বৃহস্পতিবার, ১১টার সময় ক্যামব্রিজে নিজের বাসভবন থেকে কিডন্যাপ করা হয় ভিকটিমকে। একজন প্রতিবেশী মেরুন রঙের স্যালুনে তাকে উঠতে দেখেছেন। আমার ধারণা, গাড়িতে দুজন লোক ছিল, বত্রিশ বছর বয়স্ক প্রতিবেশী, শার্লি ক্যালন বলেন, মেলিসা জেইনকে দেখে অতটা আতঙ্কিত মনে হয় নি। মনে হলো, সে ইচ্ছে করেই গাড়িতে উঠছিল। এর আগেও ওর বাবা, যিনি সামরিক বাহিনিতে আছেন, বিভিন্ন গাড়ি পাঠাতেন মেয়ের জন্যে, কাজেই আমি অতটা আশ্চর্য হইনি। প্রায় চব্বিশ ঘণ্টা পর্যন্ত ব্যাপারটা নিয়ে কোনো ধরনের হৈচৈ হয় নি। মেয়ের মা মনে করেছিলেন, মেয়ে তার বাপের সাথে আছে। মেয়ের বাবা, জেনারেল স্ট্রাইডের সাথে যোগাযোগে ব্যর্থ হওয়ার পরই কেবল তিনি পুলিশকে জানান। পুলিশ মেরুন গাড়িটা খুঁজে পেয়েছে। ক্যামব্রিজ রেলওয়ে স্টেশনের কাছে পরিত্যক্ত অবস্থায় ছিল ওটা। আগের দিন লন্ডন থেকে চুরি করা হয় ওটা। দেশব্যাপী সতর্কবার্তা পৌঁছে গেছে পুলিশের কাছে। চিফ ইন্সপেক্টর অ্যালান রিচার্ডস এই তদন্তের দায়িত্বে আছেন। কারো কাছে কোনো সংবাদ থাকলে এই নম্বরে জানাতে পারেন–
একটা নম্বর দিয়ে, সবশেষে মেলিসার বর্ণনা দেয়া হয়েছে, কিডন্যাপ হওয়ার সময় কি পরে ছিল তাও উল্লেখ করা হয়েছে। দুমড়েমুচড়ে কাগজটা গোল পাকিয়ে সীটের এক কোণে ফেলে দিল পিটার। সোজা সামনের দিকে তাকিয়ে থাকল ও, প্রচণ্ড রাগ যেন আগুনের লেলিহান শিখা হয়ে পেঁচিয়ে ধরেছে গোটা শরীর।
.
ইন্সপেক্টর অ্যালান রিচার্ডস মানুষটা ছোটখাটো, কিন্তু পাকানো রশির মতো হাত পা। চ্যাপ্টা মুখে অস্বাভাবিক খাড়া নাক চেহারায় কমেডিয়ানের একটা ভাব এনে দিয়েছে। মাথায় টাক পড়ছে, তাই চুল খুব লম্বা রাখে, চকচকে অংশগুলো ঢাকার জন্যে। চোখ জোড়া চঞ্চল আর বুদ্ধিদীপ্ত, কথা বলে সরাসরি এবং দৃঢ় কণ্ঠে।
পরিচিত হবার সময় পিটারের সাথে করমর্দন করল সে আপনাকে আগেভাগেই জানিয়ে দিচ্ছি, জেনারেল, পরিষ্কার পুলিশী কেস এটা। তবে উপর মহল থেকে আরো পরিষ্কারভাবে আমাকে জানিয়ে দেয়া হয়েছে, প্রয়োজনে আপনাদের সাহায্য আমাকে নিতে হবে।
ইতোমধ্যে তদন্তের কাজ কতটুকু এগিয়েছে তার বিশদ বর্ণনা দিল সে। স্কটল্যান্ড ইয়ার্ডের চারতলায় দুটো কামরায় দুজন সাব-ইন্সপেক্টর বসানো হয়েছে, তথ্য যেখান থেকে যা আসছে সেগুলোর সত্যতা যাচাই করছে তারা। টেলিফোনগুলোও সেখানে, এরই মধ্যে চারশর মতো কল রিসিভ করা হয়েছে। যেহেতু কোনো সূত্র এখনো পাওয়া যায়নি, প্রতিটি কল চেক করে দেখতে হবে। এই কাজে স্কটল্যান্ড ইয়ার্ডের বেশ বড়সড় একটা বাহিনিকে মাঠে নামানো হয়েছে।
সময়সাপেক্ষ ব্যাপার, জেনারেল। আরো কিছু ব্যাপার আছে–আসুন আমার সাথে। পিটারকে নিয়ে ভেতরের অফিসে চলে এল সে। ইউনিফর্ম পরা একজন লোক ওদেরকে চা পরিবেশন করল।
তিনটে গাড়িই পাওয়া গেছে পরিত্যক্ত অবস্থায়, প্রতিটি ইঞ্চি পরীক্ষা করে দেখছে আমার লোকেরা। ল্যান্ড-রোভারে একটা পার্স পাওয়া গেছে, আপনার প্রাক্তন স্ত্রী সেটাকে মেলিসার বলে সনাক্ত করেছেন। ছয়শর মতো ফিঙ্গার প্রিন্ট পাওয়া গেছে, সবগুলো প্রসেস করা হয়েছে, তবে মিলিয়ে দেখতে কিছু সময় লাগবে। আপনার মেয়ের কামরায় এর দুটো মিলেছে। চিনি লাগবে, দুধ?
পিটারের কাছে কাপটা এগিয়ে দিয়ে বলে চলেন ইন্সপেক্টর।
হাতি-ঘোড়া যাই হোক, টেলিভিশনে প্রচার করব আমরা। আসলে অপেক্ষা করছি আমরা, জেনারেল। কিডন্যাপাররা মুক্তিপণ চেয়ে যোগাযোগ করবে। কিংবা কেউ ওদের দেখতে পেয়ে ফোন করবে। আপনার প্রাক্তন স্ত্রীর সাথে ওরা যোগাযোগ করবে বলে মনে করি না, তবু ফোনে আড়ি পাতা যন্ত্র ফিট করা হয়েছে। এবার আপনার পালা, জেনারেল স্ট্রাইড। আশা করছি আপনার কাছ থেকে মূল্যবান কিছু তথ্য পাব আমরা।
আড়চোখে একবার কলিনের দিকে তাকিয়ে মাথা নাড়ল পিটার।
ইন্সপেক্টর রিচার্ডস বলে চলেন : আমার ধারণা, আপনি অততটা ধনী নন। কিন্তু আপনার পরিবার? ভাই?
পরিকল্পনা উড়িয়ে দিল পিটার। আমার ভাইয়ের নিজের ছেলেমেয়ে আছে। কিডন্যাপ করতে চাইলে ওদের করার কথা।
প্রতিশোধ-কোন ধরনের? আয়ারল্যান্ডে আপনার কাজের জন্যে? বা ০৭০ বোয়িং–এর ঘটনায়?
হতে পারে।
এখন আর আপনার সাথে আর্মির যোগাযোগ নেই বলেই আমার বিশ্বাস।
এই বিষয়ে বেশি কথা বলতে রাজি নয় পিটার।
এ ধরনের অনুমান নির্ভর কাজে কোনো ফল পাবেন না। কিডন্যাপাররা ডিমান্ড করলেই পুরো ব্যাপারটা খোলসা হবে।
এটা ঠিক, মেনে নিলেন ইন্সপেক্টর। ওরা কি আপনাকে মেয়েটার–মানে পিটারের মুখাবয়ব দেখে থেমে গেলেন তিনি। আমি দুঃখিত, জেনারেল। খুবই নোংরা একটা ব্যাপার। কিন্তু এতে করে একটা ব্যাপার প্রমাণ হয়, আপনার মেয়ে এখনো জীবিত আছে। আঙুলটা তার প্রমাণ। এটা একটা হুমকি—-কিংবা আর্নেস্ট ইনটেনশন।
ডেস্কের ফোন ঝনঝন শব্দে বেজে উঠল, ছো দিয়ে রিসিভার তুলল ইন্সপেক্টর। খানিকক্ষণ কথা বলে রিসিভার নামি রাখল সে, কিছুক্ষণ মুখ ভার করে থাকল। তারপর পিটারকে বলল, ল্যাবরেটরি থেকে জানানো হলো আঙুলটা মেলিসারই। আপনি মনে হয় জানেন, আপনার মেয়ে একজন হোয়াইট সেল ডোনার?
মাথা নাড়ল পিটার। এই হলো মেলিসা। বাধা না থাকলে কবে নিজের বোন ম্যারো আর বালতি ভর্তি রক্তে দান করে দিত মেয়েটা।
