এর আগে ডক্টর কিংস্টোন পার্কার একবার দেখে গেছেন মেলিসাকে, তার রাশভারি ব্যক্তিত্ব আবার একবার মুগ্ধ করেছে পিটারকে। স্টিভেন সম্পর্কে পিটার আর কলিনের কাছ থেকে আগেই কিছু কিছু জেনেছিলেন ডক্টর পার্কার, বাড়িতে এসে তার সাথে অনেকক্ষণ গল্প করা থেকে বোঝা গেল স্টিভেনকে তার পছন্দ হয়েছে। সুযোগ পেয়ে ডক্টর পার্কারের মতো তাত্ত্বিককে নিজের ধ্যানধারণার খানিকটা আভাস দিতে ভুল করেনি স্যার স্টিভেন স্ট্রাইড। ডক্টর পার্কার শুনে চমৎকৃত হলেন যে পুজিবাদের সমর্থক হয়েও পিটারের ভাই মানবকল্যাণে সাধ্য মতো অবদান রাখতে আগ্রহী। স্টিভেন তাকে আরো বলল, পশ্চিমী দুনিয়ার নিরস্ত্রীকরণে বিশ্বাসী নয় সে, কারণ প্রতিপক্ষরা নিরস্ত্রীকরণ চুক্তি মেনে চলছে কিনা পরীক্ষা করে দেখার নিচ্ছিদ্র কোনো উপায় আসলে নেই। তার সাথে একমত হয়ে ডক্টর পার্কার যোগ করলেন, যেহেতু শ্বেতাঙ্গরাই সব দিক থেকে এগিয়ে আছে তাই তাদেরকেই বাকি দুনিয়ার কল্যাণ সাধনে মুখ্য ভূমিকা পালন করে যেতে হবে, তবে আরো অনেক দ্রুতগতিতে এবং দক্ষতার সাথে। বি-১ বোমারু বিমান আর নিউট্রন বোমার আশঙ্কা নিয়ে আলোচনা করলেন দুজন।
এমনকি মেলিসা পর্যন্ত পছন্দ করে ফেলল পার্কারকে। ডিনার শেষ হতে পিটার এবং তিনি–দুজনে মিলে লম্বা টেবিলে বসে আলাপে মগ্ন হলো।
পাঁচ দিন হলো ইংল্যান্ডে রয়েছি। বেশিরভাগ সময় হোয়াইট হলে কেটেছে আমার।
পিটার জানে, মার্কিন প্রেসিডেন্টের প্রতিনিধি হিসেবে ব্রিটিশ প্রাইম মিনিস্টারের সাথে কথা বলেছেন ডক্টর পার্কার, সম্ভবত দুয়েক বার।
শুধু যে অ্যাটলাস সম্পর্কে কথা হয়েছে তা নয়, আরো অনেক বিষয়ে আলাপ করেছি। তবে অ্যাটলাস সম্পর্কে বেশি কথা হয়েছে। তুমি জানো, আটলান্টিকের অদূরেই আমাদের বিরোধিতা করা হচ্ছে। তাদের যুক্তি ফেলে দেয়ার মতো তা আমি বলি না। আমাদের অর্গানাইজেশন বা অ্যাটলাস এককভাবে অন্য যে কোনো সংগঠনের চেয়ে বেশি ক্ষমতা ভোগ করছে-আমাদের সামরিক শক্তিও তুলনাহীন। ওরা বলছে, একজন বা মাত্র কয়েকজন এলিট লোকের হাতে এত ক্ষমতা থাকা মানে একটা ফ্রাঙ্কেনস্টাইন তৈরি করা। যা তুমি ধ্বংস করতে চাও এই ফ্রাঙ্কেনস্টাইন তার চেয়েও ভয়াবহ হয়ে উঠতে পারে। তুমি কি বল, পিটার?
নির্ভর করছে যিনি সংগঠনটা নিয়ন্ত্রণ করছেন তাঁর ওপর, ডক্টর পার্কার। আমার ধারণা, যোগ্য এবং সঠিক ব্যক্তির ওপরই দায়িত্ব দেয়া হয়েছে।
ধন্যবাদ, পিটার। অ্যাটলাস বিস্ময়কর কিছু সাফল্য অর্জন করেছে জোহানেসবার্গে, তারপর এবার আয়ারল্যান্ডে। কিন্তু তার ফলে সংগঠনটা আরো বিপজ্জনক হয়ে উঠেছে। লোকে এখন জানে, আমরা যদি আরো বেশি ক্ষমতা চাই, দ্বিধা না করে তা বরাদ্দ করা হবে। আর মুশকিল কি জানো, সত্যি যদি আমরা কাজ করতে চাই, আরো বেশি ক্ষমতা আমাদের দরকারও বটে। এই ব্যাপারটা নিয়ে বড়ই দুর্ভাবনায় আছি আমি…।
কাজ বলতো, অশুভ কোনো শক্তিকে ধ্বংস করা। ঠিক, তার সাথে পাল্লা দিতে হলে আরো ক্ষমতা আমাদের দরকার।
কিন্তু ভেবে দেখেছ কি, খুব বেশি ক্ষমতা পেলে আমরা সেটাকে ব্যবহার করব কিভাবে? কিভাবে বুঝব ক্ষমতার অপব্যবহার হচ্ছে না? ঠিক কখন আইনের শাসনকে শক্তির শাসন ছাড়িয়ে যাচ্ছে তা বোঝা উপায় কি?
বর্তমান দুনিয়ায় আইনের শাসন অনেক ক্ষেত্রেই অকেজো হয়ে গেছে, কারণ কিছু লোক প্রায় অজেয় শক্তির অধিকারী হয়ে উঠেছে, আইনের প্রতি তাদের কোনো শ্রদ্ধাবোধ নেই। সে-সব লোককে চিহ্নিত করা এমন কোনো কঠিন কাজ নয়। তাদেরকে সামলাতে হলে শক্তি দিয়েই সামলাতে হবে।
আরেকটা ধারণার কথা বলি, পিটার। বহু বছর ধরে বিষয়টা নিয়ে ভাবছি আমি। মানুষের ওপর যদি অন্যায় আইনের শাসন চাপিয়ে দেয়া হয়? কেউ যদি নির্যাতনের আইন চালু করে? একজন লোক কালো রঙ নিয়ে জনেছে বা সে তার স্রষ্টাকে অন্য নামে ডাকে বলে কেউ যদি তাকে নিকৃষ্ট ভেবে শাসন ও শোষণ করার চেষ্টা করে? জনপ্রতিনিধিদের দ্বারা গঠিত একটা পার্লামেন্ট যদি বর্ণ-বৈষম্যের পক্ষে আইন পাস করে, কিংবা জাতিসংঘের সাধারণ পরিষদ যদি ঘোষণা করে যে, ইহুদি ধর্ম আসলে সাম্রাজ্যবাদেরই অন্য এক রূপ, তাহলে?
ধরো যদি মুষ্টিমেয় কিছু লোক দুনিয়ার তাবৎ সম্পদের মালিক বনে যায় বা সে সম্পদ নিয়ন্ত্রণ করতে শুরু করে এবং তাদের তৈরি আইনের দ্বারা যদি ব্যক্তিগত উচ্চাশা বা লোভ চরিতার্থ করার চেষ্টা করে, তখন? আরো পরিষ্কার করে বলি-ওপেক কমিটি যদি সিদ্ধান্ত নেয়, তাদের হাতে তেল আছে, তেলটাই অস্ত্র এবং এই অস্ত্র দিয়েই তারা মানবজাতির ভবিষ্যৎ নির্ধারণ করবে, তখন? ওপেকের, বা শাহ বা সৌদি আরবের রাজা এ ধরনের চিন্তা করা অসম্ভব কিছু নয়। অসহায় একটি ভঙ্গি করে হাত নাড়লেন ডক্টর পার্কার। তখন কি আমরা তাদের তৈরি আইনের প্রতি শ্রদ্ধা দেখাব? যদি বুঝি ওদের তৈরি আইনগুলো অন্যায় আইন, তাহলেও?
তার মানে, এককভাবে কোনো সংগঠন যত ক্ষমতা রাখে তার চেয়ে বেশি ক্ষমতা পেতে হবে আমাদের, তাই না?
ডক্টর পার্কার একটু হাসলেন, সোফা ছেড়ে পিটারের সামনে পায়চারি শুরু করলেন তিনি। অ্যাটলাসের জন্যে আরো ক্ষমতা চেয়েছি আমি, আশা করছি পেয়ে যাব। ক্ষমতা না বলে এটাকে আসলে সুযোগ বলা উচিত। অনেক রকম সুযোগ দেয়া হবে আমাদের, সেই সুযোগ কাজে লাগিয়ে নিজেদের আমরা ক্ষমতাবান এবং দুর্জয় করে তুলতে পারি। কিন্তু সেজন্যে যোগ্য অন্যায় আইন কোনোটা নয়। যারা বুঝবে কেন, কিসের বিরুদ্ধে লড়ছে তারা। পিটারের সামনে দাঁড়িয়ে ওর কাঁধে একটা হাত রাখলেন তিনি।
