আরো অস্বস্তিকর প্রশ্ন তুলেছেন ডক্টর পার্কার। মোসাডের সাথে ব্যারনেসের যোগাযোগ। হারিয়ে যাওয়া ছয়টি বছর। দুজন একান্তে, নিভৃতে যে সময়গুলো কাটিয়েছে তার কথা মনে পড়ে গেল পিটারের। এমন সুন্দর যার মন, এমন মার্জিত যার রুচি, তার দ্বারা কি এত নোংরা ছলনা সম্ভব? সত্যি কি ওকে খুঁটি হিসেবে ব্যবহার করছে ব্যারনেস, আর সব পুরুষকে যেমন ব্যবহার করেছে? তারপর কাজ ফুরিয়ে গেলে আবর্জনার মতো ফেলে দেবে, আর সবাইকে যেমন দিয়েছে?
একটা ব্যক্তিগত প্রশ্নের উত্তর পেতে হবে পিটারকে। ব্যারনেস ম্যাগডার সাথে কতটুকু জড়িয়ে পড়েছে ও? তার প্রতি কতটুকু দুর্বল ও? কিন্তু হিথরোতে নামার পরও নিজের মন বুঝতে পারল না পিটার, চুলচেরা হিসেব করে ভালোবাসার গভীরতা মাপা সম্ভব হলো না। হঠাৎ করে ব্যারনেসের একটা প্রস্তাবের কথা মনে পড়ে গেল। মাঝখানে একটা লেগুন নিয়ে নয়টা দ্বীপ, যেখানে ওরা পালাতে পারে। সন্দেহ নেই, ব্যারনেস ম্যাগডার জীবনও সঙ্কট আছে, সেজন্যেই জীবন থেকে পালাতে চায় সে। কিন্তু ওকে নিয়ে কেন? ভালোবেসে ফেলেছে, তাই? তাহলে কি তার ভালোবাসা অকৃত্রিম?
কে জানে, শেষ পরিণতি কি লেখা আছে দুজনের কপালে। এমন তো নয় যে দুজনের পরিচয়ই হয়েছে পরস্পরকে ওরা ধ্বংস করবে বলে?
হোটেল ডরচেস্টারে ব্যারনেস ম্যাগডার তিনটে আলাদা আলাদা মেসেজ পেল পিটার। প্রতিটি মেসেজে রবুইলের টেলিফোন নম্বর দিয়েছে। কাপড়চোপড় না ছেড়েই ডায়াল করল পিটার।
পিটার ডার্লিং! কি দুশ্চিন্তায় ছিলাম! কোথায় ছিলে তুমি? বিশ্বাস করা কঠিন ব্যারনেস ম্যাগডা ভান করছে। এবং গা শিরশির করা পুলক পিটারের সারা শরীরে, ছড়িয়ে পড়ল। পরদিন দুপুরে, ড্রাইভারকে না পাঠিয়ে চার্লস দ্য গল এয়ারপোর্টে নিজেই চলে এল ব্যারনেস।
আমার তর সইছিল না, বলল সে, পিটারের কনুইয়ের ভাঁজে হাত ঢুকিয়ে দিয়ে গা ঘেঁষে এল। তোমাকে এক ঘণ্টা আগে দেখতে পাব বলে নিজেই চলে এলাম। মানে হলো, জেনারেল স্ট্রাইড পিটার, নির্লজ্জের মতো আচরণ করছি আমি! জানো, তুমি আমাকে আমার কৈশোর ফিরিয়ে দিয়েছ!
সন্ধ্যা আটটায় একটা পার্টিতে থাকল ওরা, ডিনার খেল লিমেরী রোদায়, থিয়েটার দেখল পাপেতি-তে। যেখানেই গেল ওরা, প্রতি মুহূর্ত পিটারের স্পর্শ নিল ব্যারনেস, যেন ওকে হারাবার ভয়ে অবচেতনভাবে শঙ্কিত হয়ে আছে। মাঝরাতে লা পিয়েরে বেনিতে ফেরার সময়ও নিজের কোলের ওপর পিটারের হাতটা ধরে থাকল সে।
টেলিফোনে বলতে পারিনি তোমাকে, শুরু করল পিটার। অ্যাটলাস থেকে প্রস্তাব দেয়া হয়েছে আমাকে। ওদের প্রেসিডেন্ট আমাকে নিউ ইয়র্কে ডেকেছিলেন। ওরাও খলিফার পিছনে লেগে আছে।
পিটারের হাতের ওপর ব্যারনেসের আঙুলগুলো নড়ল না। একটা দীর্ঘশ্বাসের আওয়াজ পেল পিটার। কখন বলবে তার জন্যে অপেক্ষা করছিলাম আমি, পিটার। জানতাম তুমি আমেরিকায় গেছ। কেন যেন মনে হয়েছিল, তুমি মিথ্যে কথা বলতে পার আমাকে। তা যদি বলতে, কি করতাম জানি না।
ব্যারনেস জানে নিউ ইয়র্কে গিয়েছিল ও? কিন্তু কিভাবে? তারপর পিটারের মনে পড়ল, তথ্য পাবার নিজস্ব উৎস আছে তার।
সব আমাকে বল, পিটার।
প্রায় সব কথাই বলল পিটার, শুধু ব্যারনেস সম্পর্কে ডক্টর পার্কারের অস্বস্তিকর প্রশ্নগুলো বাদ দিয়ে গেল-বাদ দিয়ে গেল ব্যারনের মোসাড কানেকশন, ব্যারনেসের হারানো ছয়টা বছর, আর দশজন নামহীন পুরুষ প্রেমিকের প্রসঙ্গ।
শত্রু খলিফা নামটা ব্যবহার করছে ওরা তা জানে না, বলল পিটার। তবে ওরা আন্দাজ করে নিয়েছে, তুমি তাকে খুঁজছ। ওদের ধারণা, আমার কাছ থেকে সাহায্য চাও তুমি।
লা পিয়েরে বেনিতে পৌঁছেও আলোচনা থামল না, একটা সোফায় পাশাপাশি গা ছুঁয়ে বসে ফিসফিস করে কথা বলল ওরা। নিজের ভাবসাব লক্ষ্য করে নিজেই অবাক হয়ে গেল পিটার, মন থেকে প্রায় সমস্ত সন্দেহ আর অবিশ্বাস বেমালুম উবে গেছে বলে মনে হতে লাগল। ব্যারনেসের মধ্যে কি যেন একটা জাদু আছে, কাছে এলে মুগ্ধ করে ফেলে।
অর্গানাইজেশনের একজন হিসেবে এখনো আমাকে রেখেছেন ডক্টর পার্কার, ব্যাখ্যা করল পিটার। প্রত্যাখ্যান বা আপত্তি করিনি আমি। কারণ খলিফাকে খুঁজে বের করতে হবে, অর্গানাইজেশনে আমার একটা পজিশন থাকলে খোঁজার কাজটা সহজ হবে।
আমি একমত। হ্যাঁ, আমাদের সাহায্য হবে, বিশেষ করে এখন যখন ওরাও জানে যে খলিফার অস্তিত্ব আছে।
গভীর রাতে ঘনিষ্ঠ হয়ে এল ম্যাগডা। এ শুধু দুটো দেহ এক হওয়া নয়, কোমল সমস্ত ভাব নিয়ে দুটো কাতর মনের ব্যাকুল মিলন। গোপনীয়তার স্বার্থে দিনের আলো ফোঁটার আগেই ঘর থেকে বেরিয়ে গেল ব্যারনেস ম্যাগডা, কিন্তু এক ঘণ্টা পর ব্রেকফাস্টের জন্যে আবার ওরা মিলিত হলো গার্ডেন রুমে।
পিটারের কাপে কফি ঢালল ব্যারনেস, ইঙ্গিতে প্লেটের পাশে ছোট্ট পার্সেলটা দেখাল পিটারকে। যতটুকু সাবধান হওয়া দরকার ততটা আমরা হতে পারছি না, শেরি। রাঙা ঠোঁট টিপে হাসল সে। কে যেন জানে কোথায় তুমি রাত কাটাও।
ডান হাতের তালুতে নিয়ে পার্সেলটার, ওজন নিলো পিটার। বাদামি কাগজে মোড়া, লাল মোম দিয়ে সীল করা।
কাল-সন্ধ্যায় স্পেশাল ডেলিভারি এজেন্সির লোক পৌঁছে দিয়ে গেছে, কফির কাপে চুমুক দিয়ে বলল ব্যারনেস, তার পটল চেরা সবুজ চোখে কৌতূহল।
