তুমি আমাকে অকাট্য প্রমাণের কথা বলছিলে, স্যার, স্মরণ করিয়ে দিল কলিন। এখুনি শুনতে চাও?
সোফা ছেড়ে জানালার সামনে গিয়ে দাঁড়াল পিটার। অপেক্ষা করে আছে।
আইটেম ওয়ান। মেলিসাকে আটকে রাখার সময় পোড়োবাড়ি থেকে দুটো টেলিফোন কল করা হয়। দুটোই ইন্টারন্যাশনাল কল। চলতি মাসের পয়লা তারিখে প্রথমটা, তার মানে যেদিন ওরা বাড়িটায় আশ্রয় নিয়েছিল। আমরা ধরে নিতে পারি, মেসেজের মূল কথা ছিল, এদিকে সব ঠিক আছে। অল্প সময়ের কল ছিল ওগুলো, আগে থেকে ঠিক করা এক বাক্যের একটা মেসেজ পাঠাতে যতক্ষণ লাগে। থেমে ডক্টর পার্কারের দিকে তাকাল কলিন।
বল, অনুমতি দিলেন ডক্টর পার্কার।
কলগুলো একটা ফ্রেঞ্চ নাম্বারে করা হয়েছিল বঁধুইলে ৪৭-৮৭-৯৭।
তলপেটে বেমক্কা একটা ঘুসি খেল যেন পিটার। ঝাঁকি খেয়ে একটু কুঁজো হয়ে গেল ও। মুহূর্তের জন্যে বন্ধ হয়ে গেল চোখ। এই নম্বরে কত বার ফোন করেছে ও। তারপর চোখ খুলে দ্রুত ঘন ঘন মাথা নাড়ল। না! এ আমি বিশ্বাস করি না!
কথাটা সত্যি, পিটার, নরম সুরে বললেন ডক্টর পার্কার।
ধীরে ধীরে জানালার দিকে পিছন ফিরল পিটার, ক্লান্ত পায়ে এগিয়ে এসে নিজের সোফায় বসে পড়ল।
কামরার ভেতর জমাট বেঁধে থাকল নিস্তব্ধতা। বাকি দুজনের কেউই সরাসরি পিটারের দিকে তাকাল না।
কলিনের দিকে তাকিয়ে নিঃশব্দে ইঙ্গিত করলেন ডক্টর পার্কার। লাল রঙের একটা বক্স ফাইল, টেবিলের ওপর দিয়ে ডক্টর পার্কারের দিকে ঠেলে দিল কলিন।
ফাইলটা খুললেন ডক্টর পার্কার। ডবল স্পেস দিয়ে টাইপ করা পাতা, এক সেকেন্ড করে চোখ বুলিয়েই উল্টে গেলেন। নির্দিষ্ট পাতায় চোখ রেখে অপেক্ষা করে থাকলেন, পিটারকে শান্ত হবার সময় দিচ্ছেন।
শিরদাঁড়া খাড়া করে বসে আছে পিটার, সরাসরি সামনের দেয়ালে স্থির হয়ে আছে ঠাণ্ডা দৃষ্টি। ওর সারা শরীরে অসাড় একটা ভাব এবং গলার কাছে বিষমিশা। আবার চোখ বুজল পিটার, থই থই যৌবন নিয়ে একহারা নারীদেহ ভেসে উঠল মনের পর্দায়, চেহারায় হৃদয়ের সমস্ত ব্যাকুলতা ফুটিয়ে আত্মসমর্পণ করছে ওর কাছে। মার্জিত এবং অভিজাত, সুন্দরী এবং বিদুষী। বিশ্বাসঘাতিনী? ওকে ব্যবহার করেছে?
চোখ খুলে আরো একটু সিধে হলো পিটার এবং মুহূর্তটি চিনতে পেরে পিটারের দিকে ফাইলটা উল্টো করে ধরলেন ডক্টর পার্কার।
ফাইলের কাভারে লেখা রয়েছে, টপ সিক্রেট। তার নিচে নামটা টাইপ করা : অল্টম্যান ম্যাগডা আইরিন। জন্ম : কুচিনস্কি।
ফাইলটা সিধে করলেন ডক্টর পার্কার, তারপর শুরু করলেন। তোমাকে আমি আগেই বলেছি, মেয়েটার প্রতি আমাদের বিশেষ কৌতূহল আছে। নিউ ইয়র্কে তুমি আমার সাথে দেখা করার পর তার সম্পর্কে কৌতূহলের মাত্রা বাড়িয়ে দিয়েছে। তথ্য সংগ্রহ করার বেশিরভাগ কৃতিত্ব কলিনের বিভিন্ন ইন্টেলিজেন্স এজেন্সিতে ধরনা দিয়ে অসম্ভবকে সম্ভব করেছে। সি. আই. সি, ব্রিটিশ সিক্রেটি সার্ভিস, ফ্রেঞ্চ ইন্টেলিজেন্স এবং এমনকি কে.জি.বি-র কাছ থেকেও সহযোগিতা আদায় করেছে ও।
নারী রহস্যময়ী। নারী ছলনাময়ী। পুরানো হলেও, কথাগুলো আজও কারও কারও বেলায় সত্যি। মেয়েটা…এক কথায় অঘটনঘটনপটিয়সী। তার কৃতিত্ব রীতিমতো অবিশ্বাস্য। সুপুরুষ বাছাইয়ে তার রুচি আর দক্ষতা স্বীকার করে নিতে হয়। কি রকম কষ্ট পাচ্ছ তা আমি বুঝি, পিটার। কিন্তু দুঃখিত, তোমার ব্যক্তিগত অনুভূতির প্রতি সম্মান দেখিয়ে কৌশলে ব্যাপারটা নিয়ে আলোচনা করার সময় আমাদের হাতে নেই। স্পষ্ট ভাষায় তিক্ত কত কথা বলব আমি।
আমরা জানি, ব্যারনেস ম্যাগডা অল্টম্যান তোমাকে একজন লাভার হিসেবে গ্রহণ করেছে। বুঝতে পারছ কি, বাক্যটা আমি নির্বাচিত শব্দ দিয়ে সাবধানে সাজিয়েছি? ব্যারনেস ম্যাগডা লাভার গ্রহণ করে, উল্টোটা ঘটে না। সে লাভার বাছাই করে ভবিষ্যতের কথা ভেবে, নিজের স্বার্থে, এবং নিখুঁত পরিকল্পনার সাহায্যে। নিছক ভাবাবেগের কোনো মূল্যই দেয় না সে।
পিটারের মনে পড়ল ব্যারনেস ম্যাগডা ওকে বলেছিল, মন দেয়া-নেয়ার ব্যাপারে আমি একদম কাঁচা, পিটার, কোনো অভিজ্ঞতা নেই। শুধু যেন, তোমাকে আমি সুখী করতে চাই, সেই সাথে তোমাকে নিয়ে সুখী হতে চাই।
লাভ-মেকিং-এ ট্রেনিং পাওয়া মেয়ে, এ বিষয়ে তার জুড়ি গোটা পশ্চিম জগতে আর হয়তো দু-একজন থাকতে পারে। আর এই ট্রেনিং সে প্যারিস, লন্ডন, বা নিউ ইয়র্কে পায়িনি। ক্রু কুঁচকে পিটারের দিকে তাকালেন ডক্টর পার্কার। এসবই গুজব, পিটার। তুমিই ভালো বলতে পারবে কতটা কি সত্যি বা মিথ্যে।
পিটারের নির্লিপ্ত চোখে অনুসন্ধানী দৃষ্টি। ব্যারনেস ম্যাগডা কৌশলে ওকে প্রেমের জালে আটকেছে, এ কথা এখনো বিশ্বাস করতে চায় না। ম্যাগডার সাথে থাকার সময় মধুর একটা আবেশে আচ্ছন্ন হয়ে ওঠে ওর গোটা অস্তিত্ব, তনু-মন ছেয়ে থাকে পরম পুলকে। মিষ্টি ভুবনভোলানো হাসি, মৃদু কোমল স্পর্শ, কিংবা কোনো দুর্লভ উপহার দিয়ে ওকে সম্মোহিত করে ফেলে। ডক্টর পার্কারের প্রশ্নের উত্তর দিল না পিটার। বিড়বিড় করে বলল, আপনি বলে যান, প্লিজ। নিজেকে সামলে নিতে পেরেছে ও, ওর ডান হাত কোলের ওপর শিথিল ভঙ্গিতে পড়ে আছে, আঙুলগুলো ছড়ানো।
ভাষা আর অঙ্কে ছোটবেলা থেকেই অসম্ভব ভালো সে। তার বাবা সৌখিন অঙ্কবিদ ছিলেন, দাবাতেও খুব ভালো ছিলেন। তাঁর মেয়ে ম্যাগডা সবার দৃষ্টি কাড়ে, কারণ তিনি কমিউনিস্ট পার্টির সদস্য ছিলেন। দুঃখিত, পিটার-এটা একটা নতুন তথ্য তাই তোমাকে আগে জানানো সম্ভব হয়নি। ফ্রেঞ্চদের কাছ থেকে পেয়েছি তথ্যটা, রাশিয়ানরা কনফার্ম করেছে। পার্টি মিটিংয়ে মেয়েকে সাথে করে নিয়ে যেতেন বাবা এবং দেখা গেল রাজনীতির প্রতি দারুণ আগ্রহ আছে মেয়ের।
