ভাবো, পিটার!
খলিফা তাহলে এভাবে কাজ করে। নিজে কখনো আত্মপ্রকাশ করে না। দক্ষ, প্রফেশনাল লোকদের দিয়ে কাজ করায়। লোকগুলো বেশিরভাগ ফ্যানাটিক, ইনগ্রিডের মতো। ট্রেনিং পাওয়া খুনি, লা পিয়েরে বেনিতের নদীতে যাকে মারা হয়েছে ও তার মতো।
পুরানো একটা কথা আছে, তাতে পিটারের বিশ্বাস ছিল না। কথাটা হলো সব মানুষেরই একটা মূল্য আছে। নিজেকে আর সবার চেয়ে আলাদা ভাবত ও। এখন জানে, তা নয়। এই নতুন উপলব্ধি অসুস্থ করে তুলল ওকে।
খলিফা ওর, পিটার স্ট্রাইডের, মূল্য জেনে গেছে। মেলিসা, ওর মেয়ে!
নিজের অজ্ঞাতেই কাগজটা মুঠোর ভেতর দলা পাকিয়ে ফেলল পিটার। সামনে রাস্তা দেখতে পেল, যে পথে নিয়তি ওকে টেনে নিয়ে যাবে। মনের চোখে দেখতে পেল, ইতোমধ্যেই রাস্তাটায় প্রথম পা ফেলা হয়ে গেছে তার। জোহানেসবার্গ এয়ারপোর্টের টার্মিনাল ভবনে ইনগ্রিডকে মেরে ফেলে এই প্রথম পদক্ষেপটা নিয়েছে সে।
রাস্তাটা ওকে খলিফা দেখিয়েছে। খলিফাই ওকে সেই রাস্তা ধরে সামনে টেনে নিয়ে যাবে।
অকস্মাৎ যেন দিব্য দৃষ্টিতে দেখতে পেল পিটার, ডক্টর পার্কার প্রাণ হারালেই ওর পথ চলা ফুরাবে না। খলিফার ফাঁদে একবার পা দিলে চিরকালের জন্যে বাঁধা পড়ে যাবে ও। কিংবা দুজনের একজন, পিটার বা খলিফা, পুরোপুরি ধ্বংস হয়ে যাবে।
আবার বোতলটা তুলে নিল পিটার।
হ্যাঁ, মেলিসা হলো পিটারের মূল্য। সঠিক মূল্যই নির্ধারণ করেছে খলিফা। মেলিসার বদলে অন্য কেউ হলে পিটার বোধ হয় তার দেখানো পথে বেরুতে না।
কাগজটা পুড়িয়ে ফেলল পিটার। কাপড়চোপড় না ছেড়ে জানালার সামনে সোফায় বসে পড়ল ধপাস করে, গা এলিয়ে দিয়ে চোখ বুজল। এতক্ষণে বুঝতে পারল কি রকম ক্লান্ত হয়ে পড়েছে। ঊরুর নার্ভগুলো থরথর করে কাঁপছে।
ডক্টর পার্কারের কথা ভাবল পিটার। এ ধরনের একটা মানুষ মানবসভ্যতাকে অঢেল দিতে পারেন, মানবকল্যাণে অপরিসীম অবদান রাখতে পারেন। আমি কি করব জানি না, কিংবা জানি কিন্তু স্বীকার করছি না। যদি ঠিক করি মেলিসার জন্যে অন্যায় কাজ করব, তাহলে ব্যাপারটাকে এমনভাবে সাজাতে হবে যাতে মনে হয় খুন করার চেষ্টা করা হয়েছিল আমাকে, ডক্টর পার্কারকে নয়। ঘটনাচক্রে মারা গেছেন তিনি। গুলিটা আমাকে না লেগে, লেগেছে তাকে।
বোমা হলে ভালো হয়, ভাবল পিটার। বোমার প্রতি একটা ঘৃণা আছে ওর মনে। বোমা যেন বিবেকহীন ভায়োলেন্সের প্রতীক। বোমা ছাড়া উপায় নেই। গুলির মতো সরাসরি ছুঁড়তে হয় না।
শেষপর্যন্ত খলিফারই জিত হলো। পিটার জানে, খলিফার মতো লোক মেলিসার সন্ধান পাবার কোনো সুযোগ রাখেনি।
সারারাত দুচোখের পাতা এক করতে পারল না পিটার। ভোরের আলো ফোঁটার পর হকচকিয়ে গেল ও। এখনো প্ল্যান করছে, কিভাবে খুন করা যায় ডক্টর পার্কারকে।
.
ব্যাপারটা মাথায় ঢুকছে না! ভ্রু কুঁচকে বিস্ময় প্রকাশ করল ইন্সপেক্টর রিচার্ডস। এখনো ওরা মুক্তিপণ চেয়ে যোগাযোগ করছে না কেন! আজ পাঁচ দিন, তাই না?
অথচ ওরা জানে কোথায় পাওয়া যাবে পিটারকে। দামি ডাচ চুরুট ধরাল কলিন নোবলস, তারপর অসহায় ভঙ্গিতে কাঁধ ঝাঁকিয়ে বেরিয়ে গেল কামরা থেকে।
বি.বি.সি. টিভি থেকে কিডন্যাপারদের উদ্দেশে একটা আবেদন প্রচার করেছে পিটার, ওর মেয়ে মেলিসাকে যেন আর নির্যাতন করা না হয়। জনসাধারণকেও সহযোগিতা করার আহ্বান জানানো হয়েছে, মেলিসা-জেইনকে উদ্ধার করার সহায়ক যে কোনো তথ্য সরাসরি যেন স্ট্রাইড পিটারের নামে স্কটল্যান্ড ইয়ার্ডে পাঠিয়ে দেয়া হয়। একজন কিডন্যাপারের পুলিশ আইডেনটিকিট পোর্টরেট-ও দেখানো হয়েছে দর্শকদের। মেরুন রঙের একটা স্যালুনে মেলিসাকে তোলা হয়। প্রত্যক্ষদর্শীর বিবরণ থেকে ড্রাইভারের ছবিটা তৈরি করে পুলিশ বিভাগের শিল্পী।
সাধারণ মানুষের কাছ থেকে বিপুল সাড়া পাওয়া গেল। চব্বিশ ঘণ্টা বাজতে লাগল টেলিফোনগুলো। উৎসাহের সাথে তৎপর হয়ে উঠল স্কটল্যান্ড ইয়ার্ড পুলিশ। মেলিসা-জেইনের সাথে চেহারার মিল আছে এই খবর পেয়ে বিভিন্ন জায়গায় হানা দিল তারা। কিন্তু হানা দেয়ার পর জানা গেল, লোকটা মেক্সিকান, বউকে খুন করে ইংল্যান্ডে পালিয়ে এসেছে, ড্রাগ খেয়ে লুকিয়ে আছে হোটেলে। তার সঙ্গিনীর সঙ্গে মেলিসার মিল আছে বটে।
আরেক হোটেলে হানা দিয়ে চৌদ্দ বছরের একটা কিশোরীকে পাওয়া গেল তেত্রিশ বছরের এক লোকের সাথে বিছানায়।
মেরুন স্যালুনের ড্রাইভারের সাথে এক লোকের চেহারার মিল আছে, এই খবর পেয়ে উত্তর স্কটল্যান্ডের একটা পরিত্যক্ত বাড়ি ঘেরাও করা হলো। পরে জানা গেল, লোকটা বাড়িতে এল.এস.ডি. তৈরি করে। চারজন খদ্দের সহ গ্রেফতার করা হলো তাকে। তার এক সহকারীর চেহারা অনেকটা মেলিসার মতো বটে!
সবগুলো ফলস অ্যালার্ম, ছুটোছুটিই সার হলো।
ইন্সপেক্টর অ্যালান রিচার্ডসের ওপর রেগে গেছে পিটার। প্ৰটিটা জায়গায় দেরি করে পৌঁছেছে আপনার লোকজন। মেলিসা ও-সব জায়গায় থাকলেও তাকে আমরা উদ্ধার করতে পারতাম না। এরপর হানা দেয়ার জন্যে যাবে হোর কমান্ডোরা থোর কমিউনিকেশনস নেটওয়র্কের সাহায্যে সরাসরি ডক্টর কিংস্টোন পার্কারের সাথে কথা বলল পিটার।
আমরা আমাদের সমস্ত ক্ষমতা কাজে লাগাব, ডক্টর পার্কার পিটারের সাথে একমত হলেন, তার চেহারায় দরদ এবং উদ্বেগ ফুটে উঠল।
