দুহাত বুকের ওপর ভাজ করে এক পা থেকে আরেক পায়ে দেহের ভার চাপালেন ডক্টর পার্কার। সেন্টারটা কি ধরনের বা কোথায়, কে বা কারা গোটা দুনিয়ার টেরোরিস্টদের নিয়ন্ত্রণে আনার চেষ্টা করছে, এ সব কিছুই তখন আমরা জানতে পারিনি, এখনো জানি না। বিচ্ছিন্ন সব খবর আসতে লাগল- টেরোরিস্টদের পরিচিত লীডাররা কোথায় যেন মিটিং করেছে, সন্দেহজনক বা রহস্যময় চরিত্রের কিছু লোক কোথাও এক জায়গায় জড়ো হয়েছিল, মধ্যপ্রাচ্যের বা পুব ইউরোপের রাষ্ট্রপ্রধানের সাথে কে বা কারা যেন গোপনে সাক্ষাৎ করেছে, এই সব। তারপর হঠাৎ করেই সন্ত্রাসবাদীদের আচরণ বলতে গেলে রাতারাতি বদলে গেল।
প্রথমে ধনী হিসেবে দুনিয়া জোড়া যাদের খ্যাতি আছে তাদের কিডন্যাপ করা শুরু হলো। মুক্তিপণ হিসেবে শত শত মিলিয়ন ডলার চলে গেল টেরোরিস্টদের হাতে বা সেন্টারে। ওপেক মন্ত্রীরা কিডন্যাপ হলো। তারপর সৌদি বাদশার আত্মীয়রা। সবশেষে হাইজ্যাক করা হলো জিরো-সেভেন-জিরো।
সব কথা খুলে ব্যাখ্যা করার সময় ছিল না, আমি তোমাকে কঠোর নির্দেশ দিলাম-হাইজ্যাকারদের বিরুদ্ধে কোনো অ্যাকশন নেয়া চলবে না। টেরোরিজমের এই নতুন ঢেউ সম্পর্কে মূল্যবান তথ্য দরকার ছিল আমার। আমি চেয়েছিলাম ক্ষতির ঝুঁকি নিয়ে হলেও হাইজ্যাকারদের বাঁচিয়ে রাখতে হবে। কিন্তু আমি যা বিশ্বাস করতাম না, তাই করে বসলে তুমি।
স্বীকার করি, জেনারেল স্ট্রাইড, প্রথমে আমি ভয়ানক রেগে গিয়েছিলাম। পারলে তোমাকে আমি কড়া শাস্তি দিতাম। কিন্তু মাথা ঠাণ্ডা হবার পর হঠাৎ আমি উপলব্ধি করলাম, শত্রুর বিরুদ্ধে লড়ার জন্যে যেমন লোক আমার দরকার তুমি নিজেকে ঠিক সেই লোক হিসেবে প্রমাণিত করেছে। জানলাম জেনারেল স্ট্রাইড নিয়ম ভাঙতে পারে, এবং স্বাধীনভাবে সিদ্ধান্ত নিতে পারে।
সেই সাথে আরো একটা ব্যাপার উপলব্ধি করলাম। তোমার ভেতর যে গুণ আমি আবিষ্কার করেছি, প্রতিপক্ষরাও সেই গুণটা দেখে আমার প্রতি আকৃষ্ট হবে। আতঙ্কবাদীরা বুঝবে, ওদের জন্যে চমৎকার একটা হাতিয়ার হতে পারো তুমি। কাজেই, আমি তোমার পদত্যাগপত্র গ্রহণ করলাম। অর্থাৎ তুমি আমার এজেন্ট থাকলে, কিন্তু তুমি নিজেও জানলে না। নিখুঁত, তাই না? জানো তুমি আমাদের কেউ নাও, তাই অভিনয় করার দরকার পড়ল না। সবাই জানল থোর কমান্ড থেকে তাড়িয়ে দেয়া হয়েছে তোমাকে, অর্থাৎ যে কেউ তোমাকে কাজের অফার দিতে পারে, দিলে তুমি নেবেও। এবং ঘটলও ঠিক তাই। টোপ ফেলা হলো, এবং তুমি গিললে।
আমার ঠিক বিশ্বাস হচ্ছে না, মৃদুকণ্ঠে বলল পিটার। হাতের চুরুটটা নিভে গেছে।
ব্যাঙ্কে খবর নিলে বিশ্বাস হত, বললেন ডক্টর পার্কার মিটিমিটি হাসছেন তিনি। পিছিয়ে এসে ডেস্কের দেরাজ থেকে একটা এনভেলাপ বের করলেন, আবার পিটারের সামনে ফিরে এসে বাড়িয়ে দিলেন সেটা। এনভেলাপ খুলে সুইস ব্যাঙ্কের স্টেটমেন্টের ওপর চোখ বুলাল পিটার। থোর কমান্ড থেকে পদত্যাগ করার পরও প্রতি মাসের বেতন জমা হয়েছে ওর অ্যাকাউন্টে, কোনো টাকা তোলা হয়নি। দেখতেই পাচ্ছ, পিটার, এখনো তুমি আমাদের সাথে আছ। তোমাকে আমি শুধু এইটুকু বলতে পারি, ভান করার জন্যে দুঃখিত। কিন্তু ভান করায় লাভ যে হয়েছে তাতে কোনো সন্দেহ নেই।
মুখ তুলে তাকাল পিটার, এখনো পুরোপুরি বিশ্বাস করতে পারছে না। কথাগুলো, কিন্তু চেহারায় আগের সেই কাঠিন্য আর নেই।
কি বলতে চাইছেন, ডক্টর পার্কার?
বলতে চাইছি, শত্রুর বিরুদ্ধে আবার তুমি তৎপর হয়ে উঠেছে।
কিন্তু আমি তো শুধু নর্দান আর্মামেন্ট কোম্পানির একজন সেলস ডিরেক্টর মাত্র।
হ্যাঁ, এবং নার্মকো হলো অল্টম্যান গ্রুপ অভ ইন্ডাস্ট্রির একটা অংশ। ব্যারন অল্টম্যান আর তার স্ত্রী ব্যারনেস ম্যাগডা অল্টম্যান, অদ্ভুত একটা জোড়া–মানে ছিল আর কি। এই যেমন ধরো, তুমি কি জানো, অল্টম্যান ইসরায়েলি ইন্টেলিজেন্স এজেন্সি মোসাডের একজন এজেন্ট ছিল?
অসম্ভব! দ্রুত, অস্বস্তির সাথে মাথা নাড়ল পিটার। অল্টম্যান ছিল রোমান ক্যাথলিক। ইসরায়েলিরা ক্যাথলিকদের দুচোখে দেখতে পারে না।
উনবিংশ শতাব্দীর ফ্রান্সে ইহুদি হয়ে থাকা বিড়ম্বনা ছিল মাত্র, তাই অল্টম্যানের দাদা ধর্ম বদলে ক্যাথলিক হয়। কিন্তু যুবক অল্টম্যান তার মা আর দাদীর ভক্ত ছিল, তাদের মতো সেও তার ধর্ম বদলায়নি। খুন হবার আগপর্যন্ত ইহুদি ধর্মের প্রতিই তার টান ছিল।
দ্রুত চিন্তা করছে পিটার। এ-সব যদি সত্যি হয়, তাহলে গোটা ব্যাপারটা আবার আকৃতি বদলাচ্ছে। ব্যারনের মৃত্যুর সাথে নিশ্চয়ই এই ব্যাপারটার সম্পর্ক আছে। ওর জীবনে ব্যারনেস ম্যাগডার ভূমিকাও তাহলে অন্য রকম হতে বাধ্য।
ব্যারনেস? সে কি জানত?
ডেস্কের কাছে ফিরে গেলেন ডক্টর পার্কার পাইপে টোবাকো ভরে অগ্নিসংযোগ করলেন। তাঁর চেহারায় প্রশংসার ভাব ফুটে উঠল। সুন্দরী মহিলা, গুণী মহিলা কিন্তু তার সম্পর্কে আর কি জানি আমরা? পোল্যান্ডে জন্ম, বাবা ছিল ডাক্তার। ম্যাগডা যখন ছোট, তাকে নিয়ে পশ্চিমে পালিয়ে আসে। কয়েক বছর পর প্যারিস খুন হয়ে যায় সে, রোড় অ্যাক্সিডেন্ট। ঘাতক ট্রাকের ড্রাইভার পালিয়ে যায়। মৃত্যুটাকে ঘিরে আজও খানিকটা রহস্য রয়ে গেছে।
