এক পরিবার থেকে আরেক পরিবারে হাত বদল হতে লাগল বাচ্চাটা। কিছুদিন থাকল আত্মীয়-স্বজনদের কাছে, কিছুদিন বাবার বন্ধুদের বাড়ি। ইতোমধ্যে তার প্রতিভার কথা জানাজানি হয়ে গেছে। চমৎকার দাবা খেলে, ভাল গাইতে আর বাজাতে পারে, তেরো বছর বয়সেই তিনটে ভাষা শিখে ফেলল। এরপর বেশ লম্বা একটা সময় তার সম্পর্কে আর কোনো রেকর্ড পাওয়া যায় না। ম্যাগডা যেন সম্পূর্ণ। হারিয়ে গেল। একটু যা আভাস পাওয়া যায় তার ফস্টার মাদারের কাছ থেকে, ছোটবেলায় যে তাকে মানুষ করেছিল। সে এখন অথর্ব, আশির ওপর বয়স, সবকথা ভালো করে মনে করতে পারে না।
ম্যাগডা নাকি তাকে বলেছিল, আমি দেশে যাচ্ছি। দেশ? এর অর্থ আমাদের জানা নেই। দেশ মানে কি ওয়ারসও? ইসরায়েল? পূর্বের কোনো দেশ? পাইপে টান দিয়ে ধোয়া ছাড়লেন ডক্টর পার্কার।
আপনি তার সম্পর্কে খোঁজ-খবর করেছেন, বলল পিটার। যা শুনেছে তাতেই অস্বস্তি বোধ করছে ও, আরো কি শুনতে হবে কে জানে।
থোর কমান্ড ছেড়ে চলে যাবার পর তুমি যাদের সাথে যোগাযোগ করেছ তাদের সবার ব্যাপারে খোঁজ নিয়েছি। তবে ব্যারনেসের ব্যাপারে বিশেষভাবে আগ্রহী ছিলাম আমরা।
মাথা ঝাঁকিয়ে অপেক্ষা করে থাকল পিটার, খুঁটিয়ে কিছু জিজ্ঞেস করলে ব্যারনেসকে যেন অপমান করা হবে।
অজ্ঞাতবাস থেকে আবার একদিন প্যারিস ফিরে এল ম্যাগডা, উনিশ বছর বয়সে। পাঁচটা ভাষায় অনর্গল কথা বলতে পারে, অত্যন্ত যোগ্য প্রাইভেট সেক্রেটারি। শুধু মার্জিত আর সুন্দরী নয়, পশ্চিমা ফ্যাশন সম্পর্কে ভারি সচেতন। দেখতে দেখতে প্রভাবশালী মহল তার ভক্ত হয়ে পড়ল। পরিচয় হলো ব্যারন অ্যারন অল্টম্যানের সাথে।
ব্যারনেসও কি মোসাডের এজেন্ট? রুদ্ধশ্বাসে জিজ্ঞেস করল পিটার।
আমরা জানি না। তবে সম্ভাবনা খুব বেশি। হয়তো তার কাভার কোনো খুঁত নেই। সেজন্যেই তো তোমার ওপর ভরসা করছি আমরা, ব্যারনেস অল্টম্যান ইসরায়েলি এজেন্ট কিনা জানতে হবে তোমাকে।
আই সি! বিড়বিড় করে বলল পিটার।
ব্যারনেস নিশ্চয়ই জানত তার স্বামী একজন ইহুদি। স্বামীর মৃত্যুর সাথে এই ব্যাপারটার একটা যোগসূত্র আছে, বুঝতে পারার কথা তার। তাছাড়া, সে নিজেও ছয় বছর নিখোঁজ ছিল–তেরো থেকে উনিশ। এই ছয় বছর কোথায় ছিল সে?
ম্যাগডা কি ইহুদি? জিজ্ঞেস করল পিটার। তার বাবা কি ইহুদি ছিল?
আমাদের তাই বিশ্বাস, কিন্তু ধর্মের ব্যাপারে লোকটা কখনো আগ্রহ দেখায়নি। তার মেয়েও ধর্মকে গুরুত্বের সাথে নেয়নি। ব্যারনের সাথে তার বিয়ে হয় ক্যাথলিক ধর্মমতে, কিন্তু সেটা স্রেফ আনুষ্ঠানিকতা বজায় রাখার জন্যে।
শান্ত গলায় পিটার বলল, আন্তর্জাতিক সন্ত্রাসবাদ থেকে অনেক দূরে সরে এসেছি আমরা।
মাথা নাড়লেন ডক্টর পার্কার। আমার তা মনে হয় না। ব্যারন অল্টম্যান তো এই সন্ত্রাসবাদেরই শিকার। ব্যারনেসও শিকার হতে যাচ্ছিল–সন্ত্রাসবাদবিরোধী একজন এজেন্ট তার সাথে মেলামেশা শুরু করার পরপরই। তাৎপর্য একটা আছে। বলে মনে হচ্ছে না তোমার, পিটার?
চুপ করে থাকল পিটার।
সেদিন রাতে লা পিয়েরে বেনিতে যা ঘটল, সে সম্পর্কে তোমার কি ধারণা? প্যারিস থেকে সিট্রন অনুসরণ করেছিল পিটারকে। বলল, আমাকে নয়, ওরা ব্যারনেসকে খুন বা কিডন্যাপ করার চেষ্টা করেছিল।
তুমি তার গাড়ি চালাচ্ছিলে, তাই না?
হ্যাঁ।
আর ওই রাস্তা দিয়েই আসা-যাওয়া করত ব্যারনেস।
হ্যাঁ।
ওখানে তোমাকে যেতে বলেছিল কেউ! কে?
গাড়িটা আমি ব্যারনেসকে ব্যবহার করতে নিষেধ করি…
তার মানে কি তুমি স্বইচ্ছায় মাসেরাতি নিয়ে ওখানে যাচ্ছিলে?
হ্যাঁ, নিজেও জানে না পিটার কেন মিথ্যে বলছে।
ব্যারনেস আর পিটার সুইটজারল্যান্ড থেকে ফেরার পর ওদের সাথে দেখা হয় দুজন দেহরক্ষী আর দুজন ড্রাইভারের তারা জানত।
তুমি ঠিক জানো?
হ্যাঁ, জানি, বলল পিটার। আমি ছাড়া আর কেউ জানত না। কিন্তু ব্যারনেস ম্যাগডা জানত। রাগের সাথে চিন্তাটা মাথা থেকে বের করে দিতে চেষ্টা করল পিটার।
ঠিক আছে, তাহলে আমাদের ধরে নিতে হবে যে ব্যারনেসের ওপরই হামলা করা হয়েছিল। কিন্তু হামলাটা কি ছিল–খুনের চেষ্টা, নাকি কিডন্যাপিংয়ের? যদি খুনের চেষ্টা হয়ে থাকে, আমরা ধনে নিতে পারি প্রতিদ্বন্দ্বী কোনো এজেন্টের কাজ ছিল ওটা, ধরে নিতে পারি ব্যারনেসও মোসাডের এজেন্ট। কিন্তু যদি কিডন্যাপিংয়ের চেষ্টা হয়ে থাকে তাহলে মনে করতে হবে আতঙ্কবাদীরা দায়ী, উদ্দেশ্য ছিল মোটা টাকা কামানো। তোমার কি মনে হয়, পিটার?
রাস্তা বন্ধ করে রেখেছিল ওরা, বলল পিটার, কিন্তু পুরোপুরি নয়, মনে আছে ওর। ভুয়া পুলিশটা আমাকে থামার ইঙ্গিত দিল—কিংবা গাড়ির গতি কমাবার ইঙ্গিত ছিল ওটা, হয়তো গুলি শুরু করার আগে সহজ একটা টার্গেট পেতে চাইছিল ওরা। আমি থামব না বুঝতে পারার পরই কেবল গুলি শুরু করল ওরা। কথাটা পুরোপুরি সত্যি নয়। আমার ধারণা ব্যারনেসকে ওরা জীবিত ধরতে চেয়েছিল।
ঠিক আছে, মাথা ঝাঁকিয়ে বললেন ডক্টর পার্কার। আপাতত এটাই মেনে নেব আমরা। কলিনের দিকে তাকালেন তিনি। তোমার কোনো প্রশ্ন আছে নাকি?
ধন্যবাদ, স্যার। আমরা এখনো জানি না আর অফারটা কিভাবে পেল পিটার। প্রথমে কে যোগাযোগ করেছিল?
লন্ডনের একটা এমপ্লয়মেন্ট এজেন্সি প্রথমে যোগাযোগ করে আমার সাথে, বলল পিটার। তারপর ব্যারনেস ম্যাগডা সরাসরি…।
