ক্যামব্রিজ হাসাপাতালের রেকর্ড বলছে আঙুলটা ওরই। টিস্যু টাইপ মিলছে। অন্যকারো সাথে এটা মিলার কথা না।
মনে মনে ক্ষীণ একটু আশা ছিল পিটারের, আঙুলটা মেলিসার নাও হতে পারে, কিডন্যাপাররা হয়তো কোনো লাশের আঙুল কেটে পাঠিয়েছে। চেহারা কঠোর হয়ে উঠল ওর।
অনেকক্ষণ চুপচাপ বসে থাকল ওরা, এক সময় ইন্সপেক্টর কিছু বলতে যাচ্ছে দেখে তাকে বাধা দিল কলিন। আপনি তো হোর কমান্ড সম্পর্কে শুনেছেন, তাই না, ইন্সপেক্টর?
শুনিনি মানে? এই তো কিছু দিন আগে জিরো-সেভেন-জিরো…
সন্ত্রাসবাদীদের হাত থেকে ভিকটিমকে ছিনিয়ে আনার ব্যাপারে আমরাই সম্ভবত দুনিয়ার সেরা টিম…।
কি বলতে চাইছেন বুঝতে পারছি, মি. কলিন, শুকনো গলায় বিড়বিড় করে বলল ইন্সপেক্টর। কিন্তু আগে কিডন্যাপারদের সন্ধান পেতে দিন, সমস্ত উদ্ধার তৎপড়তা পুলিশ কমিশনারের আন্ডারে হবে।
.
রাত তিনটের সময় পার্ক লেনের ডরচেস্টার হোটেলে পৌঁছুল পিটার। নাইট রিসেপশনিস্ট বলল, স্যুইটটা আপনার জন্যে মাঝরাত থেকে রাখা হয়েছে, মি. পিটার।
দুঃখিত, বলল পিটার। ক্লান্ত এবং বিধ্বস্ত দেখাল ওকে। কিডন্যাপার আর মেলিসার সন্ধান পাবার জন্যে সম্ভাব্য সব কিছু করা হচ্ছে, এই উপলব্ধি নিয়ে পুলিশ হেডকোয়ার্টার থেকে বেরিয়ে এসেছে ও। ইন্সপেক্টর কথা দিয়েছে, জরুরি যে কোনো খবর পাবার সাথে সাথে ফোনে পিটারকে জানাবে সে।
রেজিস্টার বুকে সই করে চাবি নিল পিটার, ক্লান্ত চোখের পাতা জোর করে মেলে আছে।
এই নিন, স্যার, কয়েকটা মেসেজ।
থ্যাঙ্ক ইউ এগেইন, অ্যান্ড গুড নাইট।
এলিভেটরে চড়ে এনভেলাপগুলোর ওপর চোখ বুলাল পিটার। প্রথমটা টেলিফোন মেসেজ, ক্লার্ক লিখে রেখেছে। ব্যারনেস ম্যাগডা অনুরোধ করেছেন তাকে আপনি ফোন করবেন। হয়তো প্যারিসে কিংবা রবুইলে-র নম্বরে।
দ্বিতীয়টাও টেলিফোন মেসেজ। মিসেস সিনথিয়া বারোউ ফোন করেছিলেন। তিনি সিক্স-নাইন-নাইন/থ্রী ওয়ান খ্রী তে ফোন করতে বলেছেন।
তৃতীয়টা সীল করা এনভেলাপ, দামি সাদা কাগজ। পিটারের নাম লেখা রয়েছে। গোটা গোটা অক্ষরে। কোনো স্ট্যাম্প নেই। তার মানে হাতে করে দিয়ে গেছে কেউ। বুকের ভেতরটা ধড়ফড় করতে লাগল পিটারের।
এনভেলাপটা ছিঁড়ে ভেতর থেকে একটা চিরকুট বের করল ও। সেই একই গোটা গোটা অক্ষরে লেখা হয়েছে চিঠিটা। রুদ্ধশ্বাসে পড়তে শুরু করল পিটার।
একটা আঙুল ইতোমধ্যে পেয়েছেন, এরপর হাতটা পাবেন, তারপর একটা পা। এভাবে আরেকটা পা, দুটো চোখ, সবশেষে মাথাটা। বিশে এপ্রিলে দ্বিতীয় পার্সেলটা পাবেন। তারপর থেকে প্রতি সাত দিন অন্তর একটা করে পার্সেল। এটা ঠেকাতে হলে জীবনের বদলে জীবন চাই আমরা। যেদিন ডক্টর কিংস্টোন পার্কার খুন হবেন সেদিনই আপনার মেয়ে আপনার কাছে ফিরে যাবেন, জীবিত এবং সুস্থ। চিঠিটা পুড়িয়ে ফেলুন, এটার কথা কাউকে জানাবেন না। জানালে অপেক্ষা না করে সাথে সাথে ডেলিভারি দিতে হবে মাথাটা। খলিফা।
সই করা নামটা দেখে পিটার যেন পক্ষাঘাতে আক্রান্ত হলো। স্থিরভাবে দাঁড়িয়ে থাকার চেষ্টা করলেও, সারা শরীর কাঁপতে লাগল। দুবার কাগজটা ভাজ করার চেষ্টা করে ব্যর্থ হলো, অগত্যা মুচড়ে ছোট করে ভরে রাখল পকেটে। পোর্টার ওর দিকে পিছন ফিরে দাঁড়িয়ে আছে, কিন্তু এলিভেটর থামার পর পিটারকে নামতে না দেখে ঘাড় ফেরাল সে। এতক্ষণে সংবিৎ ফিরে পেল পিটার। নিজের স্যুইটে ঢুকে টাকা দিল পোর্টারকে, কত বলতে পারবে না। দরজা বন্ধ হবার সাথে সাথে দোমড়ানো কাগজটা বের করে ভাজ খুলল সেটার।
বারবার পড়ল পিটার, এক সময় শুধু পড়ে গেল, শব্দগুলোর কোনো অর্থ পাচ্ছে না। উপলব্ধি করল, জীবনে এই প্রথম পরিপূর্ণ আতঙ্ক গ্রাস করেছে ওকে। সম্পূর্ণ দিকভ্রান্ত আর বোধবুদ্ধিহীন লাগছে নিজেকে।
বুক ভরে বাতাস টেনে চোখ বন্ধ করল পিটার। এক থেকে একশ পর্যন্ত গুনল ধীরে ধীরে, সমস্ত চিন্তা থেকে মুক্ত করল মাথাটাকে। তারপর নির্দেশ দিল নিজেকে :
ভাবো!
বেশ, ওর গতিবিধি সম্পর্কে খবর রাখছে খলিফা। এমনকি কখন ওর ডরচেস্টারে আসার কথা তাও তার জানা। কে কে জানত ব্যাপারটা? সিনথিয়া। কলিন নোবলস্। ব্যারনেস ম্যাগডা। রবুইলেতে ব্যারনেসের সেক্রেটারি, সেই তো স্যুইটটা রিজার্ভ করেছিল। আরো জানে ডরচেস্টার হোটেলের কর্মচারীরা। তার মানে অনেক লোক জানে, এদের কার কাছ থেকে খলিফা খবরটা পেয়েছে বের করা প্রায় অসম্ভব।
ভাবো!
আজ এপ্রিলের চার তারিখ। ষোল দিন পর খলিফা মেলিসার হাতটা পাঠাবে। আতঙ্কে আবার কাঁপতে শুরু করল পিটার, মনের সমস্ত ইচ্ছাশক্তি দিয়ে শান্ত করল নিজেকে।
ভাবো!
খলিফা ওর ওপর নজর রাখছিল, খুঁটিয়ে মাপছিল, ওর মূল্যায়ন করছিল। পিটারের মূল্য হলো, কারও মনে সন্দেহের উদ্রেক না করে ওপর মহলে আসা যাওয়া করতে পারে। ইচ্ছে করলেই একটা অনুরোধের মাধ্যমে অ্যাটলাসের প্রেসিডেন্টের সাথে দেখা করতে পারে ও। শুধু কি তাই, ইমার্জেন্সি দেখা দিলে যে কোনো বন্ধু রাষ্ট্রের সরকার প্রধানের সাথেও অল্প সময়ের নোটিশে দেখা করতে পারবে ও।
কেবিনেট থেকে বোতল বের করল, গ্লাস বা বরফ খোঁজার ধৈর্য হলো না, বোতল থেকে সরাসরি গলায় ঢালল খানিকটা স্কচ হুইস্কি। আয়নায় অচেনা মুখ, ওকে যেন ভেঙচাচ্ছে। বিষম খেয়ে খকখক করে কাশল পিটার। বোতল রেখে দিয়ে আবার পড়ল চিঠিটা।
