একমনে খাচ্ছে জিলি ও’ শওনেসি, প্লেট থেকে মুখ তুলল না। সে ভাবছে, এরকম একটা দুর্বলচিত্তের লোককে কেন তার ঘাড়ে চাপানো হলো। মেয়েদের গর্ভপাত ঘটায়, আহত টেরোরিস্টদের চিকিৎসা করে, কিন্তু লোকটার মধ্যে ন্যায় অন্যায় বোধ আর বিবেক পুরোমাত্রায় রয়ে গেছে এখনো অন্তত কোনো কোনো ব্যাপারে। তার ওপর, নেশাখোর। মদ না পেলে এমনিতেই এই লোকের পাগল হবার কথা। সাবধান হওয়া দরকার, যে কোনো মুহূর্তে উদ্ভট কিছু একটা করে বসতে পারে ডাক্তার।
তার নিজের অবস্থাও বিশেষ সুবিধের নয়। গোটা ব্যাপারটা এত অগোছাল যেন মনে হয় একটা ষড়যন্ত্রের জালে ফেলা হয়েছে তাকে। ডাক্তার একটা উপদ্রব। লারাগের এই পোড়াবাড়িতে আশ্রয় নেয়াটা হাস্যকর রকম বোকামি। খেতে খেতেই চিন্তায় মাথাটা নুয়ে এল শওনেসির। গ্রাম থেকে বেরিয়ে যাবার একটাই মাত্র পথ, পালাতে হলে ওই পথ ধরেই যেতে হবে। কেন, এরকম একটা গ্রামে আসতে বলার কি দরকার ছিল? এক জায়গায় গাট হয়ে বসে না থেকে বারবার জায়গা বদল করা অনেক বেশি নিরাপদ, কিন্তু তা করতে নিষেধ করা হয়েছে কেন?
আর এই বৃষ্টি!
উচিত ছিল হাত, পা আর মাথা কেটে রেখে সংরক্ষণের ব্যবস্থা করা, তারপর দেহটা মাটির নিচে পুঁতে ফেলা। সেক্ষেত্রে ডাক্তারকে সঙ্গে রাখা দরকার হতো না।
তারপর ভাবল সে, আচ্ছা, এই খলিফা লোকটা কে?
মেক্সিকোয় ওরা তার সাথে যোগাযোগ করে। বলল, কাজটা খলিফার, বিশ হাজার পাউন্ড পুরস্কার। এমনভাবে বলল, খলিফা যেন এই দুনিয়ার হর্তা-কর্তা বিধাতা। কাজটা ও নেবে কিনা সেটা জানার জন্যে অপেক্ষা করেনি ওরা, তার আগেই ওর ছবিসহ পাসপোর্ট জোগাড় করে ফেলেছিল। প্রফেশনাল, কোনো সন্দেহ নেই। শুধু যে টাকার লোভে কাজটা নিয়েছে জিলি ও’ শওনেসি তা নয়, ভয়েরও একটা অবদান আছে। লোকগুলো তার মনে খলিফার ভয় ঢুকিয়ে দিয়েছিল। কে এই খলিফা?
খাওয়া শেষ করে সিগারেট ধরাল জিলি ও’ শওনেসি। নামটা কেমন যেন। দ্রু কুঁচকে জানালা দিয়ে বাইরে তাকিয়ে বৃষ্টি দেখতে দেখতে কেন যেন শিউরে উঠল সে। মারামারি কাটাকাটি করে অনেক বছর কাটাল সে, বিপদের গন্ধ আগে থেকেই পেয়ে যায়।
কাজটায় অনেক ত্রুটি রয়েছে, সেগুলোর পিছনে গুরুতর কারণ না থেকে পারে না। সুতি ক্যাপটা তুলে নিয়ে উঠে দাঁড়াল জিলি ও’ শওনেসি।
কোথায় যাচ্ছ শুনি? জিজ্ঞেস করল ডাক্তার।
একটু হেঁটে আসি।
তোমার ভাবসাব আমার ভালো লাগছে না। এত ঘন ঘন বাইরে যাবার কি দরকার?
জ্যাকেটের ভেতর থেকে পিস্তলটা বের করে চেক করল জিলি ও’ শওনেসি, তারপর গুঁজে রাখল আবার। তোমার কাজ সেবিকার ভান করা, তুমি তাই কর। পুরুষের কাজটা আমাকে করতে দাও। কামরা থেকে বেরিয়ে গেল সে।
.
বৃষ্টির মধ্যে আরোহীদের দেখা গেল না, ছোট একটা কালো অস্টিন এসে থামল গ্রামের একমাত্র মুদি দোকানের সামনে। রাস্তার দুপাশে জানালার পর্দাগুলো নড়ে উঠল, আরোহীদের নামতে দেখে গুঞ্জন শুরু হয়ে গেল ঘরে ঘরে। শীতকালীন নীল ইউনিফর্ম পরে আইরিশ পুলিশ বিভাগের দুজন লোক নামল, মাথার হ্যাঁটে হাত রেখে ছুটে ঢুকে পড়ল দোকানের ভেতর। গুড মর্নিং, মেইভ, ওল্ড লাভ, দোকানদারের কুমড়োমুখী বউকে বলল সার্জেন্ট।
ওয়েন ও নীল, আমি তোমাকে সাবধান করে দিয়ে বলতে চাই…, দোকানদারের বয়স্কা বউ হেসে কুটিকুটি হলো। ত্রিশ বছর আগে ওরা দুজন একজন প্রিস্টের সামনে দাঁড়িয়ে নিজেদের পাপ স্বীকার করেছিল, সেই থেকে বিচ্ছেদ, এবং পদস্থলনের ইতি। তা কি মনে করে আমাদের এই অজ পাড়াগাঁয়ে…?
তোমার হাসি, মেইভ, তোমার হাসি-মনে পড়লেই চলে আসতে হয়। তা নতুন কিছু ঘটল নাকি এদিকে? দু-একটা অচেনা মুখ চোখে পড়ে?
নতুন মুখ কোত্থেকে আসবে…ওহে, রসো-পোড়োবাড়িতে একজন উঠেছে বটে। একজন কি কজন তা বাপু বলতে পারব না…
একটা নোটবুক খুলে মেইভের সামনে ধরল সার্জেন্ট ও নীল, ভেতরে একটা ফটো রয়েছে। দেখ তো, ওল্ড লাভ, এই লোকটা কিনা।
কয়েক সেকেন্ড তাকিয়ে থাকার পর মাথা নাড়ল মেইভ। উঁহু। আমরা যাকে দেখেছি এ সে লোক নয়। মি. ব্যারির বয়স আরো বেশি, গোঁফ আছে, তবে গার্ল ফ্রেন্ডের বয়স বেশি হবে বলে মনে হয় না…
ছবিটা দশ বছর আগে তোলা।
দোকানদার তার বউয়ের পাশে এসে দাঁড়াল, ফটোটা দেখে কথা বলার জন্যে হাঁ করল সে। তার বউ তাকে থামিয়ে দিয়ে বলল, তুমি থামো! সার্জেন্ট ও নীল, কথাটা তোমার আগেই বলা উচিত ছিল। হ্যাঁ, তাহলে এটা মি, ব্যারির ছবি।
পোড়োবাড়ি বলছ? টেলিফোনটা ব্যবহার করতে পারি তো?
পুলিশী কাজে? জিজ্ঞেস করল দোকানদার। তাহলে তোমাকে পয়সা দিতে হবে।
তোমাকে আমি বলিনি, গোটা ব্যাপারটার মধ্যে একটা রসাল কেচ্ছা আছে? স্বামীকে বলল বুড়ি।
.
ঝমঝম বৃষ্টির মধ্যে কেউ কোথাও নেই, তবু বাগানের ভেতর দিয়ে পাথরে পাঁচিল ঘেঁষে শিকারি বিড়ালের মতো সন্তর্পণে এগোল জিলি ও’ শওনেসি। বাগানের একেবারে শেষপ্রান্তে এসে একটা আপেল গাছে চড়ল, পাঁচিলের ওদিকে রাস্তায় তাকাল।
বিশ মিনিট নড়ল না জিলি ও’ শওনেসি। রাস্তায় কোনো লোককে দেখেনি সে, কোনো জানালার পর্দাও নড়ছে না। গাছ থেকে পাঁচিলের মাথায়, সেখান থেকে রাস্তার ধারে নেমে পড়ল সে। তারপর রাস্তার দুদিকে তীক্ষ্ণ চোখে তাকাল।
