দ্রুতহাতে চুলে চিরুনি চালাতে শুরু করে দোকানদারের বউ বলল, যাই, পাশের বাড়ির নতুন বউটার সাথে একটু দেখা করে আসি। কোনো সন্দেহ নেই, এক ঘণ্টার মধ্যে খবরটা গোটা গ্রামে ছড়িয়ে পড়বে। শুধু মেয়েলি জিনিসই নয়, অ্যান্টিসেপটিক মলম আর ব্যান্ডেজ কিনেছে পোড়োবাড়ির লোকটা।
সরু একটা গলির শেষ মাথায় বাড়িটা, গলির দুপাশে বারো ফুট উঁচু পাঁচিল। বাড়ির সামনের পাঁচিলও বারো ফুট উঁচু, বাইরে থেকে ভেতরের কিছুই দেখা যায় না। দরজা পুরানো হলেও, তালাটা নতুন। সেটা খুলে ভেতরে ঢুকল ব্যারি। ভেতরে প্রথমে একটা একচালা, গ্যারেজ বলা যেতে পারে। গ্যারেজে গাঢ় নীল রঙের একটা অস্টিন রয়েছে, দুসপ্তাহ আগে বহু দূর এক শহর থেকে চুরি করা চুরি করার পর রঙ বদলানো হয়েছে গাড়িটার, বদলানো হয়েছে নম্বর প্লেট। রোজ দুবার করে স্টার্ট দেয় ব্যারি, দরকারের সময় ঠিকমতো কাজ করবে কিনা চেক করে রাখে। তার যা পেশা, এক সেকেন্ড এদিক-ওদিক হয়ে গেলে প্রাণ হারাতে হতে পারে। ইগনিশনে ঢুকিয়ে চাবি ঘোরাতেই স্টার্ট নিল অস্টিন। আধ মিনিট ধরে ইঞ্জিনের আওয়াজ শুনল সে, সন্তুষ্ট হয়ে মাথা ঝাঁকাল। স্টার্ট বন্ধ করার আগে অয়েল প্রেশার আর ফুয়েল গজও চেক করল। গাড়ি থেকে নেমে পিছনের দরজা দিয়ে বেরিয়ে এল কিচেনের সামনের উঠানে।
আগাছায় ভরে আছে উঠানটা, চারদিকে ব্যাঙের ছাতা। কিচেনে ঢুকে ক্যাপ আর ব্যাগ মেঝেতে নামিয়ে রাখল ব্যারি। একটা দেরাজ খুলে পিস্তলটা বের করল। ভালো মতো পরীক্ষা করে নিয়ে বেল্টে গুঁজে রাখল সেটা। পকেট ফুলে থাকবে বলে সাথে করে নিয়ে যায়নি বাইরে, ফলে এতক্ষণ অসহায় বোধ করছিল। গ্যাসের চুলো জ্বেলে তাতে কেটলি চাপাল সে। পাশের ঘর থেকে মাতালটার গলা ভেসে এল।
ফিরলে নাকি?
ব্যারি জবাব দিল না। দোরগোড়ায় এসে দাঁড়াল বিশালদেহী ডাক্তার, দুহাতে দরজার ফ্রেম ধরে থাকলেও একটু একটু দুলছে সে। লোকটার ফোলা ফোলা মুখ দেখেই বলে দেয়া যায়, নেশাখোর।
সব পেয়েছ?
ব্যাগটার দিকে হাত তুলল ব্যারি। যা পেয়েছি ওতে আছে, ডাক্তার।
খবরদার! রাগে ফেটে পড়ল মাতাল লোকটা। ওই নামে আমাকে ডাকবে না! অনেক দিন থেকে আমি আর ডাক্তার নই!
ডাক্তার নও? ঠোঁট-বাঁকা হাসি দেখা দিল ব্যারির মুখে। কিন্তু মেয়েরা যে বলে তুমি তাদের বোঝা নামাও?
দেখ, ভালো হবে না কিন্তু…! টলতে টলতে ঘুরে দাঁড়াল মাতাল লোকটা। হ্যাঁ, এককালে সত্যি খুব ভালো একজন ডাক্তারই সে ছিল বটে। কিন্তু এখন শুধু গর্ভপাতের জন্যে ডাকা হয় তাকে। কিংবা ফেরারী কোনো আসামী বন্দুক যুদ্ধে আহত হলে তার খোঁজ করা। মদের কারণে পসার, খ্যাতি, নিরাপত্তা, সবই হারাতে হয়েছে তাকে। কয়েক সেকেন্ড পর আবার দোরগোড়ায় ফিরে এল সে। উবু হয়ে বসে ব্যাগটা খুলল। তোমাকে না আমি অ্যাডেসিভ টেপ আনতে বলেছিলাম?
দোকানে নেই। ব্যান্ডেজ আর মলম এনেছি।
তা তো দেখতেই পাচ্ছি। অবাক চোখ তুলে তাকাল সে।
কিন্তু অ্যাচেসিভ টেপ ছাড়া তো…
ডাক্তারকে থামিয়ে দিয়ে ব্যারি, বলল, এবার থেকে তোমার যা দরকার তুমি নিজে গিয়ে নিয়ে আসবে, আমি এনে দিতে পারব না!
কি আশ্চর্য, আমি কি জানতাম আহত একজন লোকের চিকিৎসা করতে হবে!
কানের কাছে ফ্যাচফ্যাচ কোরো না তো! কাপে কফি ঢালল ব্যারি। পারলে ব্যান্ডেজ দিয়ে আঙুলটা বাঁধো, না পারলে যেমন আছে তেমনি থাক–পচে যাক আঙুল, আমার কি!
ঘরে ঢুকে আবার ফিরে এল ডাক্তার, হাতে রক্ত মাখা তুলো। মেয়েটার অবস্থা ভালো নয়, ব্যারি। ওর ওষুধ দরকার। অ্যান্টিবায়োটিক দরকার। মরফিন দিয়ে ঘুম পাড়িয়ে রাখছি বলে মনে কোরো না…
অ্যান্টিবায়োটিকের কথা ভুলে যাও।
পাশের ঘর থেকে অস্ফুট গোঙানির আওয়াজ ভেসে এল।
মেয়েটা মারা গেলে আমাকে দায়ী করতে পারবে না।
তুমিই দায়ী হবে।
হঠাৎ দাঁত বের করে হাসল ডাক্তার, চেহারায় কাঙালের মিনতি ফুটে উঠল। এবার দেবে নাকি? বেশি না, মাত্র দুটোক।
ঘড়ির ওপর চোখ বুলিয়ে মাথা নাড়ল ব্যারি। পরে।
বেসিনের সামনে দাঁড়িয়ে তুলোগুলো পানি দিয়ে ধুতে ধুতে মাথা নাড়ল ডাক্তার। হাতটা আমার দ্বারা কাটা সম্ভব বলে মনে হয় না। তার হাত কাঁপছে।
একটা আঙুল কেটেছি তাই যথেষ্ট। হাত-টাত কাটতে পারব না।
তোমার বাপ কাটবে, কর্কশ কণ্ঠে বলল ব্যারি। টাকা নিচ্ছ, কাজ করবে না কেন? আমি যা বলব তাই করতে হবে তোমাকে।
.
স্যার স্টিভেন স্ট্রাইড ঘোষণা করলেন, কিডন্যাপারদের সম্পর্কে কেউ কোনো গুরুত্বপূর্ণ তথ্য দিতে পারলে পঞ্চাশ হাজার পাউন্ড পুরস্কার দেয়া হবে। ঘোষণাটি টেলিভিশন, রেডিও আর খবরের কাগজে ব্যাপকভাবে প্রচার করা হলো।
টেলিফোন রিসিভ করার জন্যে দুজন লোক রাখা হয়েছিল স্কটল্যান্ড ইয়ার্ডে, সংখ্যা বাড়িয়ে চারজন করা হলো। অসংখ্য টেলিফোন কল আসছে, বেশিরভাগই ভুয়া বা ভিত্তিহীন খবর নিয়ে। এক বুড়ি মহিলা ফোন করে জানাল, মেলিসা জেইনকে সে তার ঘরে আটকে রেখেছে, ৫০ লাখ পাউন্ড দিলে স্কটল্যানড ইয়ার্ডের গেটে রেখে আসবে তাকে। মহিলা পাগল, রোজই একবার ফোন করে স্কটল্যান্ড ইয়ার্ডে, বছরের তিনশো পঁয়ষট্টি দিন। আরেক লোক জানাল, মেলিসা-জেইনকে কিডন্যাপাররা কোথায় রেখেছে সে জানে, কিন্তু তার ছেলেকে জামিনে খালাস দেয়া না হলে বলবে না। মুশকিল হলো, সবগুলো কল চেক করে দেখতে হচ্ছে।
