বিপদের কোনো লক্ষণ দেখা যাচ্ছে না। কিন্তু খুঁতখুঁতে ভাবটা থেকেই যাচ্ছে। কয়েক পা হেঁটে একটা লোহার গেট টপকে আরেক বাগানে ঢুকল সে, ঝোঁপের ভেতরে দিয়ে এক কোণে চলে এল, তারপর উঁকি দিয়ে নিচু পাঁচিলের ওদিকে তাকাল। এখানটায় বাঁক নিয়েছে রাস্তা, বহুদূর পর্যন্ত নির্জন, তারপর সব ঝাপসা।
কেন মনে হচ্ছে বিপদ বেশি দূরে নয়?
সমস্ত ঘটনা এক এক করে স্মরণ করল জিলি ও’ শওনেসি। খলিফার কাছে একটামাত্র পার্সেল পাঠিয়েছে, সে বোতলে ভরা লোকটার আঙুল। টেলিফোন করেছে দুবার।
বোতলটা পাঠানো হয় মেয়েটাকে কিডন্যাপ করার দুঘণ্টা পর, ওষুধের প্রভাবে মেয়েটা তখন অঘোরে ঘুমাচ্ছে। ডাক্তার, মি. ওয়াইন নাম দিয়েছে সে, লাল একটা পুরানো ফোর্ড ডেলিভারি ভ্যানে বসে কাজটা সারে। ভ্যানটা নিয়ে কেমব্রিজ রেলওয়ে স্টেশনের বাইরে অপেক্ষা করছিল ওরা, মেয়েটাকে নিয়ে একটা স্যালুন এল। তখন সন্ধে লাগছে, রাস্তার ধারের একটা কফি শপের পার্কিং লটে ছিল ওরা। ডাক্তারের সাথে যন্ত্রপাতি আর ঘুমের ওষুধ ছিল, কিন্তু অন্যান্য ওষুধ কিছু ছিল না। মাতাল ডাক্তারের হাত কাঁপছিল, কাজটা ভালোভাবে সারতে পারেনি। ভরপেট মদ খাওয়া অবস্থায় ছিল সে, তার ওপর পিস্তলের মুখে কাজটা করানো হয়। টাকার লোভ দেখিয়েও প্রথমে আঙুল কাটতে রাজি করানো যায়নি ব্যাটাকে। অবশ্য আঙুল কাটার পর রোগীকে ছেড়ে পালাবার কোনো লক্ষণ তার মধ্যে দেখা যায়নি। কাটা অংশে ইনফেকশন দেখা দিয়েছে।
একটা পিকআপে কারে বোতলটা পৌঁছে দিয়ে আসে জিলি ও’ শওনেসি। ঠিক জায়গাতেই ছিল গাড়িটা, আগে থেকে ঠিক করা সঙ্কেত পেয়ে এগিয়ে যায় সে। পাশে ভ্যানটা দাঁড় করিয়ে বোতলটা ছুঁড়ে দেয় ভেতরে, তারপর সবেগে চলে আসে। সরাসরি আয়ারল্যান্ডের লারাগে।
লারাগে পৌঁছেই প্রথম ফোনটা করে সে। ইন্টারন্যাশনাল কল ছিল ওটা, আগেই নির্দেশ দেয়া ছিল তাকে, শুধু একটা বাক্য উচ্চারণ করতে হবে। আমরা নিরাপদে পৌঁছেছি।
এক সপ্তাহ পর ওই একই নম্বরে ডায়াল করে সে, সেবারও তাকে শুধু একটা বাক্য উচ্চারণ করতে হয়, সময়টা আমরা উপভোগ করছি।
জিলির মনে আছে, লোকাল এক্সচেঞ্জের অপারেটর মেয়েটা দুবারই তাকে পাল্টা ফোন করে জিজ্ঞেস করে, কলটা সন্তোষজনক হয়েছে কিনা। ইন্টারন্যাশনাল কলে কম কথাই বলে মানুষ, তাই বলে এত কম? সন্দেহ নেই হতভম্ব হয়ে পড়েছিল মেয়েটা।
চারদিকে সন্দেহের বীজ ছড়ানো হচ্ছে, বুঝতে পেরেছিল জিলি ও’ শওনেসি। এধরনের ভুল-ভাল করে বলেই তো পুলিশের হাতে ধরা পড়ে যায় অপরাধীরা। প্রতিবাদ করার ইচ্ছে থাকলেও সুযোগ ছিল না তার, খলিফাকে সে পাবে কোথায়? ইন্টারন্যাশনাল ফোন নম্বরটা ছাড়া তার সাথে যোগাযোগ করার আর কোনো মাধ্যম নেই।
গাছ থেকে নেমে গেটের পাশে দাঁড়াল জিলি ও’ শওনেসি, সিদ্ধান্ত নিল তৃতীয় ফোনটা চারদিন পর করার কথা থাকলেও করবে না সে। কিন্তু তারপরই তার মনে পড়ল, হাতটাও ডেলিভারি দেয়ার কথা চারদিন পর। সে ফোনে যোগাযোগ করলে তাকে জানানো হবে কোথায়, কিভাবে ডেলিভারি দিতে হবে হাতটা।
অস্বস্তি আরো বেড়ে গেল তার। এভাবে জেনেশুনে নিজেকে জালে জড়াবার কোনো মানে হয় না! হতে পারে টাকা অনেক বেশি, তাই বলে বোকার মতো ধরা পড়ার ঝুঁকি কেন নিতে যাবে সে! তার মনে হতে লাগল, গোটা ব্যাপারটার ভেতর গোপন কিছু একটা আছে, তাকে জানানো হয়নি।
তবে পঞ্চাশ হাজার পাউন্ড পাবার সাথে সাথে নিরাপদ জায়গায় সরিয়ে রেখেছে সে, ধরা পড়লেও সে টাকায় হাত দেয়ার সাধ্য কারও নেই। এমনকি খলিফাও এখন আর তার ওই টাকা কেড়ে নিতে পারবে না।
গেটের পাশ থেকে উঁকি দিয়ে আবার রাস্তায় তাকাল জিলি ও’ শওনেসি। চোখের কোণে কি যেন একটা নড়ে উঠতে শিরদাঁড়া বেয়ে শীতল একটা ঢেউ নেমে গেল।
প্রায় চারটে বাজে, কালচে খয়েরি আর ঠাণ্ডা সবুজাভ পাহাড়ে অন্ধকার নামছে। পাহাড়ের মাথায়, আঁকাবাঁকা রাস্তার ওপর ছারপোকা আকৃতির সচল কি যেন একটা দেখা গেল। ঢালু রাস্তা দিয়ে সবেগে নেমে আসছে ব্রিজের দিকে। তারপর চিনতে পারল জিলি ও’ শওনেসি। ছোট একটা সেলুন কার। একটু পর ঝোঁপের ভেতর হারিয়ে গেল সেটা।
ফোন কলগুলোর কথা ভেবে আবার উদ্বিগ্ন হয়ে উঠল সে, গাড়িটার ব্যাপার তেমন আগ্রহ নেই। ফোনগুলো করার কোনো প্রয়োজন ছিল কি? খলিফা কি কারণে এ ধরনের ঝুঁকি নিতে গেল?
ব্রিজ পেরিয়ে সোজা ছুটে এল গাড়িটা। কালো একটা অস্টিন। বৃষ্টির জন্যে আরোহীদের দেখা গেল না। হঠাৎ আবার শিরদাঁড়া খাড়া হয়ে গেল জিলির। গাড়ির গতি কমে গেছে। তারপর দাঁড়িয়ে পড়ল। দরজা খুলে বেরিয়ে এল দুজন লোক। ছুটতে ছুটতে মুদি দোকানে ঢুকল তারা।
পুলিশ!
বাগানের ভেতর দিয়ে ঝেড়ে দৌড় দিল জিলি ও’ শওনেসি। যতক্ষণ বিপদের আশঙ্কা ছিল উত্তেজনায় ছটফট করছিল সে, কিন্তু বিপদ এসে গেছে দেখে সম্পূর্ণ উভ্রান্ত হয়ে পড়ল। বাড়িতে ফিরে এসে কিচেনে কাউকে দেখল না, দড়াম করে পাশের ঘরের দরজার খুলে ভেতরে ঢুকল সে।
রোগীর সেবা করছে ডাক্তার, বিরক্ত হয়ে ঘুরে দাঁড়াল সে। তোমাকে না বলেছি ভেতরে ঢোকার আগে নক করবে?
ঝাঁঝটুকু গায়ে না মেখে জিলি ও’ শওনেসি বলল, আমরা পালাচ্ছি।
