আমি শুধু চাই, খলিফার কাছাকাছি থাকো তুমি, বুদ্ধি দিয়ে তাকে হারাও। তার কুকীর্তি সম্পর্কে তথ্য সংগ্রহ কর, সাক্ষি হও আর প্রমাণ জোগাড় কর, আমরা তাকে আইনের সাহায্যে কাবু করব। আমি চাই ইমোশন্যাল ইস্যুগুলো ভুলে থাকো তুমি জিরো-সেভেন-জিরোর জিম্মিদের কথা মুছে ফেল মন থেকে, ভুলে যাও মেলিসার কথা। আমরা বিচারক নই, পিটার। আমরা জল্লাদও নই।
পিটার ভাবছে, খলিফাকে ঠেকাবার একটাই রাস্তা আছে। ব্যারসেন ম্যাগডা অল্টম্যানের মতো ব্যক্তিত্বকে ফরাসি কোর্টে দাঁড় করানোর আশা হাস্যকর। ডক্টর পার্কার যাই বলুন, ওর সিদ্ধান্ত তাতে বদলাবে না।
পিটার ভাবতে চেষ্টা করল, ওর সিদ্ধান্তে প্রতিশোধের কোনো ভূমিকা নেই। কিন্তু উপলব্ধি করল, নিজেকে বোকা বানাতে চেষ্টা করছে সে। হ্যাঁ, প্রতিশোধ নিতে চায় বলেই এই সিদ্ধান্তে আসতে হয়েছে ওকে। ব্যক্তিগতভাবে অপমান করা হয়েছে ওকে।
জার্মান মেয়ে ইনগ্রিডকে খুন করেছে পিটার। খুন করেছে জিলি ও। শওনেসিকে। ওদের খুন করার সময় অপরাধবোধে ভোগেনি বা সিদ্ধান্তগুলোর জন্যে নিজেকে ঘৃণা করেনি। ওদের খুন করা যদি উচিত কাজ হয়ে থাকে, তাহলে খলিফাকে খুন করা আরো কয়েক হাজার গুণ বেশি উচিত কাজ হবে।
সেই উচিত কাজটা করার মতো লোক একজনই মাত্র আছে।
.
পরিচিত সুর-মাধুর্য সারা শরীরে শিরশিরে একটা শীতল ভাব এনে দিল। হালকা, প্রলম্বিত কণ্ঠস্বর, আন্তরিক এবং উদ্বিগ্ন। শুনে হাঁপ করে গেল পিটারের, যেন অনেকটা পথ দৌড়ে এসেছে।
ওহ পিটার! শুধু তোমার এই গলা পেয়েই আমি পাগল হয়ে যাচ্ছি! কি রকম উদ্বেগে ছিলাম জানো না! আমার টেলিগ্রাম পেয়েছ?
না, কিসের টেলিগ্রাম?
মেলিসাকে মুক্ত শোনার পর রোম থেকে তোমাকে একটা টেলিগ্রাম পাঠাই..
পাইনি, কিন্তু তাতে কিছু আসে যায় না…
ভায়া নার্মকো, ব্রাসেলসে পাঠিয়েছিলাম ওটা…
হয়তো ওখানে আমার টেবিলে পড়ে আছে। সময়ের অভাবে খবর নেয়া হয়নি।
কেমন আছে ও, পিটার?
ভালো। ম্যাগডার নাম উচ্চারণ বা অন্য কোনোভাবে সম্বোধন করছে না পিটার, ভয় হতে লাগল গলার আওয়াজ থেকেই না টের পেয়ে যায় মনের ভাবটুকু।
নতুন করে কেউ ওকে স্পর্শ করতে পারবে না, নিরাপদ জায়গায় পজিশন নিয়ে আছে, সম্পূর্ণ তৈরি। ওর ধারণা হলো, ম্যাগডা হয়তো জানতে চাইবে কোথায় আছে মেলিসা।
তুমি কেমন আছ, শেরি, মাই লাভ?
আছি একরকম। খুব ধকল গেছে, বুঝতেই পার।
জানি, পিটার, জানি। কি রকম অসহায় বোধ করছিলাম সে তোমাকে বোঝাতে পারব না। খবর সংগ্রহের জন্য কি না করেছি, কোথায় না গেছি–সেজন্যেই তোমার সাথে যোগাযোগ ছিল না। কিন্তু দিনের পর দিন কোনো খবরই আসেনি…
এখন সব মিটে গেছে, শুকনো গলায় বলল পিটার।
আমার তা মনে হয় না, দ্রুত বলল ব্যারনেস ম্যাগডা। কোত্থেকে বলছ তুমি?
লন্ডন।
তুমি ফিরবে কখন?
এক ঘণ্টা আগে ব্রাসেলসে ফোন করেছিলাম। জরুরি ব্যাপার, নার্সকোতে আমাকে দরকার। আজ বিকেলে ফ্লাইট ধরব।
অপরপ্রান্ত থেকে কয়েক সেকেন্ড শুধু ঘন ঘন নিঃশ্বাস পতনের আওয়াজ শুনল পিটার। তারপর ম্যাগডা বলল, পিটার, তোমার সাথে আমার দেখা হওয়া দরকার। অনেক দিন তোমাকে কাছে পাই না। কিন্তু, হায় ঈশ্বর, আজ রাতে আমাকে ভিয়েনায় থাকতে হবে। দাঁড়াও, একটু ভাবতে দাও–এই, শোনো, পেয়েছি! এখুনি যদি তোমাকে আনার জন্যে লিয়ারটা পাঠিয়ে দেই আমাদের দেখা হতে পারে, অন্তত এক ঘণ্টার জন্যে হলেও তুমি রাত করে ওরলি থেকে ব্রাসেলসের ফ্লাইট ধরতে পারো আর আমি লিয়ার নিয়ে ভিয়েনায় চলে যেতে পারি। প্লিজ, পিটার। তোমার অভাব আমাকে…প্লিজ, চলে এসো, একটা ঘণ্টা একসাথে কাটাই আমরা!
.
লিয়ার থেকে পিটার নামতেই এয়ারপোর্টের একজন সহকারী ম্যানেজার অভ্যর্থনা জানাল, পথ দেখিয়ে নিয়ে এল ভি.আই.পি, লাউঞ্জে।
লাউঞ্জে ঢুকেই পিটার দেখল লম্বা পা ফেলে ওর দিকে দ্রুত হেঁটে আসছে ব্যারনেস ম্যাগডা। ও ভুলে গিয়েছিল ব্যারনেসের উপস্থিতি কিভাবে একটা কামরাকে সৌন্দর্য মণ্ডিত করে তোলে।
হাতে সেলাই করা জ্যাকেটের সাথে ম্যাচ করা স্কার্ট পরেছে সে, গান মেটাল গ্রে তার রঙ। হাঁটা নয় যেন নাচ, লম্বা পায়ে মন কাঁপানো ছন্দ যেন সরু কোমর থেকে উৎসারিত হচ্ছে। আড়ষ্ট হয়ে গেল পিটার, পা দুটো বিষম ভারী, কারণ শত্রু আর অমঙ্গলের উপস্থিতি সম্পর্কে ওর গোটা অস্তিত্ব সচেতন।
পিটার, মাই লাভ! ওরা তোমার একি অবস্থা করেছে! মায়াভরা কোমল চোখ উদ্বেগে ভরাট হয়ে উঠল ম্যাগডার, হাত তুলে পিটারের মুখ স্পর্শ করল সে।
গত কয়েক দিন তীব্র মানসিক যন্ত্রণায় দগ্ধ হয়েছে পিটার, লাবণ্য হারিয়েছে চেহারা। দাড়ি-গোঁফ কামায়নি, মাথায় এলোমেলো হয়ে আছে লম্বা চুল। চোখ দুটো প্রায় লাল।
আগেই ভেবে রেখেছে পিটার, ওকে সাবধান থাকতে হবে। ও যা জানে সেটা গোপন করে রাখাটা কতটুকু গুরুত্বপূর্ণ বোঝে। ম্যাগডাকে কোনোভাবেই জানতে দেয়া চলবে না যে তার পরিচয় ফাঁস হয়ে গেছে। ভয়ঙ্কর বিপজ্জনক হবে সেটা। সম্পূর্ণ স্বাভাবিক আচরণ করতে হবে ওকে। সতর্কই ছিল, তবু মুহূর্তের জন্যে চোখের সামনে ভেসে উঠল মেলিসার ব্যান্ডেজ বাধা হাতটা। টান পড়ল পেশিতে, সেটা গোপন করার জন্যে তাড়াতাড়ি একটু ঝুঁকে এগিয়ে দিল মুখটা। দুজোড়া ঠোঁট এক হলো।
