উইকলো পাহাড়ের নিচের ঢালে এই গ্রাম ডাবলিন থেকে মাত্র ত্রিশ মাইল দূরে। বড় শহরের এত কাছাকাছি আশ্রয় নেয়া উচিত হয়নি। কিন্তু সিদ্ধান্তটা তার নয়। এখানে লোকজন কম, যে কোনো আগন্তুককে সন্দেহের চোখে দেখা হয়। হয় শহরের ভেতর নাহয় শহর থেকে অনেক দূরে নির্জন কোনো এলাকায় থাকতে পারলে ভালো হতো। কিন্তু তাকে কোনো কথা বলার সুযোগ দেয়া হয়নি।
গ্রামে ওরা আসার পর আজ নিয়ে তিনবার বাইরে বেরুল সে। প্রতিবার জরুরি কোনো জিনিসের প্রয়োজন দেখা দেয়ায় বেরুতে হয়েছে। বুদ্ধি করে আগেই যদি জিনিসগুলোর ব্যবস্থা করে রাখা হতো তাহলে আর বেরুতে হতো না। এমন অব্যবস্থার শিকার হতে হবে জানলে কাজটা হয়তো নিত না সে। তবে হ্যাঁ, স্বীকার করতে হবে টাকাটা খুব বেশি। এত টাকা একসাথে দেখেনি সে। এই টাকায় সারাজীবন বসে খেতে পারা যায়। স্বপ্ন বলে মনে হয়–এক লাখ পাউন্ড! পঞ্চাশ হাজার অগ্রিম দেয়া হয়েছে, বাকি পঞ্চাশ হাজার পাবে কাজ শেষ হলে।
কিন্তু তবু কয়েকটা ব্যাপার মেনে নিতে মন চায় না। সহকারী একজন দরকার ছিল তা ঠিক, কিন্তু তাই বলে একজন বদ্ধ মাতালকে গছিয়ে দেয়ার কি দরকার ছিল! দায়িত্বটা তাকে দিলে সেইতো যোগ্য একটা লোক বেছে নিতে পারত।
অসন্তুষ্ট লোকটার মেজাজ তিরিক্ষি হয়ে আছে। কদিন ধরে থেমে থেমে বৃষ্টি হচ্ছিল, আজ একেবারে মুষলধারে শুরু হয়েছ। বাড়িটায় সেন্ট্রাল হিটিং থাকলেও সেটা তেলে চলে, এবং কাজ করছে না। ছোট একটা ফায়ার প্লেস আছে, কিন্তু কয়লা থেকে ধোঁয়া ওঠে। বাড়িটা সঁতসেঁতে, দেয়াল আর ছাদ থেকে পানি পড়ে। প্রতিটি কোণে মাকড়সার জাল। টিকটিকি, ইঁদুর, তেলেপোকা আর পিঁপড়েদের রাজত্ব। কে জানে, সাপও থাকতে পারে, গর্ত তো আর এক-আধটা নয়। সবচেয়ে বড় সমস্যা ঠাণ্ডা, আর সময় কাটানো। হাফ-বুড়ো একটা মাতালের সাথে কি কথা বলবে সে!
নিজের কাজে সে দক্ষ, আন্ডারগ্রাউন্ডে তার সুনামও আছে। কিন্তু কাজটা নেয়ার পর দেখা যাচ্ছে, চাকরের ভূমিকা দেয়া হয়েছে তাকে। কিছু কেনার জন্য মাতালটাকে বাইরে পাঠানো সম্ভব নয়, কাজেই বাধ্য হয়ে তাকেই বারবার বেরুতে হচ্ছে।
মুদি দোকানদার তাকে আসতে দেখল। চাপা গলায় বউকে ডাকল সে, অ্যাই, দেখে যাও, দেখে যাও, পোড়াবাড়ির লোকটা আবার আজ আসছে!
পিছনের দরজা ঠেলে দোকানে বেরিয়ে এল দোকানদারের কুমড়োমুখী চোখ জোড়া চকচক করছে কৌতূহলে। শহুরে লোক গ্রামে ঠাঁই নিয়েছে, তারপর আবার এই ঝড়-বৃষ্টির মধ্যে বাইরে না বেরিয়ে পারেনি। তুমি যাই বল, আমি কিন্তু একটা কেচ্ছার গন্ধ পাচ্ছি!
পোড়োবাড়ির নতুন বাসিন্দাদের সম্পর্কে এরই মধ্যে নানা রকম গুজব ছড়িয়ে পড়েছে, যদিও গ্রামবাসীরা এই একজনকে ছাড়া আর কাউকে দেখেনি এখনো। স্থানীয় এক্সচেঞ্জের টেলিফোন অপারেটর মেয়েটা প্রথম জানায়, পোড়োবাড়িতে একাধিক মানুষ আশ্রয় নিয়েছে। দেশের বাইরে টেলিফোন কল করা হয়েছে দুটো। পরবর্তী খবর পাওয়া গেল মিউনিসিপ্যালিটির ট্রাক ড্রাইভারের কাছ থেকে, ডাস্টবিন থেকে শুধু ক্যান পাওয়া গেছে। তার মানে পোড়োবাড়ির লোকেরা তাজা শাক সবজি বা মাংস খায় না, টিনজাত খাবার খেয়ে বেঁচে আছে। ডাস্টবিনে কিছু তুলো আর গজ পাওয়া গেছে, কারণটা অজ্ঞাত। কারও কারও ধারণা, বাড়িটায় অসুস্থ কোনো লোক আছে, বা হয়তো আহত হয়েছে কেউ।
আমার ধারণা, বাড়িটায় কোনো খারাপ কাজ হচ্ছে, কনুই দিয়ে স্বামীর পাঁজরে মৃদু গুঁতো দিয়ে বলল দোকানদারে বউ।
চুপ, চুপ! স্ত্রীকে সাবধান করল দোকানদার। বিপদ ডেকে আনতে চাও নাকি, আঁ?
দোকানে ঢুকে শহুরে লোকটা ক্যাপ খুলল, দরজার ফ্রেমে আছাড় মেরে পানি ঝাড়ল। ওদের দিকে ফিরে তীক্ষ্ণ চোখে তাকাল সে।
গুড মর্নিং, মি. ব্যারি। সব ভালো তো?
পোড়োবাড়ির ব্যারি জবাব না দিয়ে শুধু মাথা ঝাঁকাল। শেলফের ওপর চোখ বুলিয়ে দেখে নিচ্ছে কি কি আছে।
তা বইটা কত দূর লেখা হলো, স্যার? ব্যারি দুধওয়ালাকে জানিয়েছে, সে নাকি একটা বই লিখছে। অসম্ভব নয়, ভাবল দোকানদার। উইকলো পাহাড়ে সারা বছরই কিছু লেখক আসে লেখার কাজ শেষ করার জন্যে। এলাকাটা নিরিবিলি তো বটেই, তাছাড়া আয়ারল্যান্ড সরকার লেখক-শিল্পীদের ট্যাক্স কনসেশন দিয়ে থাকে।
একটু একটু করে লিখছি, বলে প্রসঙ্গটি এড়িয়ে গেল ব্যারি। কি কি লাগবে মুখস্থ করে এসেছে সে, দোকানদার জিনিসপত্র নামাতে শুরু করল শেলফ থেকে।
সবগুলো নামানো শেষ হলে খাতা পেন্সিল হাতে নিল দোকানদার, নাম আর দাম লিখবে। একটা জিনিস হাতে নিয়ে ব্যারির দিকে তাকাল সে চোখে প্রশ্ন। কিন্তু ব্যারি কোনো জবাব দিল না, বরং তার চেহারা কেমন যেন কঠোর হয়ে উঠল। তাড়াতাড়ি জিনিসটা নামিয়ে রেখে লেখা শেষ করল দোকানদার। যোগ করল সে, বলল, তিন পাউন্ড বিশ পেন্স।
দাম চুকিয়ে বেরিয়ে গেল ব্যারি। পিছন থেকে দোকানদার বলল, ঈশ্বর আপনার সহায় হোন, মি. ব্যারি। কিন্তু কোনো উত্তর পাওয়া গেল না।
স্বামীর পাজরে আবার গুতো মারল দোকানদারের বউ। কেমন বদমেজাজী, তাই না? নিশ্চয়ই কোনো মেয়েকে জোর করে আটকে রেখেছে বাড়িটায়।
হু, চিন্তিতভাবে মাথা নাড়ল দোকানদার। প্যাড, ব্রেসিয়ার, প্যান্টি–চিন্তারই কথা।
