এ আরেক ধরনের টাকা। খলিফা যে জগতে বাস করে তার ছবি একপলক দেখার সুযোগ ঘটেছে ওর, জেনে ফেলেছে এ ধরনের টাকা কোনো মানুষ যখন একবার নাড়াচাড়া করতে অভ্যস্ত হয়ে পড়ে তখন ঈশ্বরতুল্য ক্ষমতার স্বপ্ন দেখে তার জন্যে অবাস্তব বলে মনে হয় না।
