বাবার মৃত্যু বেশ একটু রহস্যময়। কিন্তু ফ্রেঞ্চ বা রাশানরা এ ব্যাপারে মুখ খুলতে রাজি নয়। বাবার বন্ধুরা প্রায় সবাই পার্টি মেম্বার ছিল, তারাই এতিম ম্যাগডার দায়িত্ব নিল। এক পরিবার থেকে আরেক পরিবারের ঘুরে বেড়াতে লাগল ম্যাগডা। ডক্টর পার্কার পোস্টকার্ড সাইজের একটা ফটোগ্রাফ রাখলেন পিটারের সামনে নিচু টেবিলে। তার তখনকার ছবি।
বুকের দুপাশে বেণী করা চুল, ছোট স্কার্ট পরা একজন স্কুলছাত্রী, দুহাতে বুকের সাথে একটা কালো বিড়ালকে ধরে আছে। বিকেলবেলা ফরাসি কোনো পার্কে দাঁড়িয়ে তোলা হয়েছে ছবিটা।
এরপর তার কাকা তাকে চিঠি লেখে দেশ থেকে। চিঠির সাথে তার মা-বাবার কম বয়েসের ফটো ছিল। কিশোরী মেয়েটা মুগ্ধ হয়ে যায়। বাবা-মা যেখানে শৈশব কাটিয়েছে সে জায়গাটা না জানি কেমন! সে জানত না তার একজন কাকা আছে। বাবা কখনো আত্মীয়স্বজনদের প্রসঙ্গে কথা বলেননি। বেচারি এতিম মেয়েটা এই প্রথম জানল, তার একটা পরিবার আছে। আরো কয়েকটা চিঠি আদান-প্রদান হলো, বিনিময় হলো আনন্দ আর স্নেহ, তারপরই সমস্ত আয়োজন সম্পন্ন হয়ে গেল। কাকা নিজে এল ভাইঝিকে নিয়ে যেতে, তার সাথে জন্মস্থান পোল্যান্ডে ফিরে গেল ম্যাগডা কুটচিনস্কি। পার্কার তার হাত দুটো মেলে দিলেন। গোটা ব্যাপারটা এই, পানির মতো সোজা।
হারানো বছরগুলো, বলল পিটার, নিজের কানেই অদ্ভুত শোনাল কণ্ঠস্বর। একটু কেশে গলা পরিষ্কার করল ও, ডক্টর পার্কারের তীক্ষ্ণ দৃষ্টির সামনে অস্বস্তি নিয়ে নড়েচড়ে বসল।
এখন আর বছরগুলোকে হারানো বলা যাবে না, পিটার। তেরো থেকে উনিশ, এই ছয়টা বছর নিরুদ্দেশ ছিল ম্যাগডা, তাই না? কোথায় তাকে নিয়ে যাওয়া হয়েছিল জানার পর আমরা জানতে চেষ্টা করি কারা এবং কেন নিয়ে গিয়েছিল। সংশ্লিষ্ট পক্ষ সহযোগিতার হাত বাড়িয়ে দিল…
রাশিয়ানরা? জিজ্ঞেস করল পিটার, চেহারায় অবিশ্বাস। ওরা এভাবে সহযোগিতা করছে, ব্যাপারটা সন্দেহজনক নয়? আপনাদেরকে মূল্যবান তথ্য দেয়ার লোক তো নয় ওরা।
এই কেসটায় দিয়েছে, তার কারণও আছে—সময় হলে বলব।
বেশ।
কাকার সাথে পোল্যান্ড, ওয়ারশে ফিরে এল ম্যাগডা। পরিবারটা আসল, নাকি ষড়যন্ত্রের অংশ আমরা জানতে পারিনি। কাকার ইচ্ছায় পরীক্ষা দিল ম্যাগডা, খুব ভালো রেজাল্ট করল, চেষ্টা-তদবির করায় সোভিয়েত ইউনিয়নের একটা এলিট কলেজে পড়ার স্কলারশিপ-ও পেয়ে গেল সে।
কলেজটা ছিল কৃষ্ণসাগরের কাছে ওডেসায়। নাম নেই এমন একটা কলেজ, মেধাবীদের মধ্যে থেকে শুধু সেরা ছেলেমেয়েদের বাছাই করে আনা হয় এখানে। ম্যাগডাকে বিশেষ করে তালিম দেয়া হলো ভাষা, রাজনীতি, ফাইন্যান্স আর অঙ্কে। সতেরো বছর বয়সে একটা পরীক্ষায় প্রথম শ্রেণিতে পাস করল সে, কলেজের আরো স্পেশালাইজড ব্রাঞ্চে ভর্তি হলো। এখানে তাকে শেখানো হলো স্মরণশক্তি বাড়াবার কৌশল। ওডেসা কলেজের মান অনুসারে সহজ একটা পরীক্ষা নমুনা হলো-একশটা বিষয়ে চল্লিশটা লাইন লেখা থাকে একটা কাগজে, কাগজটা ষাট সেকেন্ড দেখতে দেয়া হয়। ষাট সেকেন্ড পর অন্য একটা কাগজে না দেখে লেখাগুলো লিখতে হয়, চব্বিশ ঘণ্টার পর। প্রশংসাসূচক ভঙ্গিতে আবার মাথা নাড়লেন ডক্টর পার্কার।
একই সাথে তাকে পাশ্চাত্যের অভিজাত শ্রেণির জীবনধারা শেখানো হলো। সাজ-সজ্জা, আহারাদি, পানীয়, প্রসাধন, আদব-কায়দা, জনপ্রিয় সঙ্গীত আর সাহিত্য, সিনেমা-থিয়েটার, গণতান্ত্রিক রাজনীতি, বাণিজ্য কৌশল, স্টক মার্কেট পণ্য বণ্টন, সেক্রেটারিয়াল কোর্স, আধুনিক নাচ, বশীকরণ মন্ত্র, সম্মোহন–এরকম আরো অনেক কিছু, সবই বিশেষজ্ঞদের তত্ত্বাবধানে–ফ্লাইং, স্কিইং, মার্ডারিং মেকানিক্যাল ইঞ্জিনিয়ারিং অর্থাৎ একজন প্রথম সারির এসপিওনাজ এজেন্টকে যা শেখানো দরকার।
ব্যাচে সেই ছিল মক্ষিরানি, মেধা এবং মননে সবার সেরা, এবং তোমার চোখে সে ধরা দেয় দুর্লভ একটা উপহার সামগ্রীর আদলে। অভিজাত কামিনীসুলভ কোমল, ঐশ্বর্যময়ী, দক্ষ, উদ্যোগী এবং বিপজ্জনক।
উনিশ বছর বয়সে, বয়সের দ্বিগুণ অভিজ্ঞতা আর জ্ঞান-বুদ্ধি অর্জন করে সে। তার ট্রেনিংয়ে একটাই মাত্র ছোট্ট খুঁত থেকে গিয়েছিল, সেটা প্রকাশ পায় পরে। বড় বেশি বুদ্ধিমতী সে, এবং বড় বেশি অ্যামবিশাস। বিশ মিনিটে এই প্রথম হাসলেন ডক্টর পার্কার। অ্যামবিশন, যার অপর নাম লোভ। তার প্রভুরা এই দোষটা লক্ষ্য করেনি।
কলিনের দিকে না তাকিয়ে একটা হাত পাতল পিটার। ওর হাতে চুরুট আর লাইটার ধরিয়ে দিল কলিন।
লোভ সে তো অযোগ্য আর নির্বোধ লোকের মধ্যেও থাকে, আবার শুরু করলেন ডক্টর পার্কার। শুধু অত্যন্ত উন্নতমানের মেধা যার, সেই টাকার লোভ আর ক্ষমতার লোভ এক করে দেখে। পিটারের চোখে প্রতিবাদ লক্ষ্য করে তাড়াতাড়ি মাথা নাড়লেন তিনি। না, না–আমি সাধারণ ক্ষমতার কথা বলছি না। নাগালের মধ্যে সবকিছু নিয়ন্ত্রণ করার ক্ষমতা, সে জিনিস নয়। আমি সত্যিকার ক্ষমতার কথা বলছি। একটা রাষ্ট্র বা জাতির ভাগ্য বদলে দেয়ার ক্ষমতা। যে ক্ষমতার অধিকারী ছিলেন সিজার বা নেপোলিয়ান। যে ক্ষমতার অধিকারী যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট। ব্যারনেস ম্যাগডার এই ক্ষমতাটা দরকার পিটার। মহান হবার লোভে ক্ষমতাটা দরকার তার।
