তুমি আমাকে বিশ্বাস করতে বলছ, গোটা ব্যাপারটাই কোইন্সিডেন্স। জিলির দুর্ভাগ্য, পুরানো এক শত্রুর সাথে দেখা হয়ে গিয়েছিল। আমাদের সৌভাগ্য, জিলির শত্রু আমাদেরকে খবরটা জানাবার সিদ্ধান্ত নেয়। মেলিসার ভাগ্য, তার হাত কাটার চব্বিশ ঘণ্টা আগেই খবরটা পেয়ে যাই আমরা। থোর কমান্ডের সৌভাগ্য, ঠিক যখন জিলি ও’ শওনেসি পালাচ্ছে তখন সেখানে পৌঁছুতে পারি আমরা। এই ব্যাখ্যাই তো দিতে চাইছ, তাই না?
অনেকটা তাই, স্বীকার করল কলিন।
দুঃখিত, কলিন। পরপর এতগুলো দৈব-ঘটনা আমি বিশ্বাস করি না।
ঝেড়ে কাশো, আমন্ত্রণ জানাল কলিন। শোনা যাক আসলে ঠিক কি ঘটেছে।
কি ঘটেছে আমি জানি না। তিক্ত একটু হাসল পিটার। কিন্তু আমার শুধু মনে হচ্ছে, খলিফা যেখানে জড়িত সেখানে এতগুলো কেন, কোনো দৈব-ঘটনাই ঘটতে পারে না। আমার বিশ্বাস, খলিফাও কো-ইন্সিডেন্স বিশ্বাস করেন না।
ঠিক কি বলতে চাও?
জিলির ব্যাপারে এইটুকু যে, প্রথম থেকেই তার কপালে মৃত্যু-চিহ্ন এঁকে দেয়া হয়েছিল। গোটা প্ল্যানেরই একটা অংশ-জিলির এই মৃত্যু।
তোমার মনে হওয়াটা খুব মজার, একটু যেন রেগে উঠল কলিন। কিন্তু মনে হওয়ার ভেতর যুক্তি আর প্রমাণ না থাকলে তার দাম কি?
আত্মসমর্পণের ভঙ্গিতে হাত তুলল পিটার। ঠিক আছে, শান্ত হও। ধরা যাক, তোমার ব্যাখ্যাটাই ঠিক। তাহলে…
কিন্তু?
কোনো কিন্তু না। অন্তত যতক্ষণ অকাট্য প্রমাণ না পাওয়া যায়।
নিঃশব্দে কাঁধ ঝাঁকাল কলিন, তার চেহারা গম্ভীর। অকাট্য প্রমাণ, তাই না? ট্রাই দিস ওয়ান ফর সাইজ
থামো, কলিন, দ্রুত, কর্তৃত্বের সুরে বাধা দিলেন ডক্টর পার্কার। এ প্রসঙ্গে কিছু বলার আগে আরো কথা আছে। অনেক কষ্টে নিজেকে সামলে নিল কলিন, ধীরে ধীরে শান্ত হলো তার চেহারা, ডক্টর পার্কারের দিকে তাকিয়ে নিঃশব্দে পরিচিত হাসি হাসল একটু।
একটু পিছিয়ে যাই আমরা, কেমন? কথা বলছেন ডক্টর পার্কার। পিটার এল খলিফার নাম নিয়ে। তারও আগে এই একই নাম শুনেছি আমরা, কিন্তু সম্পূর্ণ অন্য এক উৎস থেকে। পিটারকে আমি কথা দিয়েছি, আমাদের উৎস সম্পর্কে বলব ওকে। বলব, কারণ, গোটা ব্যাপারটা তাহলে সম্পূর্ণ নতুন এক আলোয় উদ্ভাসিত হয়ে উঠবে।
এমন একটা দিক থেকে খবরটা এল, রীতিমতো তাজ্জব ব্যাপার। তবে নামের ধরনটা বিবেচনা করলে আশ্চর্য হওয়া চলে না। পুব দিক, পিটার। পরিষ্কার করে বলি, রিয়াদ। সৌদি আরবের রাজধানী, তেল সাম্রাজ্যের বাদশার প্রাসাদ। কেসটার কথা নিশ্চয় তোমার মনে আছে। বাদশার উনিশ বছরের নাতি, প্রিন্স। সে খুন হয়ে যাবার পর বাদশা সি.আই. এর সাহায্যে চান। পিটারের মনে পড়ল, ব্যারনেস ম্যাগডার সাথে এ প্রসঙ্গে আলোচনা হয়েছে ওর, মাত্র তিন সপ্তাহ আগে। প্রিন্সের চেয়ে অনেক বেশি ভালোবাসেন বাদশার এমন নিকট আত্মীয়ের সংখ্যা সাতশর মতো, আরো আছে-এদের সবাইকে নিখুঁতভাবে প্রোটেকশন দেয়া সম্ভব নয়, কাজেই যে কেউ খলিফার শিকারে পরিণত হতে পারে।
বাদশার কাছে ওদের দাবিটা কি ছিল? জিজ্ঞেস করল পিটার।
দাবি একটা জানানো হয়েছিল শুধু এটুকুই জানি আমরা। নিজের এবং পরিবারের নিরাপত্তার দিকটা দেখার জন্যে সি.আই. এ-র সহযোগিতা চান বাদশা। দাবিটা জানানো হয়েছিল খলিফা নামে কোনো লোক বা এজেন্সির পক্ষ থেকে। দাবিটা কি ছিল তা না জানলেও, খবর পেয়েছি যে ইরানের সাথে সুর মিলিয়ে সৌদি আরবও ঘোষণা করেছে ওপেকের পরবর্তী বৈঠকে ক্রুড অয়েলের দাম বাড়াবার প্রস্তাব তারা সমর্থন করবে না। তারা বরং আরো পাঁচ পার্সেন্ট কমাবার জন্যে চেষ্টা করবে।
তার মানে খলিফার চাপের মুখে নতি স্বীকার করছে দেশগুলো! বিড়বিড় করে বলল পিটার।
অন্তত দেখে তো তাই ভাবতে হয়। পাইপে আগুন ধরালেন ডক্টর পার্কার। তার মানে আমরা যা ভয় করেছিলাম সেটা সত্যি–খলিফার অস্তিত্ব একটা বাস্তব ঘটনা।
শুধু যে অস্তিত্ব আছে তাই নয়, দিনে দিনে তার সাহসও বাড়ছে।
সত্যি কথা বলতে কি, আমরা আসলে ঘাস কাটছি, ঝঝের সাথে বলল, কলিন। জোহানেসবার্গে সেই জিতল। রিয়াদেও সেই জিতছে। এরপর কোথায় হাত বাড়াবে সে? পশ্চিম জার্মানির শ্রমিক সংগঠনে? গ্রেট ব্রিটেনের ট্রেড ইউনিয়নে? লোকটা এরকম একটা হুমকি হয়ে থাকবে আর আমরা বসে বসে দেখব? একে একে পিটার আর ডক্টর পার্কারের দিকে তাকাল সে, তারপর আবার বলল, আমাদের বোঝা উচিত, এককভাবে কোনো গ্রুপ যদি যথেষ্ট ক্ষমতার অধিকারী হয়ে ওঠে সে গ্রুপের পক্ষে যে কোনো দেশের ভাগ্য বদলে দেয়া সম্ভব।
গোটা পৃথিবীর জন্যেই ব্যাপারটা ভীতিকর। দুনিয়ার বড় বড় সিদ্ধান্ত যারা নেন তাদের সংখ্যাও কম নয়, তাদের সবাইকে ব্যক্তিগতভাবে রক্ষা করা অসম্ভব একটা ব্যাপার। এক সেকেন্ড চিন্তা করল পিটার। আমরা একটা বুদ্ধিমান শত্রুর পিছনে লাগতে যাচ্ছি। প্রথম দুটো টার্গেটের কথা ভেবে দেখ। দক্ষিণ আফ্রিকা আর সৌদি আরব। একটা দেশ কালোদের নির্যাতন করছে, আরেকটা দেশ তেলকে অস্ত্র হিসেবে ব্যবহার করছে–এদের প্রতি সাধারণ মানুষের কোনো সমর্থন বা সহানুভূতি নেই। তার মানে সাধারণ মানুষের মনে একটা ধারণা জন্ম নিচ্ছে, খলিফা আসলে মানবসভ্যতার মঙ্গল চায়। এভাবে জনপ্রিয়তা অর্জনের পিছনে নিশ্চয়ই তার কোনো উদ্দেশ্য আছে। সে কি নিজেকে ঈশ্বরের প্রতিনিধি ভাবছে, নাকি রবিন হুড? দুনিয়ার বুক থেকে দুর্নীতি আর অবিচার মুছে ফেলে বাসযোগ্য একটা স্বর্গ গড়ে তুলতে চায়?
