পার্সেলের গায়ে একটা চৌকো কাগজ সাঁটা রয়েছে, ঠিকানাটা তাতে টাইপ করা। স্ট্যাম্পগুলো ব্রিটিশ। পার্সেলটা নেড়েচেড়ে দেখতে দেখতে অকারণেই কেমন যেন ভয় পেয়ে গেল পিটার। দামী আসবাবে সাজানো গার্ডেন রুমে কোথাও যেন ও পেতে আছে কি একটা বিপদ।
কি হলো পিটার? পিটারের চেহারা দেখে থতমত খেয়ে গেছে ব্যারনেস।
না, কই, বলল পিটার। কিছু না।
হঠাৎ তুমি সাদা হয়ে গেলে কেন? অসুস্থ বোধ করছ, ডার্লিং?
না-না। এমনি, মানে… কথা শেষ না করে টেবিল থেকে ছোট একটা ছুরি তুলে পার্সেলের গা থেকে খুঁচিয়ে মোম তুলতে শুরু করল পিটার। তারপর বাদামি কাগজের মোড়ক খুলল। সাদা, স্বচ্ছ কাঁচের তৈরি একটা বোতল, মাথাটা প্যাঁচ বিশিষ্ট ছিপি দিয়ে আটকানো। ভেতরের তরল পদার্থটুকুও স্বচ্ছ-এক ধরনের প্রিজারভেটিভ, সাথে সাথে বুঝল পিটার। স্পিরিট বা ফরমাল ডিহাইড।
তরল পদার্থের মাঝখানে ভাসছে সাদাটে একটা জিনিস।
কি ওটা? অবাক হয়ে জিজ্ঞেস করল ব্যারনেস।
পেটে একটা আলোড়ন উঠল পিটারের, গলার কাছে উঠে আসতে চাইল বমি বমি ভাব।
বোতলের ভেতর জিনিসটা ধীরে ধীরে ঘুরছে। হঠাৎ গোড়ার দিকটা লালচে আলোর মতো উজ্জ্বল হয়ে উঠল। লালের মাঝখানে সাদা হাড়।
তোমার মা আজকাল নখে রঙ করতে দেয় তোমাকে, মেলিসা? নিজের স্বরণে প্রশ্নটা যেন বেজে ওঠে পিটারের। ওর মেয়ে সাথে সাথে আঙুলগুলো মেলে ধরে দেখিয়েছিল, লাল রঙে রাঙানো। ঠিক ওই লাল টুকরোর মতো।
ওই, হ্যাঁ, ড্যাডি! বলেছিল মেলিসা। তুমি তো জানো না? ভুলেই যাও, আমার বয়স প্রায় চৌদ্দ এখন!
কোনো মানুষের কাটা আঙুল ওটা। গোড়া থেকে বিচ্ছিন্ন করা হয়েছে। বোতলটার দিকে তাকিয়ে থাকতে থাকতে আতঙ্কে বিস্ফারিত হয়ে উঠল পিটারের চোখ জোড়া।
বমি উঠে এল পেটের গভীর থেকে।
৪. অপরপ্রান্তে রিসিভার তুলল
তৃতীয়বার রিং হতে অপরপ্রান্তে রিসিভার তুলল কেউ।
সিনথিয়া বারো, প্রাক্তন স্ত্রীর কণ্ঠস্বর চিনতে পারল পিটার, উদ্বেগে ভরা। সিনথিয়া, আমি পিটার!
ওহ, থ্যাঙ্ক গড, পিটার! রুদ্ধশ্বাসে বলল সিনথিয়া। তোমাকে আমি দুদিন ধরে কোথায় না খুঁজছি! শুনেছ সব…?
না।
মেলিসা-জেইন কি তোমার সাথে, পিটার?
না। মনে হলো, গ্রহটা কাত হয়ে যাচ্ছে ওর পায়ের নিচে।
ও নেই, পিটার। হারিয়ে গেছে! আজ দুই রাত হলো! আমি বোধ হয় পাগল হয়ে যাব!
পুলিশকে জানিয়েছ?
হ্যাঁ, সিনথিয়ার গলায় হিস্টিরিয়ার ভাব।
যেখানে আছে, সেখানেই থাকো, আমি আসছি ইংল্যান্ডে। কোনো মেসেজ থাকলে ডরচেস্টারে পাঠাবে। ফোন কেটে দিল পিটার। দুঃখ-শোকে-আতঙ্কে বেসামাল হয়ে পরেছে।
ডেস্কের পাশে ফ্যাকাসে চেহারা নিয়ে দাঁড়িয়ে আছে ব্যারনেস ম্যাগডা, হাত দুটো বুকের ওপর ভাঁজ করা। কোনো প্রশ্ন করার দরকার নেই, পিটারের চেহারাতেই সব লেখা রয়েছে। পিটারও কিছু না বলে শুধু ছোট্ট করে মাথা ঝাঁকাল। ফোনের দিকে ঝুঁকে ছিল পিটার, ঝুঁকেই থাকল। আবার ডায়াল করছে।
কলিন নোবলস, রিসিভারে হুঙ্কার ছাড়ল পিটার। বল আমি জেনারেল স্ট্রাইড এবং জরুরি।
ত্রিশ সেকেন্ডের মধ্যে অপরপ্রান্তে হাজির হলো কলিন। পিটার, তুমি?
ওরা মেলিসাকে নিয়ে গেছে।
কারা? বুঝলাম না!
শত্রুরা। কিডন্যাপ করেছে মেলিসাকে।
জেসাস, গড! ঠিক জানো?
হ্যাঁ, কোনো সন্দেহ নেই। বোতলে করে ওর একটা আঙুল পাঠিয়েছে ওরা।
অপরপ্রান্তে কয়েক সেকেন্ড চুপ করে থাকল কলিন। তারপর বলল, দ্যাটস সিক, ক্রীস্ট, দ্যাটস্ রিয়েলি সিক!
পুলিশের সাথে যোগাযোগ কর, ওরা কি করছে জানো। তোমার সমস্ত প্রভাব কাজে লাগাও। ওরা অনেক জিনিস চেপে যাচ্ছে। সমস্ত তথ্য জোগাড় কর। কুত্তাগুলোকে আমি নিজের হাতে পেতে চাই। এখুনি আমি রওনা হচ্ছি, কোন ফ্লাইটে পরে জানাচ্ছি।
এই নম্বরে চব্বিশ ঘণ্টা লিসনিং ডিভাইস রাখলাম, প্রতিশ্রুতি দিল কলিন। এয়ারপোর্টে ড্রাইভার পাঠাব, তোমাকে নিয়ে আসবে। ইতঃস্তত করল সে। পিটার, আমি দুঃখিত। তুমি জানো।
জানি, কলিন।
আমরা তোমার সাথে আছি, স্যার, সবটুকু পথ।
রিসিভার নামিয়ে রেখে মুখ তুলল পিটার। নিজেও জানে না চোখের কোণ চিকচিক করছে। কারও শুনতে পাবার কথা নয়, ওর শরীরের প্রতিটি অঙ্গ থেকে প্রতিটি লোমকূপ মেলিসা মেলিসা বলে নিঃশব্দে চিৎকার করছে। এগিয়ে এসে পিটারের সামনে দাঁড়াল ব্যারনেস ম্যাগডা। আমি তোমার সাথে লন্ডনে যাচ্ছি।
হাত বাড়িয়ে ব্যারনেসের কবজি ধরল ও। না, এই সময়ে তোমার কিছুই করার নেই।
পিটার, তোমার এই কষ্টের সময় আমি সাথে থাকতে চাই। মনে হচ্ছে গোটা ব্যাপারটার জন্যে আমি দায়ী।
তুমি কেন দায়ী হতে যাবে!
কী চমৎকার একটা মেয়ে!
মাথা নাড়ল পিটার। এখানে থাকলে আরো বেশি সাহায্য করতে পারবে আমাকে। তোমার উৎস থেকে তথ্য জোগাড় কর। সব জানাও আমাকে।
পিটারের দৃঢ় চেহারার দিকে কয়েক সেকেন্ড তাকিয়ে থাকার পর মাথা নিচু করল ব্যারনেস। ঠিক আছে, তবে তাই হোক। কোথায় যোগাযোগ করব তোমার সাথে?
থোর কমান্ডে কলিন নোবলসের ব্যক্তিগত নম্বর দিল পিটার, বলল, এই নম্বরে কলিন নোবলকে, না হয় ডরচেস্টারের নম্বরে আমাকে পাবে।
ঠিক আছে। কিন্তু অন্তত প্যারিস পর্যন্ত তোমার সাথে যেতে দাও আমাকে।
.
হিথরো এয়ারপোর্টে নেমে নিউজ স্ট্যান্ড থেকে এক কপি ইভনিং স্ট্যান্ডার্ড কিনল পিটার, ঘটনার পুরো বিবরণ ইতোমধ্যে ছাপা হয়েছে কাগজে। লন্ডনে যাবার পথে গাড়িতে বসে পড়ল পিটার।
