গেট আস ডাউন। ফর গডস সেক, গেট আস ডাউন, অনুরোধ করল পিটার।
এরকম ঝুঁকি নেয়া সম্ভব নয়। কোনো ধারণাই নেই কি আছে নিচে। ইন্সট্রুমেন্টের আলোয় পাইলটের চেহারা ফ্যাকাসে গোলাপি আর অসুস্থ দেখাল, চোখ দুটো যেন খুলির গায়ে গভীর গর্ত। মেঘের ওপরে উঠে ফিরে যাচ্ছি আমি…
হাতটা নিচের দিকে বাড়াল পিটার, আঙুলের ভেতর লাফ দিয়ে উঠে এল ওয়ালথারটা জ্যান্ত একটা প্রাণীর মতো। মনের অবস্থা উপলব্ধি করে নিজেই অবাক হয়ে গেল পিটার-পাইলটকে খুন করার মানসিক প্রস্তুতি রয়েছে ওর, তারপর কো পাইলটকে বাধ্য করবে ল্যান্ড করতে। ঠিক সেই মুহূর্তে মেঘের স্তরে একটা ফাঁক দেখা গেল, নিচের কালচে মাটির খানিকটা পরিষ্কার ধরা পড়ল চোখে।
নামো, নামো, নামো! উত্তেজনায় দাঁড়িয়ে পড়ল পিটার, সিলিংয়ে মাথা ঠুকে যেতে বসে পড়ল আবার। সরাসরি নিচের দিকে খসে পড়ার ভঙ্গিতে নামতে শুরু করল হেলিকপ্টার, হঠাৎ করেই বেরিয়ে এল মেঘের গ্রাস থেকে।
ওই তো নদী, চকচকে পানি দেখতে পেল পিটার। ব্রিজ, ব্রিজ!
চার্চের উঠান ওটা? ব্যগ্র কণ্ঠে ঘোষণা করল কলিন। আর ওই যে, ওই যে টার্গেট!
টালির ছাদ ধোয়ায় ঢাকা পড়ে যাচ্ছে, খোলা জানালা-দরজার দিয়ে ধোয়ার সাথে বেরিয়ে আসছে আগুনের গোলাপি শিখা। বাড়িটার দিকে ডাইভ দিল কপ্টার।
হামাগুড়ি দিয়ে কেবিনের দোরগোড়ায় গিয়ে দাঁড়াল কলিন। ডেল্টা! আমরা ডেল্টা কন্ডিশনে যাচ্ছি! ডেল্টা কন্ডিশন মানে কাজে বাধা পেলে দেখামাত্র শত্রুকে খুন করা যাবে। কলিনের ঘোষণা শেষ হতেই ফ্লাইট ইঞ্জিনিয়ার কেবিন হ্যাচের কাভার খুলে ফেলল, রোটরের বাড়ি খাওয়া বৃষ্টির মিহি ছাঁট ছোট ছোট মেঘের মতো ঢুকে পড়ল কেবিনের ভেতর।
থোর কমান্ডোরা দাঁড়িয়ে পড়েছে, খোলা হ্যাচের দুদিকে পজিশন নিচ্ছে তারা। কলিন রয়েছে সবার আগে, তার পজিশনের নাম পয়েন্ট।
কালচে মাটি ছুটে উঠে এল ওদের দিকে, থো করে চুরুট ফেলে দোরগোড়া আঁকড়ে ধরল কলিন। যা নড়বে তাই বাধা, গুলি করে সরিয়ে দেবে, নির্দেশ দিল সে। বাট ফর গডস সেক, ওয়াচআউট ফর দ্য গার্ল! লেটস গো, গ্যাং। লেটস গো!
জাম্প সীটে আটকে গেছে পিটার, পা ছাড়াতে গিয়ে মূল্যবান কয়েক সেকেন্ড নষ্ট করল, তবে উইন্ডস্ক্রীন দিয়ে সামনেটা পরিষ্কার দেখতে পাচ্ছে।
বাড়িটায় আগুন জ্বলছে দেখে বুকটা ধড়ফড় করতে লাগল ওর। জ্যান্ত পুড়িয়ে মারছে ওরা মেলিসাকে? উঠানটা অন্ধকার, মনে হলো কি যেন নড়ছে। ছুটে গেল একটা মানুষের আকৃতি, নাকি ভুল দেখল?
খোলা উঠানের দশ ফিট ওপরে ঝুলে থাকল হেলিকপ্টার, মৃদু দুলছে এদিক ওদিক। বাড়ির পিছন দিক এটা। কালো পোশাক পরা থোর কমান্ডোরা ঝুপ ঝুপ করে নামল, বাড়িটার জানালা দরজা দিয়ে পিলপিল করে ঢুকে পড়ল ভেতরে। ধোয়ার ভেতর হারিয়ে গেল ওরা।
সবশেষে নামছে পিটার। লাফ দেয়ার আগে কেন যেন খোলা হ্যাচের সামনে দাঁড়িয়ে চারদিকটা একবার দেখে নেয়ার ইচ্ছে হলো ওর। খানিক আগে সামনের উঠানে কিছু একটা নড়তে দেখেছিল, সম্ভবত সেটা ভোলেনি বলেই। তাকাবার সাথে সাথে পাথুরে পাঁচিলের মাঝখানে সরু রাস্তা উজ্জ্বল আলোয় আলোকিত হয়ে উঠল। কোনো গাড়ির হেডলাইট জ্বলে উঠেছে। অন্ধকার বাড়িটা থেকে সগর্জনে বেরিয়ে এল গাড়িটা।
খোলা হ্যাচের কিনারায় টলমল করতে লাগল শরীরটা, লাফ দিতে গিয়ে শেষ মুহূর্তে নিজেকে সামলে নিয়েছে পিটার। তাল সামলে নিয়ে দরজার ওপর হাত তুলে নাইলন লাইনটা খপ করে ধরে ফেলল। বাঁক নেয়ার জন্যের মন্থর হলো গাড়ির গতি, তারপর ব্রিজের দিকে ছুটল। ফ্লাইট ইঞ্জিনিয়ারের কাঁধ খামচে ধরে ঝাঁকি দিল পিটার, অপর হাতটা তুলে ধাবমান গাড়িটাকে দেখাল। লোকটার কান থেকে ওর ঠোঁট মাত্র দুইঞ্চি দূরে।
গলার রগ ফুলে উঠল পিটারের, পালাচ্ছে, থামাতে হবে!
মাইক্রোফোনে দ্রুত কথা বলল ফ্লাইট ইঞ্জিনিয়ার, সরাসরি পাইলটের সাথে। ইতস্তত না করে কপ্টার ঘুরিয়ে নিল পাইলট, বদলে গেল রোটরের আওয়াজ। তীরবেগে ব্রিজের দিকে ছুটল যান্ত্রিক ফড়িং।
সামনেটা দেখার জন্যে হ্যাচ ধরে ঝুলে থাকতে হলো পিটারকে, তীব্র বাতাস নির্মম কৌতুকে মেতে উঠল ওকে নিয়ে। হেডলাইট অনুসরণ করছে পাইলট। ব্রিজ পেরিয়ে আঁকাবাঁকা পথ ধরেছে গাড়ির ড্রাইভার, উপকূলের দিকে যাচ্ছে।
মাঝখানে দুশ গজ ব্যবধান, গাছের কালো মাথাগুলো যেন হ্যাচের সমান উঁচু, তীরবেগে ছুটে আসছে পিটারের দিকে। ব্যবধান নেমে এল, আর একশ গজ। হেডলাইটের আলোয় ঘন ঝোঁপ আর পাথুরে পাচিল আলোকিত হয়ে উঠল। এদিকে দুই খেতের মাঝখানে প্রায়ই একটা করে পাঁচিল দেখা যায়।
গাড়িটা ছোট, নীল রঙের। দক্ষ ড্রাইভার, বেপরোয়াভাবে চালিয়ে নিয়ে যাচ্ছে।
বীকন লাইট অফ করতে বল, নির্দেশ দিল পিটার, চায় না গাড়ির ড্রাইভার বুঝতে পারুক তাকে অনুসরণ করা হচ্ছে। কিন্তু ফ্লাইট ইঞ্জিনিয়ার মাউথপীস মুখে তুলতেই নিচের রাস্তা অন্ধকার হয়ে গেল। হেডলাইট অফ করে দিয়েছে ড্রাইভার।
আলোর পর গাঢ় অন্ধকারে সবকিছু ঢাকা পড়ে গেল। নিচে যেন গাড়ির কোনো অস্তিত্বই ছিল না।
হতাশায় ক্লান্তি বোধ করল পিটার। এই অন্ধকারে গাছের মাথা ছুঁয়ে উড়ে যাওয়া ভয়ানক বিপজ্জনক। কপ্টার ঝাঁকি খেল একবার, তারপর সিধে হলো। পর মুহূর্তে নিচের দিকে চোখ ধাঁধানো উজ্জ্বল আলোর বন্যা বয়ে গেল। ল্যান্ডিং লাইট জ্বেলেছে পাইলট, বুঝতে পারল পিটার। ফিউজিলাজের দুদিকে দুটো উৎস থেকে আলো পড়ল রাস্তায়, গাড়ির একটু সামনে।
