মাঝরাতের খানিক পর কেনেডি এয়ারপোর্টে নামল ওরা, একজন আর্মি ড্রাইভার অপেক্ষা করছিল ওদের জন্যে, হাওয়ার্ড জনসনে এয়ারফোর্সের একটা অফিসে ছয় ঘণ্টা ঘুমাবে ওরা।
সকালে ঘুম থেকে উঠে ব্রেকফাস্ট সারার পরও চোখ থেকে ঘুম ঘুম ভাবটা যেতে চায় না, তাই আরেক কাপ কফি খেল পিটার। নিজে একটা চুরুট ধরিয়ে পিটারকে সাধল কলিন, মাথা নাড়ল পিটার। বাইরে এসে আবার ক্যাডিলাকে চড়ল ওরা, কালকের সেই ড্রাইভার নিয়ে যাচ্ছে ওদের। ফিফথ আর ওয়ান হানড্রেড ইলেবেন্থ স্ট্রীটের চৌরাস্তা হয়ে দক্ষিণ দিকে এগোল। ডক্টর কিংস্টোন পার্কারের বাসায় যাচ্ছে ওরা। কলিনের অ্যাটলাস পাস দেখে ওকে ছেড়ে দিল সদর দরজার নিরাপত্তা রক্ষীরা।
অ্যাকুস্টিক টাইলে ঢাকা সিলিংসমেত একটা লম্বা ঘরে নিয়ে চলল কলিন, পিটারকে। বিশাল কনসার্ট পিয়ানো আর সারি সারি বইয়ের ভারে ন্যজ শেলফ রয়েছে একটা। রেকর্ডিং স্টুডিওর মতো বিশাল স্পিকার রয়েছে দেয়ালে।
কিংস্টোন পার্কার দাঁড়িয়ে আছেন পিয়ানোর পাশে, বীরপুরুষের চেহারা নিয়ে। প্রায় ছফিট লম্বা তিনি, শরীরের তুলনায় কাঁধে দুটো একটু যেন বেশি গলায় বসানো প্রকণ্ড মাথাটা সামনের দিকে একটু ঝুঁকে আছে। তার চেহারায় পবিত্র একটা আলো ফুটে আছে, চোখ দুটো আধবোজা যেন ধ্যানমগ্ন। যন্ত্রসঙ্গীতের সুর মূর্ঘনার ঘোর ভেঙে গেল ওদের দুজনের আগমনে।
ঘরের ভেতর নিস্তব্দতা নেমে এল। জেনারেল স্ট্রাইড, পার্কার অভ্যর্থনা জানালেন ওকে। নাকি আমি তোমাকে পিটার বলে ডাকব?
মি. স্ট্রাইড উইল ডু ভেরি নাইসলি, বলল পিটার।
হাত না মিলিয়ে অনুতাপের ভঙ্গি করে ওকে বসতে বললেন পার্কার।
তাও তো এসেছো, পিটার বসতে, মাথা নেড়ে বললেন।
সবসময়ই আমার কৌতূহল একটু বেশি।
আমিও ওটা ভেবেই তোমাকে ডেকেছিলাম, হেসে বললেন পার্কার। ব্রেকফাস্ট করেছো?
আমরা দুজনে স্ন্যাক নিয়েছি, চট করে বলে কলিন, পিটার মাথা নেড়ে সায় দেয়।
তাহলে কফি, বললেন ডক্টর পার্কার, ইন্টারকমের সুইচ অন করে অর্ডার দিলেন তিনি। তারপর পিছন দিকে ফিরলেন। কোত্থেকে শুরু করা যায়! দুহাতের আঙুল চালালেন চুলে।
শুরু করুন শুরু থেকে, বলল পিটার। অ্যালিসকে তাই তো বলেছিল কিং অভ হার্টস।
শুরু থেকে কোমল হাসি দেখা গেল ডক্টর পার্কারের মুখে। —বেশ, শুরুতে আমি তোমাকে অ্যাটলাসে চাইনি।
আমি জানি।
আমার ধারণা ছিল থোর কমান্ডের কমান্ডারের পদটা তুমি প্রত্যাখ্যান করবে, কারণ তোমার যোগ্যতা আরো অনেক বেশি ছিল। কিন্তু পদটা গ্রহণ করে তুমি আমাকে অবাক করে দাও, যদিও এই প্রথমবার নয়।
সাদা জ্যাকেট পরা একজন চীনা বাটলার ঢুকল ভেতরে, পিতলের চকচকে ট্রেতে কফির সরঞ্জাম নিয়ে। কফিতে ক্রীম আর রঙিন চিনি মিশিয়ে পরিবেশন করল সে। তারপর চলে গেল।
নিস্তব্ধতা ভাঙলেন ডক্টর পার্কার, কেন তোমাকে চাইনি আমি? চাইনি এজন্যে যে তোমার রেকর্ড আর অ্যাচিভমেন্ট চমৎকার হলেও, আমার ধারণা ছিল পুরানো আর রদ্দি ধ্যান-ধারণা থেকে তুমি কখনো বেরিয়ে আসতে পারবে না। আমি এমন একজন লোক খুঁজছিলাম যে শুধু ব্রিলিয়ান্ট নয়, যার স্বাধীনভাবে সিদ্ধান্ত নেয়ার এবং প্রচলিত নিয়ম-কানুন ভাঙার ক্ষমতা আছে। এ সব গুণ তোমার মধ্যে আছে তা আমি বিশ্বাস করতে পারিনি। তবু তুমি থোরের কমান্ডার হওয়ার প্রস্তাব মেনে নেয়ায় এক রকম বাধ্য হয়েই তোমাকে আমার নিতে হলো। আমরা একসাথে কাজ শুরু করলাম, কিন্তু আমি তোমার সম্পূর্ণ বিশ্বাস অর্জন করতে পারলাম না।
কথা বলার সময় পিয়ানোর কী বোর্ডে হাত বুলালেন ডক্টর পার্কার, তারপর পিয়ানোর দিকে পিছন ফিরে টুলে বসলেন।
তা যদি পারতাম, জিরো-সেভেন-জিরো অপারেশনটা অন্যভাবে শেষ হতো। এই ঘটনাটা ঘটে যাবার পর তোমার সম্পর্কে আমার ধারণা বদলে গেল। আমাকে খুব কষ্ট পেতে হলো। তোমার ভেতর যা ছিল না বলে জানতাম, চোখে আঙুল দিয়ে তুমি দেখিয়ে দিলে সেগুলো সবই তোমার ভেতর আছে, নিজের বুদ্ধিবৃত্তির ওপর আমার আস্থা কমে গেল। ঠাণ্ডা মাথায় চিন্তা করার জন্যে সময় দরকার ছিল আমার, কিন্তু সে সময় তুমি আমাকে দিলে না, তার আগেই পদত্যাগপত্র পাঠিয়ে দিলে।
এবং আপনি সেটা গ্রহণ করলেন, ডক্টর পার্কার।
হ্যাঁ, তাই।
তাহলে বোঝা যাচ্ছে, এখানে অযথা আমরা সময় নষ্ট করছি। পিটারের চোখে ঠাণ্ডা দৃষ্টি, চেহারা কঠোর।
প্লিজ, জেনারেল স্ট্রাইড, আগে আমাকে সবটা ব্যাখ্যা করতে দাও। একটা হাত এমনভাবে বাড়িয়ে দিলেন ডক্টর পার্কার, যেন পিটারকে চেয়ার ছাড়তে বাধা দিতে চাইছেন। গোটা ব্যাপারটাকে অর্থবহ করতে হলে একটু পিছন থেকে শুরু করতে হবে।
তোমার সেই চুরুটটা, নিচু গলায় বলল পিটার।
পকেট থেকে চুরুট আর লাইটার বের করে পিটারের হাতে নিঃশব্দে ধরিয়ে দিল কলিন, দুজন পাশাপাশি বসেছে ওরা।
টুল ছেড়ে কার্পেটের ওপর দিয়ে হেঁটে এলেন ডক্টর পার্কার, সরাসরি পিটারের সামনে এসে থামলেন। জিরো-সেভেন-জিরো হাইজ্যাক হবার কয়েক মাস আগের ঘটনা। নানা সূত্র থেকে আমি আভাস পেলাম, আন্তর্জাতিক সন্ত্রাসবাদ নতুন একটা চেহারা নিয়ে আত্মপ্রকাশ করতে যাচ্ছে। প্রথম শুধু আভাস, তারপর কিছু কিছু প্রমাণ। ধীরে ধীরে পরিষ্কার হতে থাকল, দুনিয়া জুড়ে যে সন্ত্রাসবাদী তৎপরতা চলছে সেগুলোকে নির্দিষ্ট একটা কেন্দ্র বা সেন্টার থেকে নিয়ন্ত্রণ করার চেষ্টা করা হচ্ছে।
