আলোর জালে আটকা পড়ল নীল অস্টিন।
আরো নিচে নামল কপ্টার। টেলিগ্রাফ পোল আর গাছ দিয়ে ঘেরা সরু রাস্তার মাঝখানে ঢুকছে।
গাড়ির ছাদে র্যাক দেখল পিটার। বুদ্ধি খেলে গেল মাথায়। র্যাক থাকায় ঝুঁকিটা নেয়া যায়।
.
ব্যাক সীট থেকে ডাক্তারই প্রথম দেখল হেলিকপ্টারটাকে। বৃষ্টি আর বাতাসের শব্দে রোটরের আওয়াজ চাপা পড়ে ছিল, চেহারা গম্ভীর হলেও মনে মনে নিজের প্রশংসা করছিল জিলি ও’ শওনেসি। যোদ্ধা লোকগুলোকে হেলিকপ্টার থেকে নামার সুযোগ ইচ্ছে করে দিয়েছে সে, সবাই নেমে গেছে দেখে তারপর হেডলাইট জ্বেলে বেরিয়ে এসেছে গ্যারেজ থেকে। জানে, প্রকৃত পরিস্থিতি বুঝতে সময় লাগবে অ্যাসল্ট টিমের। প্রথমে আবিষ্কার করবে, বাড়ি খালি। হৈ-হাঙ্গামার মধ্যে সবাইকে এক জায়গায় জড়ো করা সহজ নয়। সবশেষে আবার হেলিকপ্টারে চড়ে খুঁজতে বেরুতে হবে। ততক্ষণে বহু দূরে সরে আসবে সে। ডাবলিনে তার একটা সেফ হাউস আছে–অন্তত এক সময় ছিল, চার বছর আগে। বলা যায় না, সেটার অস্তিত্ব হয়তো ফাঁস হয়ে গেছে এত দিনে। সেক্ষেত্রে ভিকটিম আর ডাক্তারকে ত্যাগ করবে সে। দুটো বুলেট খরচ করলেই ঝামেলা শেষ। তারপর অস্টিনটাকে আইরিশ সাগরে ফেলে দিলেই চলবে।
ব্যাক সীটে ব্যথায় গোঙাচ্ছে মেয়েটা, তার মাথাটা কোলে নিয়ে বসে আছে ডাক্তার। ঘাড় ফিরিয়ে একবার তাকাল জিলি ও’ শওনেসি, দৃশ্যটা দেখে হেসে উঠল সে। বাঁক নেয়ার সময় ঝোঁপের সাথে ঘষা খেল গাড়ি। স্টিয়ারিং ঘুরিয়ে গাড়ি সিধে করল ও।
ওরা আসছে, আর্তনাদ করে উঠল ডাক্তার।
রিয়্যারভিউ মিররে তাকাল জিলি ও’ শওনেসি, তারপর ঘাড় ফিরিয়ে পিছনের রাস্তায়। কিছুই দেখতে পেল না। কি বললে?
হেলিকপ্টার…।
পাশে জানালার কাঁচ নামাল জিলি ও’ শওনেসি, এক হাতে স্টিয়ারিং ধরে বাইরে মাথা বের করল। বীকন লাইটটা খুব কাছে আর গাড়ির সামান্য পিছনে দেখতে পেল সে। ঝট করে মাথা টেনে নিল ভেতরে। অফ করে দিল হেডলাইট।
গাঢ় অন্ধকারেও গাড়ির স্পীড কমাল না সে। এবার তার হাসির শব্দ বেপরোয়া আর উন্মত্ত শোনাল ডাক্তারের কানে।
তুমি পাগল হয়ে গেছ, ছটফট করে উঠল ডাক্তার। আমাদের সবাইকে খুন, করবে!
খুন করাই তো আমার পেশা, ডাক্তার জেমসন! আবার হাসল জিলি ও’ শওনেসি। তোমার যেমন মেয়েদের বোঝা নামানো। চোখে সয়ে আসছে অন্ধকার, শেষ মুহূর্তে দেখতে পেয়ে একটা পাথরে পাঁচিলকে এড়িয়ে যেতে পারল। বেল্ট থেকে পিস্তল বের করে পাশের সীটে রাখল সে। ওরা যদি ভেবে থাকে… উজ্জ্বল আলো ঘুসির মতো আঘাত করল তাকে, হেলিকপ্টারের ল্যান্ডিং লাইট জ্বলে উঠেছে। সামনের রাস্তা দিনের মতো আলোকিত। পরবর্তী বাঁক নেয়ার সময় কংক্রিটের সাথে ঘষা খেল চাকা।
থামো, দোহাই লাগে! মেলিসাকে দুহাতে জড়িয়ে রেখে আবেদন জানাল ডাক্তার। প্রতি মুহূর্তে আঁকি খাচ্ছে গাড়ি, ঘুমন্ত মেয়েটাকে ছেড়ে দিলে সীট থেকে পড়ে যাবে। ধরা দিলে বেঁচে যাব! তা না হলে মেরে ফেলবে ওরা…!
শুধু পাইলট, যারা মারতে পারে তারা কেউ নেই ওটায়, খেঁকিয়ে উঠল জিলি ও’ শওনেসি। ওরা আমাদের কিছুই করতে পারবে না!
ধরা দাও! কাঁদো কাঁদো গলায় বলল ডাক্তার। তোমার পায়ে পড়ি, এসো সবাই আমরা বাঁচি!
তিনটি বুলেট আছে–আমাদের তিনজনের জন্যে।
ছোঁ দিয়ে পিস্তলটা তুলে মাথা আর ডান কাধ জানালা দিয়ে বাইরে বের করে দিল জিলি ও’ শওনেসি, ঘাড় বাঁকা করে ওপর দিকে তাকাল। চোখ-ধাঁধানো আলো ছাড়া কিছুই দেখল না সে। সেই আলোর দিকেই গুলি ছুঁড়ল। রোটর আর বাতাসে শব্দে চাপা পড়ে গেল পিস্তলের আওয়াজ।
.
খোলা হ্যাচের কিনারায় দাঁড়িয়ে গোলাপি মাজ্ব ফ্ল্যাশ গুনল পিটার। পাঁচটা গুলি হলো, কিন্তু বুলেটের পাশ ঘেঁষে ছুটে যাবার আওয়াজ পেল না।
গেট লোয়ার! শুধু চিৎকার নয়, জরুরি ভঙ্গিতে হাত নেড়ে সঙ্কেতও দিল পিটার। ছুটন্ত অস্টিনের দিকে আরো খানিকটা নামল হেলিকপ্টার।
সাবধানে লাফ দেয়ার একটা ভঙ্গি নিল পিটার, রুদ্ধশ্বাসে অপেক্ষা করে থাকল সঠিক মুহূর্তটির জন্যে। তারপর যখন লাফ দিল মনে হলো হ্যাচওয়ে থেকে কেউ বোধ হয় ধাক্কা দিয়ে ফেলে দিয়েছে ওকে।
চার হাত-পা ছড়িয়ে পড়ল শূন্যে, পতনের সমাপ্তি ঘটার আগে পিটারের মনে হলো সময়ের হিসেবে ভুল হয়ে গেছে–অস্টিনের পিছনে রাস্তায় পড়বে সে। কিসের সাথে যেন ধাক্কা খেল অস্টিন, মুহূর্তের জন্যে মন্থর হলো গতি, ছাদের ওপর দড়াম করে পড়ল পিটার। অনুভব করল, শরীরের নিচে দেবে গেল ছাদ। গড়িয়ে কিনারার দিকে চলে এল, শরীরের বা দিকটা পুরোপুরি অসাড় হয়ে গেছে ছাদের সাথে বাড়ি খেয়ে। শুধু ডান হাত দিয়ে ছাদ হাতাড়াচ্ছে, নখ দিয়ে চেঁছে রঙ তুলে ফেলার জোগাড় করল ছাদের। কিন্তু কোনোভাবেই পিছলে যাওয়াটা থামানো গেল না। গাড়ির বাইরে শূন্যে ছটফট করছে পা দুটো।
রাস্তায় খসে পড়ার ঠিক আগের মুহূর্তে র্যাকের ফ্রেম আঙুল প্যাচাতে পারল পিটার, এক হাতের ওপর বাদুড়ের মতো ঝুলে থাকল গাড়ির কিনারায়। এক সেকেন্ডেরও কম সময়ের মধ্যে নিজেকে তুলে নিল, কিন্তু ড্রাইভার টের পেয়ে গেছে ছাদে লোক। সাথে সাথে নিষ্ঠুর কৌতুকে মেতে উঠল সে। ঘন ঘন হুইল ঘুরিয়ে গাড়িটাকে রাস্তার এদিক-ওদিক ফেরাতে লাগল সে, একদিক থেকে আরেক দিকে ছোটার সময় একপাশের চাকা রাস্তা ছেড়ে শূন্যে উঠে পড়ল। তীব্র, কর্কশ প্রতিবাদ জানাল চাকাগুলো, ছাদে ঘষা খেয়ে বারবার এদিক-ওদিক ছিটকে গেল পিটারের শরীর। ডান হাতের পেশি আর জয়েন্টে প্রচণ্ড টান পড়ল, মনে হলো বিচ্ছিন্ন হয়ে যাবে। তবে অসাড় হয়ে যাওয়া বাঁদিকটায় দ্রুত স্পর্শবোধ ফিরে আসছে।
