শেষ রক্ষা হবে না, এক সময় খাদে পড়বেই অস্টিন, জানে পিটার। ওর উচিত ঝুঁকি নিয়ে লাফ দিয়ে পড়া, প্রথমে নিজের জান বাঁচানোর চেষ্টা করা। কিন্তু উদভ্রান্ত গাড়ির ছাদে তবু সেঁটে থাকল ও, কারণ মেলিসাকে বিপদের মধ্যে ফেলে যাওয়া ওর পক্ষে সম্ভব নয়।
হুইলটা আবার ধরেছে পিটার, গাড়ির বাইরে মাথা বের করে তাকাতেই পাঁচিলের গায়ে কাঠের একটা ফটক দেখতে পেল। ফটকের দিকে চোখ রেখে হুইলটা আস্তে আস্তে ঘোরাতে শুরু করল। তীরবেগে ছুটে এল ফটক।
ধাক্কা লাগল, কাঠের কবাট ভেঙে ভেতরে ঢুকল অস্টিন। বিস্ফারিত রেডিয়েটর থেকে গরম পানি ছড়িয়ে পড়ল পিটারের হাত আর মুখে। খোলা মাঠে খ্যাপা ষাড়ের মতো ঢুকে পড়ল গাড়ি, ছড়ানো পাথরের ওপর দিয়ে ঝাঁকি খেতে খেতে ছুটছে। পাথরগুলোর মাঝখানে নরম মাটি, চাকা বসে যেতে লাগল, সেই সাথে কমে এল গতি। সরু একটা নালার মধ্যে অস্টিন, দুবার ড্রপ খেয়ে স্থির হয়ে গেল।
শরীরটা গড়িয়ে দিয়ে গাড়ির পাশে নামল পিটার। হ্যাচকা টানে দরজা খুলতেই ক্যাব থেকে মাটিতে ঢলে পড়ল একজন লোক, বিড়বিড় করে কি যেন বলছে সে। ডান হাঁটু দিয়ে তার চিবুকে প্রচণ্ড আঘাত করল ও, জ্ঞান হারিয়ে স্থির হয়ে গেল। ডাক্তার জেমসন। তাকে টপকে অস্টিনের ভেতর মাথা ঢোকাল পিটার।
দুহাতের ওপর মেলিসাকে নিয়ে সিধে হলো পিটার, হাত দুটো থরথর করে কাঁপছে। পা টলছে পিটারের, থেমে থেমে হেলিকপ্টারের দিকে হাঁটছে ও। খানিক দূরে মাটিতে নেমেছে সেটা।
ঠোঁট নড়ছে মেলিসার, কিন্তু আওয়াজ বেরুচ্ছে না। চোখ বন্ধ। পিটারের কাঁধ আর পিঠ খামছে ধরে আছে সে।
কপ্টার থেকে ছুটে এল থোর ডাক্তার। পিটারের অস্ফুট কণ্ঠস্বর শুনতে পেল সে, আর কোনো চিন্তা নেই, ডার্লিং! সব ঠিক হয়ে গেছে। তুমি এখন আমার কাছে
হঠাৎ লজ্জা পেল পিটার। উপলব্ধি করল, গাল বেয়ে ওটা ঘাম নয়, চোখের পানি নামছে। শেষ কবে কেঁদেছে ওর মনে পড়ল না। কবে কেঁদেছে, এখন কেন কাঁদছে, এসব কিছুই গুরুত্বপূর্ণ নয়। এখন যখন ওর আদরের মেয়ে তার বুকের মাঝখানে ফিরে এসেছে।
.
লন্ডনে মেলিসাকে দেখতে এল সিনথিয়া। ওর গলায় অনুযোগ, তোমার সাথের লোকেদের কেন এত ভুগতে হয়–পিটার? মেলিসাও বাদ গেল না!
কিছু না বলাই সঙ্গত মনে হলো পিটারের। এই দুই বছরে একদম লাবণ্য হারিয়ে ফেলেছে সিনথিয়া; কখনো মনে হয় না ওর মধ্যে প্রাণশক্তি ছিল। মেয়ের বিছানার পাশে বসে সারাক্ষণ অনুযোগ করে গেল সে।
অ্যান্টিবায়োটিক দেয়া হয়েছে মেলিসাকে, সুফল ফলতে দেরি হলো না। তিন দিন পর ডাক্তার জানাল, বিপদ কেটে গেছে। প্রতিদিন নতুন করে ব্যান্ডেজ বাধা হলো আঙুলে, হাতটা ঝুলে থাকল গলার সাথে মিঙে। দুঘণ্টা পর পর জোরজার করে কিছু না কিছু খাওয়াচ্ছে সিনথিয়া, ধীরে ধীরে দুর্বলতা কাটিয়ে উঠছে। মেলিসা।
মা, আমার খুব ভয় লাগে। আমি কি ক-দিনের জন্যে বাবার সাথে যেতে পারি?
অনেক অনুরোধের পর ভারাক্রান্ত মনে রাজি হলো সিনথিয়া। নিজেকে অপরাধি মনে হতে লাগলো পিটারের। মেলিসার আরোগ্য লাভের আগপর্যন্ত অ্যাবটস ইউ-তে, নিজের এস্টেটে ওকে থাকার জন্যে বলেছেন চাচা স্যার স্টিভেন।
সব সময় মনে হতো–তুমি আসবে। এর বেশি কিছু মনে নেই। সবকিছু কেমন ধোয়াটে। মনে করতে পারি না। দুই একটা মুখ, ধীর সময়–এই, জানায় মেলিসা।
তোমাকে ওরা যে ওষুধটা দিয়েছিল, ওটার প্রভাবে অমন হচ্ছিল। পিটার বলে।
তা জানি। সুঁইয়ের খোঁচা টের পেয়েছি। কিন্তু তাও, অন্ধকারে শুয়ে ভাবতাম কখন আসবে তুমি।
ধীরে ধীরে ওর থেকে পুরো গল্পটা বের করে নিতে চায় পিটার।
একটা, লোকের দৃষ্টি ভয়ঙ্কর। ভীষণ খারাপ সে। অপরজনকে আমার ভালোই লাগত, ওর নাম ডাক্তার জেমসন।
দীর্ঘশ্বাস ফেলে পিটার ভাবল, ওই লোকটাই তোমার আঙুল কেটেছে, হয়তো সময় পেলে পুরো হাতটাই কাটত।
কিন্তু আরেকজনকে আমি দেখিনি।
আরেকজন? তীক্ষ্ণ কণ্ঠে জানতে চায় পিটার। দুজন ছিল ওখানে।
মৃদু হেসে মাথা নাড়ল মেলিসা, পিটারের সাথে দ্বিমত পোষণ করল। দুজন নয়, তিনজন ছিল, বলল সে। হ্যাঁ। কিন্তু তাকে আমি দেখিনি। তবে বুঝতে পারছিলাম, ওরা দুজনেই তাকে ভীষণ ভয় করে।
দেখনি, তো বুঝলে কিভাবে?
ওদের কথা শুনে বুঝলাম, বলল মেলিসা। মঝেমধ্যে ওষুধের প্রভাব কমে এলে ওদের কথা শোনার চেষ্টা করতাম। ওরা দুজন তর্ক করত, অপর লোকটা কি করবে না করবে…
নাম কি তার?
মনে পড়ছে না! স্মরণ করার চেষ্টা করল মেলিসা। আসলে ঘুমের ঘোরে কি শুনেছি মনে নেই। ক্যাসপার বা ওরকম কিছু একটা হবে।
ক্যাসপার?
উঁহু, না। ধ্যেৎ, মনে করতে পারছি না। হঠাৎ উজ্জ্বল হয়ে উঠল মেলিসার চেহারা। পেয়েছি! হ্যাঁ, কোনো সন্দেহ নেই–খলিফা!
এর কিছুক্ষণ পর ঘুমিয়ে গেল মেলিসা। যেন ওই একটা নাম উচ্চারণ করে সমস্ত ভার নামিয়ে দিয়েছে বুক থেকে। ভয়ঙ্কর ক্রোধে গনগন, পিটার ঠায় বসে রইল মেয়ের মাথা কোলে নিয়ে।
.
অ্যাবোটস ইউ থেকে দুবার ফোন করল পিটার ব্যারনেস ম্যাগডাকে, দুবারই তার ব্যক্তিগত নম্বরে, কিন্তু তাকে পাওয়া গেল না। কেউ তার কোনো খোঁজ দিতে পারল না, পিটারের জন্যে কোনো মেসেজও রেখে যায়নি সে। ডেল্টা কন্ডিশনে মেলিসাকে উদ্ধার করার পর পাঁচ দিন পেরিয়ে যাচ্ছে, ব্যারনেস ম্যাগডার কোনো হদিস নেই।
