ভালো, মাথা ঝাঁকিয়ে বলল কলিন। নদী বা রাস্তা ধরে যেতে পারব আমরা, ব্রিজ বা চার্চ পর্যন্ত-বাড়িটা ও-দুটোর মাঝখানে।
বাড়িটার ব্লো আপ নেই, ভেতরের কোনো প্ল্যান? থোর কমান্ডের একজন জানতে চাইল।
দুঃখিত, ভালো করে খুঁজে দেখার সময় পাইনি আমরা, ক্ষমাপ্রার্থনার ভঙ্গিতে বলল সার্ভেয়ার।
কমিনিট আগে লোকাল পুলিশ রেডিওতে আবার রিপোর্ট করেছে। উঁচু পাথরের পাচিল দিয়ে ঘেরা বাড়িটা, ভেতরে কাউকে দেখা যায়নি।
কি! প্রায় আঁতকে উঠল পিটার। কড়া নির্দেশ ছিল বাড়িটার কাছাকাছি যাওয়া চলবে না!
পাবলিক রোড দিয়ে মাত্র একবার গাড়ি চালিয়ে গেছে ওরা। ইন্সপেক্টরকে অপ্রতিভ দেখাল। জানার দরকার ছিল…
লোকটা যদি জিলি ও’ শওনেসি হয়, গাড়িটাকে একবার দেখেই যা বোঝার বুঝে নিয়েছে সে! পাথরের মতো স্থির হয়ে গেছে পিটার, চোখ দুটো রাগে জ্বলছে। কেউ যদি কোনো নির্দেশ মানে! পাইলটের দিকে তাকাল ও। হলুদ লাইফ জ্যাকেট, হেলমেট আর বিল্ট-ইন মাইক্রোফোনসহ ইয়ারফোন পরে আছে সে। তুমি আমাদের সরাসরি ওখানে নিয়ে যেতে পারবে?
সাথে সাথে উত্তর না দিয়ে জানালা দিয়ে বাইরে তাকাল পাইলট। মুষলধারে বৃষ্টি শুরু হয়েছে আবার। দশ মিনিটের মধ্যে অন্ধকার হয়ে যাবে। এখানে আমরা এয়ারপোর্ট ভি, ও. আর. বীকনের সাহায্যে পৌঁছুতে পেরেছি,—-তাকে সন্দিহান দেখাল। টার্গেট চেনে এমন কেউ থাকবে না। কপ্টারে…। ধেত্তেরি, ঠিক জানি না। এটুকু বলতে পারি, কাল সকালে প্রথম আলোয় আপনাদের আমি পৌঁছে দিতে পারব…
আজ রাতে, এখনই। পারবে?
লোকাল পুলিশ যদি টার্গেট দেখিয়ে দেয় তাহলে একবার চেষ্টা করে দেখতে পারি–টর্চ বা ফ্লেয়ার দরকার হবে।
আলোর ব্যবস্থা করা যাবে না, বলল পিটার। শত্রুরা টের পেয়ে যাবে।
কপ্টারের ভেতর নিস্তব্ধতা নেমে এল।
এখানে বসে দেরি করা মানে…. কথা শেষ না করে কাঁধ ঝাঁকাল পিটার। মনে কর মস্ত একটা ঝুঁকি নিতে হবে তোমাকে, নেবে কি? প্রায় আবেদনের সুরে কথা বলছে পিটার। একজন পাইলটকে তার ইচ্ছার বিরুদ্ধে বাধ্য করতে পারে না ও।
মাথা নিচু করে পাইলট বলল, এই আবহাওয়ায় ঢাল পেরোতে হবে, তাই না?
একবার চেষ্টা করে দেখ না, বলল পিটার। প্লিজ।
আরো পাঁচ সেকেন্ড ইতস্তত করল পাইলট। লেটস গো! আওয়াজটা হঠাৎ তার গলা থেকে বেরুতেই কমান্ডোদের মধ্যে ছুটোছুটি শুরু হয়ে গেল। দ্বিতীয় কপ্টারের লোকেরা লীডার কপ্টার থেকে বেরিয়ে গেল দ্রুত। তাদের পিছুপিছু নামল পুলিশ ইন্সপেক্টর আর সার্ভেয়ার।
.
বাতাসের প্রবল চাপ আর ঝাপটায় ইতস্তত করতে করতে এগোল হেলিকপ্টার। শক্ত কিছু হাতে যে যা পেয়েছে ধরে আছে, তবু গড়াগড়ি খাওয়া থেকে রেহাই পেল না। নিচে ঘর-বাড়ি, খেত-খামার, বনভূমি খুব কাছে মনে হলো, সবেগে পিছন দিকে ছুটছে কিন্তু দুর্যোগময় কালো রাতে পরিষ্কারভাবে কিছুই দেখার উপায় নেই। গ্রাম্য এলাকার নির্জন পথে নিঃসঙ্গ একজোড়া হেডলাইটের আলোয় কোনো বাড়ির বারান্দা হয়তো একপলকের জন্যে আলোকিত হয়ে উঠল, পাইলট আন্দাজ করে নিল কোনো লোকবসতির ওপর দিয়ে যাচ্ছে তারা। মাঝেমধ্যে নিচেটা চকচকে লাগল, আন্দাজ করে নিতে হয় ওখানে কোনো খাল-বিল বা নদী আছে। নিকষ কালো অন্ধকারের বিস্তৃতি দেখে বুঝে নিতে হলো, জঙ্গলের ওপর দিয়ে যাচ্ছে তারা, কিংবা মাটি আর কপ্টারের মাঝখানে ঘন মেঘের স্তর রয়েছে।
মেঘের আড়াল থেকে যতবারই বেরুল ওরা, দিনের ক্ষীণ রশ্মি আরো একটু করে কম লাগল চোখে? এনিসকেরী এয়ারকন্ট্রোলের সাথে রেডিও যোগাযোগ রাখা দরকার, কপ্টারগুলো তাই খুব বেশি উঁচুতে উঠতে পারছে না। মাঝখানের দূরত্ব যত বাড়ছে ততই নিচে নামতে হলো। অন্ধকারে কোথায় কি আছে বোঝার উপায় নেই, মেঘ মনে করে ভেতরে ঢোকার সময় কোনো ঢালের গায়ে ধাক্কা খেলেও আশ্চর্য হবার কিছু নেই।
দুই পাইলটের মাঝখানের জাম্প সীটে বসে আছে পিটার, ওর পিছনে ঠাই করে নিয়েছে কলিন। সবাই ওরা নিঃশব্দে তাকিয়ে আছে সামনের দিকে। উত্তেজনায় টান হয়ে আছো পেশি, চার জোড়া চোখ উপকূলরেখা খুঁজছে।
তীর দেখা গেল, মাত্র পনেরো ফিট নিচে সাদা ফেনা টগবগ করে ফুটছে যেন। তীর রেখা ধরে দক্ষিণ দিকে কোর্স বদল করল পাইলট। কয়েক সেকেন্ড পরই উজ্জ্বল আলোর একটা মালা দেখা গেল।
উইকলো, বলল পাইলট, সে থামতেই কো-পাইলট নতুন দিকনির্দেশনা দিল। একটা চিহ্ন যখন পাওয়া গেছে, এবার সরাসরি লারাগের দিকে যেতে পারবে ওরা।
উপকূল থেকে অল্প দূরে রাস্তা, সেটাকে অনুসরণ করল ওরা।
চার মিনিট পর টার্গেট, পিটারের কানের কাছে চেঁচাল পাইলট, আঙুল দিয়ে খোঁচা মারার ভঙ্গিতে সামনের দিকটা দেখাল ওকে।
কোনো মন্তব্য না করে কুইক-রিলিজ হোলস্টার থেকে ওয়ালথারটা টেনে বের করল পিটার।
.
ছোট একটা এয়ারব্যাগে প্রয়োজনীয় জিনিসপত্র ভরে নিল জিলি ও’ শওনেসি। বিছানাসহ খাটটা সরিয়ে দেয়াল খানিকটা উন্মুক্ত করল সে, হার্ডবোর্ডের আবরণ এক টানে নামাতেই বেরিয়ে পড়ল গোপন একটা শেলফ।
শেলফে ছোট একটা প্লাস্টিকের মোড়ক রয়েছে, নতুন পাসপোর্ট আর প্রয়োজনীয় কাগজপত্র আছে ওটায়। খলিফা এমনকি ভিকটিমের কাগজপত্রও জোগান দিয়েছে–হেলেন ব্যারি, তার মেয়ে। প্লাস্টিকের প্যাকেট খুলে কাগজগুলো পকেটে ভরল সে। প্যাকেটে পিস্তলের জন্যে অতিরিক্ত কিছু অ্যামুনিশন আর পনেরোশ পাউন্ড ট্রাভেলার্স চেক রয়েছে। সেগুলোও পকেটে চালান করল সে। তারপর বেরিয়ে এল কিচেনে।
