এভাবে গড়াগড়ি খেলে ছাদে বেশিক্ষণ টেকা যাবে না। গাড়ির মতিগতি আন্দাজ করে নিয়ে খালি হাতটা লম্বা করে দিল পিটার, একই সাথে নরম বুটের ডগা রুফ ক্যারিয়ারের একটা ফাঁকে ঢুকিয়ে আটকে ফেলল আঙটার মতো।
হেলিকপ্টারের আলোয় সামনে একটা প্রায় খাড়াভাবে নেমে যাওয়া বক দেখল ড্রাইভার। গাড়ি সিধে করতে বাধ্য হলো সে। বাকের পর রাস্তাটা ঘন ঘন এঁকেবেঁকে নেমে গেছে উপকূলের দিকে।
মাথা তুলল পিটার, উঠে বসতে যাচ্ছে, এই সময় নাকের ঠিক ছয় ইঞ্চি সামনে ছাদের ছোট্ট একটা অংশ ওপর দিকে বিস্ফোরিত হলো। নিখুঁত একটা গর্ত তৈরি করে বেরিয়ে গেল বুলেট। সেই সাথে কানের পর্দায় জোর ধাক্কা দিল পিস্তল শটের তীক্ষ্ণ আওয়াজ। ড্রাইভিং সীটে বসে আন্দাজের ওপর নির্ভর করে ছাদে গুলি করছে ড্রাইভার, প্রথমবার মাত্র কয়েক ইঞ্চির জন্যে লক্ষ্য ভেদে ব্যর্থ হয়েছে সে।
কোণঠাসা বিড়ালের মতো বেপরোয়া হয়ে উঠল পিটার, সমস্ত শক্তি এক করে ছাদের কিনারায় সরে যাবার চেষ্টা করল। মুহূর্তের জন্যে রুফ ক্যারিয়ার থেকে ছুটে যাচ্ছিল পা। ছাদ ফুটো করে আরেকটা বুলেট বেরিয়ে এল, এইমাত্র যেখানে পেট ছিল পিটারের।
মরিয়া হয়ে উঠল পিটার। গাড়ির পিছন দিকে গুটিয়ে নিয়েছে শরীরটা, এক কিনার থেকে আরেক কিনারায় ঘন ঘন জায়গা বদল করছে। পরবর্তী বিস্ফোরণের সাথে সাথে চুল পোড়ার গন্ধ পেল ও, গরম আঁচ অনুভব করল খুলিতে।
কিছুটা কৌশল, বাকিটা ভাগ্যগুণে বেঁচে যাচ্ছে পিটার। কিন্তু ভাগ্য প্রতিবার সহায়তা করবে না। প্রতিমুহূর্তে আশঙ্কা করছে এই বুঝি লাগল একটা বুলেট। কিন্তু না, ড্রাইভার আর গুলি করছে না।
এতক্ষণে মনে পড়ল পিটারের, হেলিকপ্টারের দিকে ছুঁড়ে কয়েকটা বুলেট বাজে খরচ করেছে ড্রাইভার। ধীরে ধীরে আরেকটা ব্যাপারে সজাগ হলো পিটার, ইঞ্জিন আর রোটরের আওয়াজকে চাপা দিয়ে একটা শব্দ বাড়তে চেয়েও পারছে না। দুই সেকেন্ড দিশেহারা বোধ করল পিটার। তারপর শব্দটা কোত্থেকে আসছে বুঝতে পেরে শরীরে অসুরের শক্তি অনুভব করল। ঘুম জড়ানো কণ্ঠস্বর, অনেকটা গোঙানির মতো। ওষুধের প্রভাব কেটে যাওয়ায় চারপাশে কি ঘটছে আন্দাজ করতে পারছে মেলিসা। চিৎকার করে কি যেন বলার চেষ্টা করছে সে, কিন্তু গলা চড়াতে পারছে না।
বাঁ-পায়ের আঙুলে ভর দিয়ে বিড়ালের মতো সিধে হলো পিটার, হামাগুড়ি দিয়ে সামনের দিকে এগোল। ড্রাইভিং সীটের ঠিক ওপরে থামল ও।
আবার চিৎকার করার চেষ্টা করল মেলিসা। এবার তার কণ্ঠস্বর নিঃসন্দেহে চিনতে পারল পিটার। কুইক-রিলিজ হোলস্টার থেকে ওয়ালথার বের করে এক ঝটকায় হ্যাঁমার কক করল ও, একই সময় চোখ তুলে দেখে নিল দ্রুত ছুটে আসা আরেকটা বাঁককে। দুহাতে হুইল ধরে গাড়ির নিয়ন্ত্রণ ঠিক রাখতে হবে ড্রাইভারকে।
ছাদের সামনের কিনারা থেকে নিচের দিকে ঝুলে পড়ল পিটার। মাথা নিচের দিকে, তাকিয়ে আছে পিছন দিকে, হতভম্ব ড্রাইভারের চোখ, মাঝখানে মাত্র আঠারো ইঞ্চির ব্যবধান।
দুজোড়া চোখের দৃষ্টি এক সেকেন্ড বাধা পড়ল। শওনেসির ফটো দেখেছে পিটার, নির্দয় খুনির ঠাণ্ডা চোখে ঘৃণা আর আক্রোশ ফুটে উঠতে দেখল।
দুহাতে গাড়ি চালাচ্ছে জিলি ও’ শওনেসি, পিস্তলটা এখনো এক হাতে ধরা চেম্বার খোলা, কিন্তু রিলোডিঙের সময় পায়নি। খাঁচায় বন্দী হিংস্র পশুর মতো মুখ ঝামটা দিল সে, উইন্ডশীল্ডের কাছে মাজল ঠেকিয়ে গুলি করল পিটার।
ঝাপসা হয়ে গেল সামনের দৃশ্য, অসংখ্য চিড় ধরে সাদা হয়ে গেছে কাঁচ। পরমুহূর্তে খসে পড়ল উইন্ডশীল্ডের ফ্রেম থেকে। চকচকে কাঁচের টুকরো ছড়িয়ে পড়ল অস্টিনের ভেতর।
দুহাতে মুখ ঢেকেছে জিলি ও’ শওনেসি, আঙুলের ফাঁক গলে হড়হড় করে বেরিয়ে আসছে উজ্জ্বল রক্ত, কয়েকটা ধারায় ঝরে পড়ছে কালো লোম ঢাকা বুকে।
এখনো ওপর দিকে পা আর নিচের দিকে মাথা নিয়ে ঝুলে আছে পিটার। বিধ্বস্ত উইন্ডস্ক্রীনের ভেতর ওয়ালথার ধরা হাতটা লম্বা করে দিল ও, মাজুল ঠেকাল জিলির গায়ে। বুকের ওপর, পাজরে গুলি করল, পর পর দুটো। এক্সপ্লোসিভ ভেলেক্স বুলেট হাড়ে ধাক্কা খেয়ে ভেঙে যাবে, শরীর থেকে বেরিয়ে আর কাউকে আহত করবে না। মেলিসার গলা নিস্তেজ হয়ে এলেও, পরিষ্কার শুনতে পেল পিটার। এখন আর কিছু বলার চেষ্টা করছে না, শুধুই গোঁ গোঁ করে গোঙ্গাছে। বুলেটের ধাক্কায় সীটের গায়ে হেলান দিল জিলি ও’ শওনেসি, মাথাটা এদিক-ওদিক দুলছে। ইঞ্জিনের আওয়াজ কমে যাবে বলে আশা করল পিটার, লাশের পা অ্যাকসিলারেটর থেকে নেমে আসার কথা।
কিন্তু তা ঘটল না। লাশটা সামনের দিকে নেমে গেছে, পা আরো চেপে বসেছে অ্যাকসিলারেটরে। ঢালু রাস্তা ধরে তীরবেগে ছুটছে অস্টিন, দুপাশে উঁচু পাথরে পাঁচিল থাকায় মনে হলো টানেলের ভেতর দিয়ে যাচ্ছে ওরা।
লক্ষ্যহীনভাবে এদিক-ওদিক ঘুরছিল হুইল, একটা হাত দিয়ে সেটা ধরে ফেলল পিটার। পাঁচিলের সাথে ধাক্কা খাওয়ার আশঙ্কা দূর হলো, কিন্তু গতি এখনো নিয়ন্ত্রণের বাইরে।
এভাবে পায়ের পাতা আর হাটুর ওপর বেশিক্ষণ ঝুলে থাকা সম্ভব নয়। উইন্ডস্ক্রীনে থেকে যাওয়া ভাঙা কাঁচে হাত ঠেকে রয়েছে। তীব্র টানা বাতাস প্রবল শক্তিতে গাড়ির মাথার সাথে চেপে রেখেছে শরীরটা। সময় মতো হুইল ঘোরাতে পারেনি পিটার, ডান দিকের পাঁচিলে ঘষা খেল গাড়ি। পিছন দিকে আগুনের ফুলকি দেখল পিটার, সেই সাথে কর্কশ আওয়াজে রী রী করে উঠল সারা শরীর। হুইল ঘুরিয়ে রাস্তার মাঝখানে আবার ফিরিয়ে আনল পিটার গাড়িটাকে। কিন্তু আবার হুইল ঘোরাবার আগেই বাঁ দিকের পাঁচিলের সাথে ঘষা খেল। হুইল থেকে ছিটকে পড়ল পিটারের হাত। ভাঙা কাঁচের ওপর হাতের চাপ লেগে কেটে গেল মাংস। পঁচিল ভেঙে খাদের কিনারায় চলে এল অস্টিনের নাক। পিটার আবার ধরার আগে নিজেই ঘুরতে শুরু করল হুইল, খাদের কিনারা আর ভাঙা পাচিলের ভেতর থেকে বেরিয়ে রাস্তায় ফিরে এল গাড়ি।
