পিটার, এই দুঃসময়ে প্রতিটি মুহূর্ত তোমার সাথে আমি। কেউ অভিযোগ না করলেও আমি জানি তোমার এই বিপদের জন্যে আমিই দায়ী। কল্পনাও করিনি হামলাটা ওরা তোমার মেয়ের ওপর করবে। আমি ব্যবস্থা করছি, এখন থেকে হানা দেবে থোর কমান্ড। তুমি জানো, যে কোনো সাহায্য চাইলেই আমার কাছ থেকে পাবে তুমি।
ধন্যবাদ, ডক্টর পার্কার। একটা অপরাধবোধ দুর্বল করে ফেলল পিটারকে। আজ থেকে দশ দিনের মধ্যে এই ভদ্রলোককে খুন করার কথা ওর। তা না হলে কিডন্যাপাররা মেরে ফেলবে মেলিসাকে।
ডক্টর পার্কারের প্রভাবে কাজ হলো সাথে সাথে। পুলিশ কমিশনারের মাধ্যমে নির্দেশটা ছয় ঘণ্টা পর ডাউনিং স্ট্রীট থেকে পৌঁছে গেল স্কটল্যান্ড ইয়ার্ডে। এরপর সন্দেহবশত কোথাও হানা দেয়ার দরকার হলে দায়িত্বটা নেবে থোর কমান্ড।
রয়্যাল এয়ারফোর্স থেকে একজোড়া হেলিকপ্টার দেয়া হয়েছে হোর কমান্ডকে, দুর্গম এবং বৈরী পরিস্থিতিতে অবরোধ ভেঙে ভেতরে ঢোকার ও প্রাণ বা মালপত্র নিয়ে বেরিয়ে আসার কঠিন ট্রেনিংয়ে সেগুলো ব্যবহার করছে থোরের অ্যাসল্ট ইউনিট। পিটারের সাথে কলিনও কাজ করছে ট্রেনার হিসেবে।
ট্রেনিংয়ের ফাঁকে দিনের বাকি সময়টা ঘেরাও করা পিস্তল রেঞ্জে কাটায় পিটার এবং ষষ্ঠ ইন্দ্রিয় সজাগ রেখে অপেক্ষা করে। কিন্তু এক এক করে পেরিয়ে যাচ্ছে দিনগুলো ফলস অ্যালার্ম আর বিপথু সূত্রের মধ্যে দিয়ে।
রোজ রাতে অল্প পরিমাণে হলেও হুইস্কি খেতে হয় পিটারকে, তা না হলে ঘুম আসে না। হাতে গ্লাস নিয়ে আয়নার সামনে দাঁড়ায় ও। দিনে দিনে বদলে যাচ্ছে চেহারা-ঝুলে পড়ছে মুখ, চোখের নিচে কালি, দৃষ্টিতে সন্ত্রস্ত ভাব।
ডেডলাইনের ছয় দিন বাকি, ব্রেকফাস্ট না করেই হোটেল কামরা থেকে বেরিয়ে এল পিটার। গ্রীন পার্কের কাছে টিউব ধরে নেমে এল ফিনসবারি পার্কের কাছে। স্টেশনের কাছাকাছি একটা দোকান থেকে বিশ পাউন্ড অ্যামোনিয়াম নাইট্রেট গার্ডেন ফার্টিলাইজার কিনল। ডরচেস্টারে নিজের কামরায় ফিরে এসে প্লাস্টিক ব্যাগে ভরা নাইট্রেট সুটকেসে রেখে তালা দিল, সুইকেসটা রাখল ক্লজিটের ভেতর ট্রেঞ্চ কোটের পিছনে।
সে রাতে ব্যারনেস ম্যাগডার সাথে আবার কথা হলো পিটারের। আগের মতোই লন্ডনে পিটারের পাশে আসার অনুমতি চাইল সে।
আমি কি তোমার কোনো সাহায্যেই আসব না? সাহায্যে না আসি, তোমার পাশে দাঁড়াবার অধিকারটুকুও কি নেই আমার? শুধু তোমার হাত দুটো ধরার সুযোগ পেলেও মনে হবে তোমাকে একটু সান্ত্বনা দিতে পারলাম…
না, ম্যাগডা। ও ধরনের ছেলেমানুষি করার পর্যায় আমরা পেরিয়ে এসেছি। গলার সুরটা যে নিষ্ঠুর আর কর্কশ পিটার নিজেও তা টের পেল। জানে, সংযমের শেষ কিনারায় পৌঁছে গেছে, যে কোনো মুহূর্তে বিস্ফারিত হতে পারে। তোমার উৎস থেকে তুমি কিছু জানতে পেরেছ কিনা বল?
দুঃখিত, পিটার। কিছু জানা যাচ্ছে না, একদম কিচ্ছু না। তবে আমার লোকেরা চেষ্টার কোনো ত্রুটি করছে না…।
মাথায় স্ক্রু লাগানো একটি কন্টেইনারে করে পাঁচ লিটার ডিজেল কিনে আনল পিটার। বাথরুমে বসে নাইট্রেট আর ডিজেল নিয়ে কাজ করতে বসল। এক সময় তৈরি হয়ে গেল একুশ পাউন্ড হাই এক্সপ্লোসিভ। কন্টেইনারটাই বোমা হয়ে গেল, মুখে থাকল একটা ফ্ল্যাশলাইট বালব। পুরো একটা সুইট ধ্বংস করবে এই বোমা, স্যুইটে কেউ থাকলে তার বাঁচার কোনো উপায় নেই।
মনে মনে একটা হোটেলও বেছে রেখেছে পিটার। হোটেল ডরচেস্টার। আগেই একটা স্যুইট ভাড়া করে রাখবে ও। খলিফা সম্পর্কে জরুরি একটা তথ্য আছে, এই কথা বলে ডক্টর পার্কারকে ডরচেস্টারে আনানো সম্ভব। বলবে, তথ্যটা এতই গুরুত্বপূর্ণ যে সাক্ষাতে এবং গোপনে দিতে হবে।
সে রাতে ঘুমাতে যাবার আগে আয়নায় নিজের চেহারা দেখে চমকে উঠল পিটার। মনে হলো দুরারোগ্য কোনো ব্যাধিতে ভুগছে লোকটা। হুইস্কির বোতলটা। শেষ করল পিটার। এতে করে যদি ঘুমানো সম্ভব হয়।
.
আইরিশ সী থেকে তীরের তীক্ষ্ণতা নিয়ে ছুটে আসছে হিম বাতাস, বাতাসের আগে আগে উইকলো পাহাড় শ্রেণির ওপর দিয়ে ছুটছে সীসা রঙের মেঘমালা।
মেঘের স্তরে কোথাও কোথাও ফাঁক দেখা গেল, সেই ফাঁক গলে প্রায় নিপ্রভ সূর্যের মান আলো পড়ল সবুজ গাছপালা ঢাকা ঢালগুলোয়। তারপরই শুরু হলো বৃষ্টি।
দুর্যোগ মাথায় করে গ্রামের নির্জন পথে বেরিয়ে এল একটা লোক।
ট্যুরিস্টরা এখনো আসতে শুরু না করলেও তাদের স্বাগত জানানোর জন্যে রাস্তার দুপাশে বাড়িগুলোর ফটকে রঙচঙে সাইনবোর্ড টাঙানো হয়েছে—ব্ল্যাক ইজ বিউটিফুল, ড্রিঙ্ক গিনিস।
রাস্তার ডান পাশে পাব, সেটাকে ছাড়িয়ে এগিয়ে চলল লোকটা। তার পরনে টকটকে লাল কোট, দৃষ্টিতে পীড়া দেয়। গ্রামটাকে দুভাগে ভাগ করেছে ব্রিজটা, মাথা নিচু করে সেটা পেরোল সে। ব্রিজের গায়ে বড় বড় হরফে শ্লোগান লেখা। রয়েছে, সাম্রাজ্যবাদী ব্রিটিশরা নিপাত যাক। ব্রিজের নিচে খরস্রোতা নদী তুমুল বেগে ছুটে চলেছে সাগরের দিকে। চওড়া কার্নিস সহ সুতি ক্যাপ লোকটার মাথায়, প্রায় ঢেকে রেখেছে চোখ দুটোকে। চোরাচোখে এদিক ওদিক তাকাচ্ছে সে। পায়ে গোড়ালি ঢাকা বুট, কিন্তু হাঁটছে বিড়ালের মতো সতর্কতার সাথে। গ্রামে মাত্র দুএকটা বাড়ি দোতলা বা তিনতলা, বৃষ্টি আর বাতাসের মধ্যে পরিত্যক্ত বলে মনে হলো। কিন্তু তার জানা আছে, পর্দা ঘেরা জানালা দিয়ে নজর রাখা হচ্ছে তার ওপর।
