ওঁর অবস্থা দেখছ? মেলিসার দিকে তাকাল ডাক্তার। ওষুধের প্রভাবে অঘোরে ঘুমাচ্ছে সে। ইনফেকশন মারাত্মক হয়ে ওঠায় তার গায়ের রঙ বদলে গেছে। কাটা আঙুলের ক্ষতটা দগদগ করছে, ফুলে চাপা কলার মতো দেখাচ্ছে পাশেরটাকে। হাতটার অন্যান্য আঙুল সহ কনুই পর্যন্ত সবটুকু ফুলছে। পচন ধরতে আর বেশি দেরি নেই। রোগী কি রকম কষ্ট পাচ্ছে তা শুধু ডাক্তারই আন্দাজ করতে পারে। মরফিনের মাত্রা বাধ্য হয়ে বাড়াতে হয়েছে তাকে, তা না হলে ঘুম ভেঙে গিয়ে চেঁচামেচি শুরু করে দিত। এই অবস্থায় ওকে নড়ানো যাবে না।
তাহলে আর কি করা, নির্লিপ্ত ভঙ্গিতে বলল জিলি ও’ শওনেসি। ওকে এখানে রেখেই যেতে হবে। বেল্ট থেকে পিস্তলটা বের করল সে, তালুর ধাক্কায় হ্যাঁমার টেনে বিছানার দিকে এগোল।
খুন করবে? জিলির পথ আটকে দাঁড়াল ডাক্তার।
তাকে ধাক্কা দিয়ে সরিয়ে দিল জিলি ও’ শওনেসি, দেয়ালে গিয়ে বাড়ি খেল ডাক্তার।
তুমি ঠিকই বলছ। এ একটা বোঝাই বটে। মেলিসার কপালের পাশে পিস্তলের মাজুল ঠেকাল জিলি ও’ শওনেসি।
না! আর্তনাদ করে উঠল ডাক্তার। তোমার পায়ে পড়ি, মেরো না ওকে! নেব, আমি ওকে নিয়ে যাব!
অন্ধকার হবার সাথে সাথে বেরিয়ে পড়ব আমরা, পিছিয়ে এসে বলল জিলি ও’ শওনেসি। তৈরি থাকো।
.
নিচে আইরিশ সী যেন ক্ষতবিক্ষত সীসার পাত। লীডারের চেয়ে একটু পিছনে আর ওপরে রয়েছে দ্বিতীয় হেলিকপ্টারটা। সিরনারভো থেকে নতুন করে ফুয়েল নিয়েছে ওরা, ওয়েলশ কোস্ট ছাড়ার পর অনুকূল বাতাস থাকায় অল্প সময়ে অনেকটা পথ পেরিয়ে আসতে পেরেছে। তবু সময়ের আগে পৌঁছুনো সম্ভব হবে না, চারদিক কালো করে ঘনিয়ে আসছে অন্ধকার। কয়েক সেকেন্ড পরপরই হাতঘড়ি দেখছে পিটার।
খোলা সাগরের ওপর দিয়ে মাত্র নব্বই মাইল পেরোতে হবে, পিটারের কাছে মনে হলো গোটা আটলান্টিক পাড়ি দিচ্ছে ওরা। হোল্ডের এক প্রান্ত থেকে আরেক প্রান্ত পর্যন্ত লম্বা বেঞ্চটা, পিটারের পাশে বসে একমনে চুরুট টানছে কলিন নোবলস্, যদিও অনেক আগেই নিভে গেছে সেটা। থোর টিমের বাকি সবাই হাত পা ছড়িয়ে শুয়েবসে আছে, কেউ কেউ অস্ত্রগুলোকে ব্যবহার করছে বালিশ হিসেবে।
একা শুধু পিটারই অস্থির। জানালায় উঁকি দেয়ার জন্যে আবার একবার উঠল ও। অবশিষ্ট দিনের আলো পরীক্ষা করল, যাচাই করল দিগন্তরেখার কতটা ওপরে রয়েছে মেঘে ঢাকা সূর্য।
বেঞ্চে আবার ফিরে এল পিটার, কলিন সান্ত্বনা দিল ওকে, সব ঠিক হয়ে যাবে।
কলিন, আমাদের একটা সিদ্ধান্তে আসতে হবে। এই হামলায় প্রয়োরিটি কি হবে?
কিসের প্রয়োরিটি, স্যার? এই অপারেশনে একটাই অবজেক্ট–মেলিসাকে ছিনিয়ে নেয়া, নিরাপদে।
কিন্তু বন্দীদের ইন্টারোগেট করব না?
কাউকে বন্দী করতে চাওয়া মানে মেলিসার প্রাণের ওপর ঝুঁকি নেয়া। তার ক্ষতি করার কোনো সুযোগ কেন আমরা দেব শত্রুদের? টার্গেট এরিয়ার ভেতর কিছু নড়তে দেখলেই গুলি করে উড়িয়ে দেব।
এক সেকেন্ড চিন্তা করে মাথা ঝাঁকাল পিটার। ওখানে অবশ্য চুনোপুঁটি ছাড়া নেই কেউ, ইন্টারোগেট করলেও পালের গোদার সাথে কোনো যোগাযোগ বের করা যাবে না। কিন্তু ডক্টর পার্কারকে জবাব দেবে কিভাবে তুমি? কাউকে বন্দী করা হয়নি শুনে রেগে যাবে না?
ডক্টর পার্কার? ঠোঁটের কোণ থেকে চুরুট নামাল কলিন। কই, নামটা শুনেছি বলে তো মনে পড়ছে না। এখানে সিদ্ধান্ত নেয় চাচা কলিন। ঠোঁট টিপে হাসল সে। এই সময় কেবিনে ঢুকে চিৎকার করে উঠল ফ্লাইট ইঞ্জিনিয়ার।
সামনে আইরিশ কোস্ট-সাত মিনিটের মধ্যে আমরা এনিসকেরীতে নামছি, স্যার।
.
এয়ার ট্রাফিক কন্ট্রোল এনিসকেরী এয়ারপোর্টে জরুরি অবস্থা ঘোষণা করেছে। ল্যান্ড করার জন্যে পৌঁছে গেছে তিনটে প্লেন, পাইলটদের নির্দেশ দেয়া হলো। সার্কিট অলটিচ্যুডের কিছুটা ওপরে উঠে গিয়ে অপেক্ষা কর। যে কোনো মুহূর্তে পৌঁছে যাবে রয়্যাল এয়ারফোর্সের একজোড়া হেলিকপ্টার, সাথে সাথে ল্যান্ড করার সুযোগ দিতে হবে ওগুলোকে।
মেঘের ভেতর থেকে অকস্মাৎ বেরিয়ে এল কপ্টার দুটো। সাবলীল ভঙ্গিতে হ্যাঙ্গার অ্যানে নামল। সাথে সাথে দুই হ্যাঙ্গারের মাঝখান থেকে ছুটল একটা পুলিশ কার। রোটরের ব্লেড তখনো পুরোপুরি থামেনি, লীডার কপ্টারের পাশে ঘ্যাঁচ করে থামল কার। আইরিশ পুলিশের একজন অফিসার আর সার্ভেয়ার জেনারেলের একজন প্রতিনিধি নামল টারমাকে।
জেনারেল স্ট্রাইড, নিজের পরিচয় দিল পিটার। থোর কমান্ডের ড্রেস পরে রয়েছে ও–একপ্রস্থ কাপড়ে তৈরি কালো স্যুট, সফট বুট। উরুর কাছে ওয়েরিং বেল্টে রয়েছে পিস্তলটা।
জেনারেল, কনফার্ম খবর পাওয়া গেছে, হ্যান্ডশেক করার সময় বলল পুলিশ ইন্সপেক্টর। ফটো দেখে গ্রামবাসীরা জিলি ও’ শওনেসিকে চিনতে পেরেছে। কোনো সন্দেহ নেই গ্রামে ঠাই নিয়েছে জিলি ও’ শওনেসি।
গ্রামের কোথায়?
কিনারায়, স্যার। পোড়ো একটা বাড়িতে। চশমা পরা সার্ভেয়ারকে কাছে ডাকল ইন্সপেক্টর। ফাইলটা বুকের সাথে চেপে ধরে আছে সার্ভেয়ার হেলিকপ্টারের খোলা কোনো চার্ট টেবিল নেই, সার্ভে ম্যাপ আর ফটোগ্রাফগুলো ডেকের ওপর মেলা হলো।
দ্বিতীয় হেলিকপ্টার থেকে ডেকে নেয়া হলো অন্যান্যদের। বিশজন কমান্ডো হুমড়ি খেয়ে পড়ল ম্যাপ আর ফটোর ওপর। এই যে, এখানে বিল্ডিংটা। নীল পেন্সিল দিয়ে ম্যাপের একজায়গায় ছোট একটা বৃত্ত আঁকল সার্ভেয়ার।
