রেডি?
সাহায্য কর।
এয়ারব্যাগ মেঝেতে ফেলে জানালার সামনে গিয়ে দাঁড়াল জিলি ও’ শওনেসি। দিনের অবশিষ্ট আলো দ্রুত মিলিয়ে যাচ্ছে, মেঘগুলো এত কাছে মনে হলো যেন হাত বাড়ালেই ছোঁয়া যাবে। বনের ভেতর দৃষ্টি চলে, অন্ধকার হয়ে গেছে।
আমি একা ওকে বয়ে নিয়ে যাব কিভাবে! ঘ্যানঘ্যান করে উঠল ডাক্তার, ঝট করে তার দিকে ফিরল জিলি ও’ শওনেসি।
আবার ছোটা শুরু হলো। একটা দীর্ঘশ্বাস চাপল জিলি ও’ শওনেসি। পালিয়ে পালিয়ে যতদিন বেঁচে থাকা যায়। অদ্ভুত এবং রোমাঞ্চকর জীবন, কোনো কাজ না করে প্রচুর মালপানি কামানো যায় এই পেশায়। কিন্তু ভুল করলে তার খেসারত দিতে হয় জীবনের বিনিময়ে। এবার একসাথে অনেকগুলো ভুল হয়ে গেছে। সে নয়, আর কেউ দায়ী।
কি হলো, একটু ধরবে না?
একাই বিছানা থেকে মেলিসাকে কাঁধে তোলার চেষ্টা করেছিল ডাক্তার, পারেনি। ঘুমে অচেতন শরীরটা বিছানা থেকে ঝুলে আছে অর্ধেক।
সামনে থেকে সরো! হেঁড়ে গলায় ধমক লাগাল জিলি ও’ শওনেসি, ধাক্কা দিয়ে সরিয়ে দিল ডাক্তারকে। মেলিসার ওপর ঝুঁকে পড়ল সে।
মেলিসার চোখ বন্ধ, ভেতরে মণি দুটো একটু একটু নড়ছে। মুখ খোলা, কেঁপে উঠল ঠোঁট জোড়া। ফুলে ফুলে উঠল নাকের ফুটো। দয়া করে আমার ড্যাডিকে বল, আমি এখানে। বিড়বিড় করে বলল সে।
ইতোমধ্যে গ্যারেজে ঢুকে গাঢ় নীল অস্টিনের দরজা খুলে ফেলেছে ডাক্তার। কোথায় যাচ্ছি আমরা? ফাঁসফেঁসে গলায় জিজ্ঞেস করল সে।
গাড়িতে মেলিসাকে তুলে ড্রাইভিং সীটে বসল জিলি ও’ শওনেসি। এখনো ঠিক করিনি। উত্তরে একটা সেফ হাউস আছে, কিংবা সাগর পেরিয়ে ইংল্যান্ডেও চলে যেতে পারি…
কিন্তু আমরা যাচ্ছি কেন, এমন হুট করে?
উত্তর না দিয়ে আবার গাড়ি থেকে নামল জিলি ও’ শওনেসি। ওরা যে এখানে ছিল, তার কোনো চিহ্ন রাখা চলবে না। কিচেনে ঢুকে দরজা বন্ধ করল সে, বন্ধ দরজার গায়ে এলোপাতাড়ি লাথি মারতে শুরু করল। পুরানো কাঠ, ভেঙ্গে গেল কবাট। পাশের ঘর থেকে চেয়ার আর টেবিল নিয়ে এসে জড়ো করল এক জায়গায়। সেগুলোর ওপর খবরের কাগজ রাখল। তারপর আগুন ধরাল। বাকি দরজা আর জানালাগুলো খুলে দিল সে।
গ্যারেজের সামনে ফিরে এসে স্থিরভাবে কয়েক সেকেন্ড দাঁড়িয়ে থাকল জিলি ও’ শওনেসি। উপকূলের দিক থেকে কি রকম যেন একটা যান্ত্রিক আওয়াজ আসছে। হয়তো পাহাড়ি পথ বেয়ে কোনো ভারী ট্রাক যাচ্ছে। উৎ। বড় বেশি দ্রুত বাড়ছে শব্দটা। মনে হলো মেঘে মেঘে ছড়িয়ে পড়ছে যান্ত্রিক গুঞ্জন।
তারপর চিনতে পারল জিলি ও’ শওনেসি আওয়াজটা। রোটরের শব্দ। পরমুহূর্তে বিদ্যুৎ খেলে গেল তার শরীরে। পিস্তলটা বেরিয়ে এসেছে হাতে। ছুটল গাড়ির দিকে। ওহ ঈশ্বর! কেন? বহুদিন পর খোদার নাম নিল সে।
.
বৃথা চেষ্টা! ঘাড় বাঁকা করে পিটারের উদ্দেশে চিৎকার করল পাইলট, ফ্লাইট ইন্সট্রুমেন্ট থেকে চোখ সরায়নি। দ্বিতীয় কপ্টারটাকে হারিয়ে ফেলেছে ওরা। অন্ধ হয়ে গেছি, দেখতে পাচ্ছি না কিছু। জানালা আর উইন্ডস্ক্রীনের ঠিক বাইরে কিনারা উপচানো দুধের মতো ফুটছে মেঘ। মেঘের ওপরে উঠে এনিসকেরীর দিকে ফিরে যেতে হবে আমাকে। যে অবস্থায় আছি, যে কোনো মুহূর্তে নাম্বার টুর সাথে ধাক্কা লাগতে পারে।
সাত মিনিট হলো মেঘ ওদেরকে পুরোপুরি গ্রাস করেছে, তারও বেশ কমিনিট আগে হারিয়ে গেছে দ্বিতীয় কপ্টারটা। হারিয়ে গেছে মানে হয়তো আশপাশেই কোথাও আছে সেটা, কিন্তু মেঘের স্তর আর বৃষ্টির পর্দার জন্যে দেখতে পাচ্ছে না ওরা। কপ্টারের মাথায় বীকন লাইট দপদপ করছে, কোমল মেঘে প্রতিফলিত হচ্ছে আলো, কিন্তু দ্বিতীয় কপ্টারের পাইলট সময় থাকতে আলোটা দেখতে পাবে না।
আরেকটু দেখি। আর শুধু এক মিনিট, ইঞ্জিন আর রোটরের আওয়াজের সাথে পাল্লা দিয়ে গলা ফাটাল পিটার। ইট্রুমেন্ট প্যানেলের আলোয় ভূতের মতো দেখাল ওর চেহারা। গোটা অপারেশন ওর চোখের সামনে চুরমার হয়ে যাচ্ছে। জানে, যে কোনো মুহূর্তে মর্মান্তিক পরিণতির শিকার হতে পারে ওরা। কিন্তু তবু ওকে চেষ্টা চালিয়ে যেতে হবে। নিচে দুর্পাঁচ মাইলের মধ্যে কোথাও আছে প্রাণপ্রিয় মেয়ে। এত দূর এসে কিভাবে তাকে ফেলে যায় ও?
কোনো লাভ নেই, শুরু করল পাইলট, পরমুহূর্তে শিউরে উঠল সে, গলা থেকে আর্তনাদ বেরিয়ে এল, একই সাথে বিদ্যুৎ খেলে গেল দুহাতে। অকস্মাৎ কাত হলো হেলিকপ্টার, দ্রুত এক পাশে সরে যাবার সাথে সাথে লাফ দিয়ে ওপরেও উঠল খানিকটা–মনে হলো নিরেট কিছুর সাথে যেন ধাক্কা খেয়েছে ওরা।
মেঘের আড়াল থেকে বেরিয়ে ওদের দিকে লাফ দিয়েছিল চার্চের একটা মিনার। ফ্লাইট ডেকে ওরা যেখানে হুমড়ি খেয়ে পড়ে আছে সেখান থেকে মাত্র কয়েক ফিট দূরে একঝলক দেখা গেল সেটাকে, সগর্জনে পাশ কাটাল হেলিকপ্টার। দেখা দিয়েই চোখের পলকে পিছন দিকে অদৃশ্য হয়ে গেছে মিনারটা।
চার্চ! চার্চ! পাইলটের কাঁধ খামচে ধরল পিটার। পেয়েছি! ঘোরো!
কপ্টারের নিয়ন্ত্রণ ফিরে পাবার চেষ্টা করছে পাইলট, মেঘ, বাতাস, আর বৃষ্টির মধ্যে অন্ধের মতো কোথায় চলেছে ওরা কেউ জানে না। তার চিৎকার শুনতে পেল পিটার, ঘোরাতে গিয়ে মারা পড়ব নাকি! কিছুই তো দেখতে পাচ্ছি না!
রেডিও অলটিমিটার-একশ সত্তর ফিট, বলল কো-পাইলট। মাটি থেকে কপ্টারের এটাই সঠিক দূরত্ব, তবু নিচের দিকে কিছুই ওরা দেখতে পাচ্ছে না।
