ঠোঁট দুটো ম্যাগডার মতো করতে চাইল পিটার-কোমল, উষ্ণ, ভেজা। যে নারীদেহ পাকা টসটসে ফলের মতে, এ ঠোঁট তার; যেন থেঁতলানো পাপড়ি। শরীরটাকে আদরের কাঙাল, ভালোবাসায় থরথর করে তুলতে চেষ্টা করল পিটার, ঠিক ম্যাগডা যেমন ওর আলিঙ্গনের ভেতর তাপ দগ্ধ মোমের মতো গলে যাচ্ছে, চাপ দিয়ে সেঁধিয়ে যেতে চাইছে শরীরের ভেতর। মনে হলো পাকা অভিনেতার মতো উৎরে গেছে ও, আর ঠিক তখুনি মৃদু ধাক্কা দিয়ে ওকে সরিয়ে দিল ম্যাগডা, আলিঙ্গনমুক্ত করল নিজেকে। দ্রুত, অনুসন্ধানী দৃষ্টি বুলিয়ে পিটারের মুখে কি যেন খুঁজল ম্যাগডা। গাঢ় সবুজ চোখে আলো ছিল, ধীরে ধীরে নিভে গেল সেটা।
কিছু একটা দেখে ফেলেছে ম্যাগডা। কিন্তু দেখার তো কিছুই ছিল না। দেখেনি, অনুভব করেছে। পিটারের সতর্কতা তার মনের চোখকে ফাঁকি দিতে পারেনি। কোনো সন্দেহ নেই এ ধরনের একটা প্রতিক্রিয়া পিটারের মধ্যে খুঁজছিল সে। শুধু একটা আভাস পাওয়ার দরকার ছিল–প্রয়োজনের চেয়ে জোরে চুমো। খাওয়া, স্থির অপলক দৃষ্টি, ক্ষীণ একটু আড়ষ্ট ভাব।
বুকটা দুরুদুরু করে উঠল পিটারের। তবে কি ধরা পড়ে গেলাম।
পিটারের নীল কাশ্মীরী জ্যাকেটের কিনারা চুল ম্যাগডা। বলেছিলাম, একটাই তোমার রঙ। আমার কথা মনে করে কিনেছ?
কেনার সময় খলিফার পরিচয় জানত না পিটার, ম্যাগডার কথা ভেবেই কিনেছিল। কিন্তু এই মুহূর্তে ম্যাগডার আচরণ কেমন যেন ভঙ্গুর মনে হলো। দুজনের মাঝখানে অদৃশ্য একটা পাঁচিল তৈরি হচ্ছে।
এসো, বলেই পিটারের দিকে পিছন ফিরল ম্যাগডা, যেন মুখ লুকাল। পথ। দেখিয়ে পিটারকে পিকচার উইন্ডোর নিচে নরম সোফার কাছে নিয়ে এল। এয়ারপোর্ট অফিসারদের কেউ একজন কিছু তাজা ফুলের ব্যবস্থা করতে পেরেছে-হলুদ টিউলিপ, বসন্তের প্রথম উপহার। এক পাশে বার এবং কফি মেশিন।
সোফায় পিটারের পাশেই বসল ম্যাগডা, কিন্তু গা ছুঁয়ে নয়। মাথা ঝাঁকিয়ে সেক্রেটারিকে বিদায় করে দিল সে। লোকটা দূরে সরে গিয়ে দেহরক্ষীদের সাথে দাঁড়াল ওদের কথা শুনতে পাবে না।
কি হয়েছে আমাকে সব বল, পিটার, প্লিজ। আবার পিটারের দিকে অনুসন্ধানী চোখ মেলে তাকাল ম্যাগডা, কিন্তু চোখের সেই কোমল আলো আর জ্বলল না। প্রথম থেকে শুরু করল পিটার, কিভাবে কিডন্যাপ করা হয় মেলিসাকে। মনোযোগ আর আন্তরিকতার সাথে শুনছে ম্যাগডা, চেহারায় সহানুভূতি আর উদ্বেগ। তবে দৃষ্টিতে আগের সেই প্রেমের ঘোর একেবারেই অনুপস্থিত।
ম্যাগডা সম্ভবত বিশদ বিবরণ পেয়ে গেছে বা পেয়ে যাবে, কাজেই রাখ-ঢাক না করে পিটার জানাল, খলিফা পার্কারের জীবন চেয়েছিল। সেই সাথে ওর প্রতিক্রিয়াটাও ব্যাখ্যা করল। কাজটা আমি করতাম, ম্যাগডা।
শিউরে উঠে দুহাত দিয়ে নিজেকে আলিঙ্গন করল ম্যাগডা। গড নো!
অজ্ঞাতনামার ফোন কল সম্পর্কে বলল পিটার, তার দয়াতেই উদ্ধার করা সম্ভব হয়েছে মেলিসাকে। কিভাবে আঙুলটা কাটা হয়, সংক্রমণের ফলে হাতটার কি অবস্থা হয়েছিল, বিস্তারিত বর্ণনা দিল ও। সারাক্ষণ সতর্কতার সাথে ম্যাগডার মুখের দিকে তাকিয়ে থাকল। কোনো অপরাধবোধ দেখতে না পেয়ে নিজেকে বোকা বলে তিরস্কার করল মনে মনে-পাকা অভিনেত্রী ম্যাগডা, মনের ভাব চেহারায় ফুটতে দেবে কেন! ম্যাগডাকে ম্যাগডা হিসেবে নয়, এখন থেকে খলিফা হিসেবে দেখতে হবে।
কয়েকটা দিন ওর সাথে থাকতে হয়েছে আমাকে, বলল পিটার। ওকে নিরাপদ জায়গায় পাঠিয়ে দিয়ে স্বস্তি বোধ করছি।
কব্জি তুলে হাতঘড়ি দেখল ম্যাগডা। সেরেছে, আর বেশি সময় নেই! মুখ তুলল সে। এসো, এক ঢোক শ্যাম্পেন খাই। ধরো আমরা উৎসব পালন করছি। মেলিসা জেইন বেঁচে আছেন।
বোতল খুলে প্লসে শ্যাম্পেন চালল পিটার। দুজনের হাতে দুটো গ্লাস, পরস্পরকে স্যালুট করল ওরা।
তুমি কাছে থাকলে আনন্দে হাবুডুবু খাই, গ্লাসের কিনারার একটু ওপরে ম্যাগডার চোখ, চোখে সেই অনুসন্ধানী দৃষ্টি। কি যে এর পরিণতি জানি না। তুমি না শেষপর্যন্ত আমাকে মেরেই ফেল!
কি দারুণ অভিনয়, প্রশংসা না করে পারল না পিটার। তোমার প্রেমে উন্মাদিনী হয়ে গেছি, এই ভাবটা এমন নিখুঁতভাবে ফুটল ম্যাগডার চেহারায়, মুহূর্তের জন্যে হতভম্ব হয়ে গেল পিটার। কেন, এ কথা বলছ কেন?
হঠাৎ পিটার উপলব্ধি করল, এখানে এবং এখনই ম্যাগডাকে খুন করতে পারে ও। কোনো অস্ত্রের দরকার নেই। খালি হাতেই কাজটা করতে পারবে, যদিও লেদার জ্যাকেটের ভেতর কোবরা পিস্তলটা রাখা আছে। ম্যাগডাকে খুন করা সম্ভব, কিন্তু পর মুহূর্তে দেহরক্ষীরা ওকে ঝাঁঝরা করে ফেলবে। ম্যাগডার সাথে ওদের একজনকে হয়তো মারা যাবে, কিন্তু দ্বিতীয় লোকটা খুন করবে ওকে। সেরা প্রফেশনাল ওরা, ওর নিজের বাছাই করা লোক।
সময়ের এত অভাব আমাদের, খেদ প্রকাশ করল পিটার। মিটিমিটি হাসি ধরে রেখেছে মুখে। ভালো লাগে না।
ভালো কি আমারও লাগে, ডার্লিং? পিটারের কনুই ধরল ম্যাগডা। কিন্তু ভুললে চলবে না সামনে আমাদের অনেক কাজ। তুমিও ব্যস্ত থাকবে, আমিও–পরস্পরকে আমরা ক্ষমা করতে পারি।
কথাগুলোর হয়তো বিশেষ কোনো অর্থ আছে। ম্যাগডার চোখে মুহূর্তের জন্যে আবার সেই কোমল সবুজ আলো জ্বলে উঠতে দেখল পিটার। ঘৃণার বহিঃপ্রকাশ, নিশ্চয়ই প্রেমের নয়। ধীরে ধীরে প্রথমবার শ্যাম্পেনের গ্লাসে চুমুক দিল ম্যাগডা, চোখের পাতা নামল, যেন পিটারের তীক্ষ্ণ দৃষ্টি থেকে চোখ দুটোকে বাঁচাল।
